জনযুদ্ধের অবিস্মরণীয় এক দৃশ্যপট

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২২, ১০:৫৪ পিএম

পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে জাতীয় সংসদের নির্বাচন স্থগিত করলে বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক ঘোষণায় ৩ মার্চ ৭১ রংপুরে হরতাল পালিত হয়। হরতালের মিছিলে গুলির ঘটনায় কিশোর শংকু সমজদারসহ ৩ জন শহীদ হয়। এরপর ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক আহ্বানে এখানকার মানুষ প্রস্তুত হতে থাকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে। তারই ফলে ২৪ মার্চ সম্মানীপুরের শাহেদ আলীর নেতৃত্বে অতর্কিত গেরিলা হামলায় লে. আব্বাস ও অপর তিনজন পাকিস্তানি সেনার আহত হওয়ার ঘটনায় (আহত লে. আব্বাস পরে মৃত্যুবরণ করেন) রংপুরের মানুষ আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ২৮ মার্চ এলাকার হাজার হাজার মানুষ স্থানীয় অস্ত্রশস্ত্র (বাঁশের লাঠি, বল্লম, তীর-ধনুক ইত্যাদি) নিয়ে দুঃসাহসিক অভিযান চালায় রংপুর সেনানিবাসে যা ছিল অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। মনে হয়েছিল এ যেন গণজাগরণের ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লবের বাস্তিল দুর্গ অভিযানের এক দৃশ্যমান নব সংস্করণ। আমি নিজেও সেই অভিযানের এক গর্বিত অংশীজন।

ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ দৃশ্যমান হওয়ায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এসময় রেল ও সড়ক যোগাযোগের স্পর্শকাতর ব্রিজগুলো পাহারার ব্যবস্থা করে। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় এক মাইল দূরে একটি রেলওয়ে ব্রিজ (গাড়ার কুড়া ব্রিজ নামে পরিচিত) পাহারার জন্য কর্তৃপক্ষ দশজন রাজাকার মোতায়েন করে। রাজাকার মোতায়েনের পর স্থানীয়দের জন্য এই পথ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কিন্তু জহীর খলিফার (দর্জি) মতো দুএকজন দিন আনা দিন খাওয়া লোককে ভয়ের ভয়াল ছোবল উপেক্ষা করেই বেরিয়ে পড়তে হয় পেটের ধান্দায়, অনেকটা জীবন বাজি রেখেই। প্রথম দিন ব্রিজ পার হতে গিয়ে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে জহীর সাহেবকে। পাহারারত রাজাকাররা তার বয়স, অবয়ব ও বেশভূষা এবং কথাবার্তা শুনে তেমন ক্ষতিকারক নয় মর্মে পরীক্ষামূলক যাতায়াতের অনুমতি দেয়। রাজাকার কমান্ডার মাঝে মাঝে তার সঙ্গে গল্পসল্প করেন এবং তার পরিবারের খোঁজখবর নেন। জহীর সাহেব সরল মানুষ, প্রশ্নের মুখে পরিবারের অনেক কথাই বলতে বাধ্য হন। সুন্দরী বলে বড় দুই মেয়ের ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে, এখনো দুই বিবাহযোগ্যা মেয়ে ঘরে প্রসঙ্গক্রমে এ কথাও তিনি বলে ফেলেন। এরপর রাজাকার কমান্ডার নিজেই তার বাড়িতে দাওয়াত চেয়ে নেন। দাওয়াত খেয়ে আসার পর কমান্ডার সাহেব একদিন দর্জির ৩য় মেয়ে মিনিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জহীর সাহেব বেকায়দায় পড়ে যান। অন্যদিকে জহীর সাহেবের বাড়িতে রাজাকার কমান্ডারের দাওয়াত খাওয়ার ব্যাপারটি এলাকায় জানাজানি হয়ে পৌঁছে যায় এলাকা দাপিয়ে বেড়ানো ডাকাত দলের কাছেও। একদিন রাতে ডাকাত দলের কয়েকজন ভাটিয়া পাড়ায় জহীর সাহেবের বাড়িতে গিয়ে খাবার আয়োজন করতে বলে। এরপর ডাকাতের সর্দার জহীর সাহেবকে বলেন যে, সেদিনই তার মেয়ে মিনিকে দিয়ে দলের সদস্য জিকরুলের বিয়ে দিতে হবে। জহীর সাহেবের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। তিনি এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেন। পরদিন জহীর সাহেবের ছেলে শহীদুল, আমাদের স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, আমাদের কাছে এসে সবিস্তারে সব ঘটনা খুলে বলে।

এদিকে প্রথম যাত্রায় ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার যন্ত্রণায় যখন ছটফট করছিলাম; তখন হঠাৎ করে একদিন রাত ১০টার দিকে ডাক পড়ল লালমোহন কাকুর আস্তানায়। তিনি একটি হাই স্কুলের শিক্ষক, অকৃতদার এবং গ্রামের কিশোর যুবাদের লিডার। তার ঘরে গিয়ে দেখি মিলিটারি চেহারার এক লোক এই গরমের দিনে গায়ে লম্বা চাদর জড়িয়ে চৌকির ওপর বসে আছেন। ক্ষণিকের বিস্ময় কেটে গেলে খেয়াল করে দেখলাম তিনি আমাদের পাশের মুন্সিপাড়ার গোলজার ভাই। স্কুলে আমাদের অনেক সিনিয়র বড় ভাই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি স্কুলে পড়া অবস্থায় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। মার্চ মাসের আগে ছুটিতে এসে আর ফিরে যাননি। আলাপে তার জবানিতে জানা গেল তিনি ভারত সীমান্তে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তিনি কিছু অস্ত্রশস্ত্রও নিয়ে এসেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে আগ্রহী কিশোর যুবকদের তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষিত করতে চান অত্যন্ত গোপনে। খবর পাওয়ার পর ইতিমধ্যে পুলিন, অতুল, হরিচরণ এসে উপস্থিত হয়েছে। তিনি আমাদের সামনে গায়ের চাদর সরিয়ে একটি এলএমজি বের করলেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গেরিলা যুদ্ধের গুরুত্ব ও তার কলাকৌশল সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। এভাবে ৭ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি দিয়ে তিনি এই ঘরেই সেদিনের মতো অবস্থান করলেন। এর পরদিন তিনি আরও কিছু অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলেন; যার মধ্যে একটি স্টেনগান ও ২টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ছিল, তা গোপনে লুকিয়ে রাখার জন্য লালমোহনকে অনুরোধ করেন। এখানে থেকেই ভিন্ন ভিন্ন দিনে স্টেনগান, থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও এলএমজি চালনার জন্য তিনি আমাদের এগুলোর ব্যবহার বিধি ও কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন। আমরা অত্যন্ত উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। ৭ দিন পর হঠাৎ করে তিনি আবার উধাও হয়ে যান। হয়তো অন্য কোনো অ্যাসাইনমেন্টে বা অপারেশনে অন্যত্র চলে গেছেন।

 শহীদুলের কাছে তার পরিবারের এই সংকটের কথা জেনে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি এবং বিভিন্নভাবে গোলজার ভাইয়ের খোঁজ করতে থাকি। শহীদুলের পারিবারিক বিষয়টি নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি এবং এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল হিসেবে শহীদুলকে পরামর্শ দেওয়া হয় যে, তার বাবা যেন প্রস্তাবিত বিয়ের নির্ধারিত দিনে পরিবারের অন্যান্য সবাইকে অন্য জায়গায় সরিয়ে রাখে এবং ডাকাতদের এই জবরদস্তিমূলক বিয়ের ব্যাপারটি রাজাকার কমান্ডারকে জানায়। বিয়ের সময়টা যেন রাত ১০টার পরে বলে ঘোষণা করা হয়।

বিভিন্নভাবে চেষ্টা করার পর তথাকথিত বিয়ের নির্ধারিত দিন শনিবার রাত ৯টার দিকে গোলজার ভাই লালমোহনের আস্তানায় এসে উপস্থিত হন। লুকিয়ে রাখা অস্ত্রগুলো বের করা হয়। অপারেশনে অংশগ্রহণ করার জন্য নির্ধারণ করা হয় ৪ জনকে। কমান্ডার গোলজার ভাই এলএমজি, লালমোহন স্টেনগান, পুলিন ও আমি থ্রি নট থ্রি নিয়ে প্রস্তুত থাকব পার্শ্ববর্তী রেলব্রিজের নিচে। রেলব্রিজটি প্রতিরক্ষার দিক থেকে যেমন অনেকটাই নিরাপদ, তেমনি আক্রমণের দিক থেকেও সুবিধাজনক। পূর্বপরিকল্পনা মাফিক আমরা পৌনে ১০টার দিকে রেলব্রিজের নিচে গিয়ে অবস্থান নিই এবং উত্তর-পশ্চিমের কালভার্টসহ রাস্তার ওপর নজর রাখি। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার আবছায়ায় রাস্তার বগলে ভাঙা কালভার্টের আশপাশে কয়েকটি কালোমূর্তির ইতস্তত নড়াচড়া দেখে আমরা নিশ্চিত হই যে ডাকাত বরের প্রতিপক্ষ রাজাকার দল যথাস্থানে পজিশন নিয়ে ওঁৎপেতে আছে।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাবুরহাট-ভাটিয়াপাড়ার দিক থেকে একটা চিৎকার চেঁচামেচি শোনা গেল। তারপর একটা গুলির শব্দ। আমরা আরও সতর্ক অবস্থান নিলাম। কিছুক্ষণ পর হৈচৈ করতে করতে কয়েকজন লোক বাবুরহাট বটতলা থেকে কালভার্টের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। দলের কারও কণ্ঠে অশ্রাব্য গালিগালাজের চিৎকার শোনা যায়। আমরা অনুমান করি এটাই ডাকাত দল। বিয়ের আয়োজনে ব্যর্থ হয়ে তারা রাগে অপমানে ক্ষুব্ধ ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। তারা মাতালের মতো বিশ্রস্ত পদে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। রাস্তার পাশের বেলগাছটি পার হয়ে ডাকাত দল এলোমেলো পায়ে কালভার্টের একদম কাছাকাছি এসে পড়ে। তক্ষুনি গোলজার ভাইয়ের এলএমজি গর্জে ওঠে। তারপর আমাদের রাইফেল ও স্টেনগান। কালভার্টের ভেতর থেকেও কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপর ক্রমাগত কয়েকটি আর্তচিৎকার। তারপর সব নীরব, চুপচাপ। গভীর অন্ধকারের মতো নিস্তব্ধতা সবকিছুকে গ্রাস করে থমকে দাঁড়ায়। আকস্মিক আক্রমণে বিমূঢ় ডাকাত দলের মতো বিস্মিত রাজাকার বাহিনী পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই পূর্বপরিকল্পনা মতো আমরা নিরাপদ অবস্থানে চলে যাই। পরদিন সকালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিয়ে পাগলা ডাকাত জিকরুল ঘটনাস্থলে নিহত এবং দুই রাজাকার সদস্য আহত হয়েছে। এমন ছোট্ট ছোট্ট অনেক যুদ্ধই দেশব্যাপী এক বৃহৎ জনযুদ্ধে আমাদের শামিল করেছিল একাত্তরে।

 লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত