গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় নারাজি এবং বাগে পাওয়া বাঘ

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১২:৩২ এএম

পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কাছে অনেক বছর ধরেই ভর্তি পরীক্ষা একটি আতঙ্কের নাম। লাখো পরীক্ষার্থীর মধ্য থেকে অল্প কয়েক হাজার ছেলেমেয়ের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থাকায় বিষয়টি হয়ে গেছে অনেকটা লটারির মতো। কিন্তু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়ারও তো উপায় নেই। সব বিশ্ববিদ্যালয়ই বাজিয়ে নিতে চায় প্রার্থীদের। তাই ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে। এত বিশাল প্রতিযোগিতায় কেউ তো হলফ করে বলতে পারবে নাভালো পরীক্ষা দিলেও চান্স পাবে। ভালোর তো কোনো শেষ নেই। ধরে নিই, পাঁচটি আসনের জন্য ওপরের দিকে প্রায় পাঁচ শ জনই হয়তো খুব ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। এসএসসি, এইচএসসি উভয় পরীক্ষার ফলাফলও পাঁচ শ জনেরই ভালো। ফলাফল নির্ধারিত হবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কম বেশি দিয়ে। সেই অর্থে এই পাঁচ শ জনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সমান যোগ্য। কিন্তু চার শ পঁচানব্বই জনই তো ভর্তির সুযোগ বঞ্চিত হবে। তাই প্রার্থী ও অভিভাবককে ছুটতে হয় এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতে যেমন অর্থ ক্ষতি হয় তেমনি শ্রম ও সময়ের অপচয় হয়। অনেক মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটতে না পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ বঞ্চিত হয়।  এসব বাস্তবতার কারণে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছিল আর্তি জানানো হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির একটি সমন্বিত পদ্ধতি বের করার। কিন্তু এতে কোনো কোনো ‘অভিজাত’ বিশ্ববিদ্যালয় সাড়া দেয়নি। তাদের যুক্তি, নিজেরা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের মতো করে পরীক্ষা নিয়ে মেধাবী ছেলেমেয়েদের ভর্তি করবেন।

কভিড অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। আবারও গুচ্ছ পরীক্ষার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এবার কিছুটা ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। অনড় অভিজাত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবারও একলা চলো নীতিতে রয়েছে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই পরীক্ষা দিতে হবে। নীতির কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা কিছুটা বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। তারা কিছুটা উপকার করেছে শিক্ষার্থীদের। বিভাগীয় শহরগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। সামান্য মন্দের ভালো হয়েছে এতে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শেষ করে এখন আবার দেশের সব অংশ থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ছুটে আসতে হবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থাৎ নিপীড়ন থেকে নিষ্কৃতি মিলল না।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন আমরা সবাই সমন্বিত পরীক্ষায় সম্মত হতে পারছি না? ভদ্রগোছের উত্তর হচ্ছে এতে সাধারণ মানের প্রশ্ন হবে এবং প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ক্ষুণœ হবে। এ ধরনের কথা আগে থেকেই প্রচারিত ছিল। অনেক আগে যখন বিভিন্ন বিভাগ নিজেরা প্রশ্ন করে খাতা মূল্যায়নের পর ফলাফল প্রস্তুত করত তখনো কোনো কোনো পরীক্ষা কমিটি মেধাবী শিক্ষার্থী বের করে আনার জন্য একটু জটিল প্রশ্ন করার চেষ্টা করত। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের ভাবনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারিনি। শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার, শাণিত করার দায়িত্ব তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকের। রেডিমেড মেধাবী শিক্ষার্থীকে দিয়ে ভালো ফলাফল করানোয় কৃতিত্ব কোথায়! এ অনেকটা বাগে পাওয়া বাঘ শিকারের মতো। বাঘকে যদি বাগে পাওয়া যায় যদি ফাঁদে আটকানো যায় তাহলে তাকে পিটিয়ে মারা সহজ। কিন্তু এতে শিকারির কৃতিত্ব কোথায়!

আমি আমার দীর্ঘ শিক্ষক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি, যেভাবে আমরা ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ভর্তিযোগ্য শিক্ষার্থী বাছাই করি এতে শেষ পর্যন্ত বিশেষ মেধাবী বের করে আনা সহজ নয়। সাধারণত ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাওয়া নম্বরের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট শতাংশের নম্বর চূড়ান্ত ফলাফলে যুক্ত হয়। বাকিটা ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর। এখানে অনেকের যুক্তি থাকে মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডে এসএসসি এইচএসসিতে বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা থাকে। ফলে দুটোর যোগফলে এরা সাধারণ ধারায় পড়ে আসা শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকে। তাই দুটোর যোগফলে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমি জানি না গুচ্ছ পদ্ধতিতে পেছনের দুটো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট শতাংশ নম্বর যুক্ত হয় কি না। যদি তা হয় তাহলে এই দুই পরীক্ষার নম্বরের শতকরা হার কমিয়ে সর্বনিম্ন করা যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি নম্বর বরাদ্দ থাক লিখিত ভর্তি পরীক্ষায়। আমরা জানি নানা কারণে নানা দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের এসএসসি অথবা এইচএসসি পরীক্ষা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই ফলাফল খারাপ হয়েছিল। এ কারণে বরাদ্দ শতাংশের নম্বর কমে গেছে। আমরা জানি ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য নির্ধারিত হয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নম্বরের হেরফেরে। সে কারণে যদি আমরা এসএসসি এইচএসসি-এর বরাদ্দ নম্বর সংখ্যাটি আরও কমিয়ে দিই তাহলে দুদিক থেকে ন্যায়বিচার রক্ষা করা যায়। প্রথমত যে কারণেই হোক যাদের দুই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল হয়নি তারা লিখিত ভর্তি পরীক্ষায় বেশি নম্বর থাকায় মেধার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। দ্বিতীয়ত গুচ্ছ পরীক্ষায় প্রশ্ন কঠিন হোক বা জটিল হোক। সব পরীক্ষার্থীর জন্যই তা সমান। ফলে যোগ্যতা প্রমাণ করেই পরীক্ষার্থী তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। যে কারণে যারা তথাকথিত অতি মেধাবীদের ভর্তি করে কৃতী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সুনাম ধরে রাখতে চান বিনয় প্রকাশ করে বলব তাদের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। আমি বিশ্বাস করি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা প্রমাণ করে যারা ফরম পূরণ করার সুযোগ পায়, তাদের সবারই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সামর্থ্য আছে। শিক্ষক হিসেবে  আমি দায়িত্ব নিয়েই বলব, ভর্তি পরীক্ষায় সর্বশেষ ফলাফল যার তাকেও যদি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা সঠিক পরিচর্যা করেন তবে সেই ছাত্র বা ছাত্রী মেধাবী ফলাফল করে নিজের ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবে। শুধু ঠাঁই নেই বলে আমরা পরীক্ষা নিয়ে ছোট অংশকে ভর্তি করতে পারছি। এ দায় একান্তই রাষ্ট্রের।

আমাদের দেশে রাজধানীতেও অনেক নামকরা স্কুল-কলেজ আছে। সেখানে অনেক বেছে বেছে মেধাবী ছেলেমেয়েদের ভর্তি করা হয়। ওরা এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করে স্কুল বা কলেজকে এক নম্বর, দুই নম্বর, তিন নম্বর করে দেয়। আমি তো মনে করি এর পেছনে সামান্য অবদান রয়েছে স্কুল ও কলেজের। বড় অর্জন ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত মেধা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনি। কৃতিত্ব সেখানেই হতো যেখানে সাধারণ মানের ছাত্রছাত্রীদের পরিচর্যায় শাণিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উজ্জ্বল ফলাফল করে দিতে পারত। আসলে সবাই বাগে পাওয়া বাঘই ধরতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরটা নিয়ে আমার আরও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিবেকের শাসন থেকে সরে যাচ্ছি। সবাই নন, কোনো কোনো শিক্ষক (সংখ্যাটি ক্রমে বড় হয়ে যাচ্ছে) দায়িত্বশীলতার সঙ্গে রুটিন অনুয়ায়ী ক্লাস নিচ্ছি না। কেউ কেউ সপ্তাহের বেশির ভাগ দিন বিশ্বদ্যিালয়ে আসার সময় পাই না। রাজনৈতিক বলয়ে থাকায় এবং একধরনের প্রশ্নবোধক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করায় তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। তাই বোধ হয় মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার এত তাড়া। ক্লাস না করলেও ওরা নিজ গুণে বিশ^বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কর্মজীবনে ও গবেষণার জগতে প্রবেশ করতে পারবে।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত বিধায়কদের কাছে সবিনয়ে অনুরোধ করব এভাবেই কি আত্মম্ভরিতার অচলায়তন তৈরি হতে থাকবে, না দেশ-জাতির প্রতি আমাদের কিছুটা দায়বদ্ধতা থাকবে। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের আর্থিক ও অন্যান্য কষ্ট থেকে মুক্ত করার সহজ পথ চাইলেই আমরা দেখাতে পারি। গুচ্ছ বা এর চেয়ে সহজ পথ যদি আমরা দেখাতে পারি সেটিই হবে সবচেয়ে উত্তম। এই যে সাত নভেম্বর থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দশ দিনব্যাপী ভর্তি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে অল্প কটি আসনের বিপরীতে লাখো ছাত্র ও অভিভাবক ছুটে আসবেন দেশের নানা অংশ থেকে। আমি বরাবরের মতো সে দৃশ্য দেখব আর আত্মপীড়নে ভুগব। শিক্ষকতা করছি বলে পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব পালন আমাকে করতে হবে। তবে মর্মপীড়া থেকে মুক্তি পাব না।

আমরা কি পারি না মানবিকভাবে নতুন করে সবকিছু ভাবতে?

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত