সর্বসাধারণের ব্যবহারাধিকার

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ১০:৩১ পিএম

(প্রথম কিস্তির পর)

কিন্তু, আশা নিয়ে তালে থাকা নেপো বাদী-রেসপন্ডেন্ট আইনের আশ্রয়ে এসে আদালতের প্রশ্রয়ে দু-দুটো ডিক্রির দাঁও মেরে বসে আছে যে ফাঁকতালে! আগে একতরফা একটা, সেটার ভরে পরে দোতরফা আরেকটা। একতরফাটা বহালই আছে, বাতিলের একতরফাও একটা রায়-ডিক্রি নেই। একতরফার ডিক্রিটা পাক্কা একেবারে। পরের দোতরফাটার বিরুদ্ধে এই আপিল এনেছে বিবাদী ভক্ষক-নেপো শঙ্কিত হয়ে। রক্ষক ডেপুটি শঙ্কাহীন! হারাবার কিচ্ছু নেই তার! একতরফাটার বিরুদ্ধে আসেওনি তাই মোটে। আসেনি দোতরফাটার বিরুদ্ধেও নিজে থেকে। এসেছে ভক্ষক-নেপো পিছে লেগে নিজের আপিলে তাকে রেসপন্ডেন্ট করেছিল বলে পেয়ে আমি ধরে আনাতে। রক্ষক-ভক্ষক এখন বলছে শুধু, একতরফা তাই চলবে না ওই ডিক্রি। এটুকু কথায় তো চিড়ে ভিজবে না আইনের। একতরফা তো হয়েছে কী তাতে? শুধু একতরফায় তো অশুদ্ধ হয় না ডিক্রি। আসল দোষটা কী একতরফার? সে-কথা নেই কারও মুখে আর।   একতরফার রায়-ডিক্রি ঘেঁটে দেখলাম নিজে। ডিক্রিটা নেপো পেয়েছে মুন্সেফি আদালতকে বাংলা ১৩৫৩ সনের একখানা নায়েবি ‘চিট’ দেখিয়ে। নায়েবি ‘চিট’ দাখিলার পত্তনের মামলাই তো করে এসেছি সহকারী জজগিরির শুরু থেকে। পত্তন খুব একটা প্রমাণ হতে দেখিনি সেগুলোতে। উকিল সাহেবদের থেকে বিদ্যা তো কিছু পাওয়ার কথা সেগুলোতে। নিজের ঝুলি ঝেড়ে পাওয়া গেল হাইকোর্টের নজির (১৯৮৪ বিএলডি ১০১), জমিদারের সুস্পষ্ট সম্মতি-অনুমতি ছাড়া পত্তন দেওয়ার ক্ষমতা নেই কোনো নায়েব মশায়ের সাধারণ এখতিয়ারে। সম্মতি-অনুমতির কোনো প্রমাণ পেশ করেনি নেপো সেই মামলায়। শুধু ওই এক ‘চিট’-এ তাই পত্তন প্রমাণ হয় না আইনে। ‘নজরসেলামি’ নিয়ে ‘চিট’ দেওয়া সেই নায়েব মশাইকে আনাও হয়নি আদালতের নজরে। দাতা এসে আদালতে না খাড়ালে নায়েবি ‘চিট’ দাখিলা নেওয়াই যায় না মামলাতে (৩০ ডিএলআর এসসি ৪১), উকিল সাহেবদের থেকে পাওয়া এ-বিদ্যাটাও বের হলো পুরাতন ঝুলি থেকেই। নালিশি দিঘি সর্বসাধারণের ব্যবহার্য বলে লেখা আছে সিএস-এসএ খতিয়ানে। সেখানে স্বত্বের ডিক্রি মারার আগে মামলায় পক্ষ করা দরকার ছিল এলাকাবাসীকে, দরকার ছিল এলাকায় সমন-নোটিস জারির। এসব বিধান লেখা আছে দেওয়ানি কার্যবিধির শুরুর দিকেই (অর্ডার-১, রুল-৮)। এসবের কিছুই হয়নি নেপোর মামলায়। প্রতারণা-জালিয়াতি দেখি একটা না, ঘটেছে পদে পদে মুন্সেফি আদালতে। বিরলের মুন্সেফ বাহাদুর সরলমতি অতি! চোখ বন্ধ করে ছিলেন ‘চিট’-এর ধুলোতে! আইনের এসব দিকের কোনোটায় নজর না দিয়ে শুধু এক ‘চিট’-এর কাহিনী শুনেই ঢিট হয়ে একতরফার ডিক্রিটা হাঁকিয়েছেন চেয়ে থাকা নেপোর পক্ষে! বাহাদুর বটে!

চেয়ে থাকা নেপোর পেয়ে যাওয়া একতরফা ডিক্রিটা প্রতারণা আর জালিয়াতিতে পাওয়া, দিঘির ‘জলবৎ তরলং’ স্বচ্ছ একেবারে! কিন্তু, প্রতারণা আর জালিয়াতির এসব পোকা ধরে নাড়ায়নি তো কেউ ডিক্রিটার গোড়া! আপিলে আসা সদরের এই মামলাতেও সেগুলো তোলেনি কেউ। সিনিয়র সহকারী জজ জ্যেষ্ঠমতি! নেপোর পেয়ে যাওয়া একতরফাটার ভিতের ওপর দোতরফার এই ডিক্রিটা বসিয়ে দিয়ে কাম সেরেছেন সহজে অতি। আদালতের প্রশ্রয়ে পাওয়া একতরফাটাই এখন হয়ে গেছে নেপোর শক্ত একটা খুঁটি। এই খুঁটির জোরটা ভাঙতে না পারলে তো এবার আমাকেও দিঘির দই মারতে দিতে হয় চেয়ে থাকা এই নেপোকেই! আঙুল চুষতে হয় ফের সর্বসাধারণকে! প্রতারণা-জালিয়াতিতে পাওয়া ডিক্রির জোর নেই মোটে আইনে (৩২ ডিএলআর এডি ১৬৭), সে-বিদ্যাও পাওয়া ছিল আগে উকিল সাহেবদের বদৌলতে। কিন্তু, একটা মামলার আপিলে বসে ডিক্রি দ্বারা বন্ধ করা ভিন্ন আরেকটা মামলায় ঢুকি কোন পথে! দিশা দেওয়ার দায় নেই এখানকার রক্ষকের সরকারি কৌঁসুলির। ভক্ষক-নেপোর উকিল সাহেবের আয় আছে আরেকখানা মামলা-টামলার দাও পেলে!  নিজের মাথা নিজেকেই চুলকাতে হলো স্মৃতি হাতড়াতে! মনে পড়ল, নড়াইল কি কুড়িগ্রামে কোথায় যেন ফাও মিলেছিল এমন বেকায়দা অবস্থায় বেদাঁড়া ডিক্রির খুঁটি নাড়ানোর বিদ্যা। মামলায় উকিল সাহেবরা নিজেদের সুবিধামতো যেসব ডিএলআর-বিএলডি আইন সাময়িকী পড়তে দিতেন সেগুলোর ‘ফ্ল্যাগ মার্ক’ করা পাতাগুলোর আগে-পিছে দু-চার পাতা ‘বেশি করিয়া পড়ার’ স্বভাব ছিল পড়ার সেই উপদেশখানা পাওয়ার (কৌতূহল নিবারণে আমার ‘অনুবেদনাধীনের বংশ কর্তন’ দ্রষ্টব্য) আগে থেকেই। বিনা খাটনিতেই ফাও কিছু বিদ্যা আমার মিলত এভাবে। কায়দাটা পেয়েছিলাম জুনিয়রগিরিকালে আমার সিনিয়রের থেকে। তিনি পেয়েছিলেন তার সিনিয়রের থেকে। আমার আর সিনিয়রগিরি হয়নি বলে কায়দাটার ধারা আমাতেই গেছে থেমে। রামের থেকে পাওয়া বিদ্যা আমি দরকারমতো লাগিয়ে গেছি শ্যামের মামলায়। কখনো আবার লেগে গেছে রামেরই বিরুদ্ধে। পুরাতন ঝুলি খুঁজে অবশেষে পাওয়া গেল ফাও পাওয়া এক বিদ্যা, জুতসই একেবারে। হাইকোর্টের নজির (৩২ ডিএলআর ৭৫) : কোনো পক্ষ না তুললেও ন্যায়বিচার রক্ষায় আপন গরজে পোকা বেছে ডিক্রি নাড়িয়ে তার আইনি জোরটা পরখ করার এবং শেষে একতরফার খুঁটি টেকা না টেকার ফয়সালা দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের সর্বদাই আছে। বোধ করি, ‘গরজে গঙ্গাস্নান’ আদালতের অবশ্য কর্তব্য বলে! সদরের সিনিয়র সহকারী জজ গরজ করেননি মোটেও তাতে। প্রতারণা-জালিয়াতির পোকা না দেখে জোরহীন কাগুজে ডিক্রিখানার জাবেদা নকল দেখেই সে রকমই আরেকখানা ডিক্রি তুলে দিয়েছেন চেয়ে থাকা নেপোর পাতে। আমার গরজ ছিল গঙ্গাস্নানে। একতরফাটার ভেতরে ঢুকে তাই প্রতারণা-জালিয়াতির পোকা আগেই দেখা হয়ে গেছে। গরজে সারা কাজটা দেখছি শাস্ত্রমতে ঠিকই আছে। শাস্ত্রবিধিটা এখন রায়ে বসিয়ে দিব্যি বলা যায় একতরফাটার খুঁটি টেকে না আইনে।   চেয়ে থাকা নেপোর ডিক্রি দুটোর কোনোটাই টেকে না আইনে। মামলাটাই টেকার ছিল না আদতে। শুধু নামজারি নামঞ্জুরের আদেশ দুটো বেআইনি-অকার্যকর ঘোষণার ডিক্রি হলেই তার নামজারি হয়ে যাওয়ার নয় আপনা থেকে, যদি না বাধ্য করা যায় কর্তাদের। বাধ্য করার ‘ম্যান্ডেটরি ইনজাংশন’ চাওয়া নেই নেপোর মামলায়। ফাঁকটা উকিল সাহেবেরই বানানো বোধ করি আরেকখানা মামলার আঁকশি লাগানো যায় যাতে! কিন্তু, ‘ম্যান্ডেটরি ইনজাংশন’ বাদে কায়দা করা দোতরফা ডিক্রির পাতা নিয়ে নেপো ঘুরবে দ্বারে দ্বারে, আর আদালতের ভাবের মূর্তি গড়াবে পথের ধুলায়! এমন ভ-ুল (‘ইনফ্র্যাকচুয়াস’) ফালতু ডিক্রি দেওয়া চলে না আদালতের, বিস্তর নজির আছে তারও উচ্চ আদালতের। সর্বসাধারণের ব্যবহার্য দিঘি চেয়ে থাকা নেপোর ভোগে যাওয়ার ডিক্রি দেওয়া অবিচার হয়েছে বিরলের মুন্সেফ বাহাদুরের, একতরফার ওপরে দোরতরফা আরেকখানা চড়িয়ে অবিচারের চূড়ান্তটা সেরে দিয়েছেন সদরের সিনিয়র সহকারী জজ সাহেবে। ন্যায়বিচার ধূলিসাৎ হয়েছে বাহাদুরের আর সাহেবের হাতে একের পরে আরেকে। ডেপুটি আর কমিশনারের দেওয়া নামজারি নামঞ্জুরের আদেশ দুটো বরং দিঘিটা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য থাকার পক্ষেই গেছে প্রকারান্তরে। সুতরাং, ভক্ষক-নেপোর আপিলটা মঞ্জুর করা যায় চেয়ে থাকা নেপোর পেয়ে যাওয়া ডিক্রিটা বাতিল করতে।

কিন্তু, শুধু ওটুকুতে দেখি কার্য সিদ্ধি হয় না সর্বসাধারণের ব্যবহার্যের। উল্টো বরং জেঁকে বসে ভক্ষক-নেপো বিবাদী-আপিলকারী। আইনি এখতিয়ারের তোয়াক্কা না করে সরকারি রক্ষকরা দিঘিটায় ভক্ষক-নেপোর নামপত্তন করে দিয়ে বসে আছে সর্বান্তঃকরণে। বে-এখতিয়ারি বেআইনি এই নামপত্তন টেকে না আইনে। সেটা এখন বাতিল করা না গেলে তো শুধু চেয়ে থাকা নেপোর ডিক্রি বাতিলের এই সুবাদে পেয়ে থাকা নেপোর ভক্ষণকর্ম নিষ্কণ্টক হয়ে পড়ে আমারই স্বাক্ষরে! ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০০-এর আমার সেই রায়-আদেশে কাঁটা বিঁধল দুই নেপোরই গলায়। খসাতে রিভিশনে ছুটে গেল হাইকোর্টে একে একে। সঙ্গে সঙ্গেই যায় চেয়ে থাকা নেপো। পেয়ে যায় স্থগিতাদেশ সঙ্গে সঙ্গে। আটকে যায় আমার রায়ের সেই আদেশটাও। থেকে যায় দিঘিটা পেয়ে থাকা নেপোর ভোগে। হেলে দুলে রিভিশনে যায় সে পরের বছর ২০০১-এ। তারপর পড়ে থাকে সব ১৮ বছর ধরে। ২০১৮-এর জুনের শেষে ফুরসত হলো হাইকোর্টের রিভিশন দুটো শোনার। একসঙ্গে শুনানি চলে দুটোরই চার-চারটা দিন ধরে। মিলে গেল চেয়ে থাকা আর পেয়ে থাকা নেপো দুজনেরই উকিল সাহেবরা একসঙ্গে, বলে গেল বিস্তর আমার রায়ের বিরুদ্ধে যত কথা আছে। রক্ষক সরকারের ডিএজি (ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল), এএজি (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) এবারে মিলে গেল আমার রায়-আদেশটারই সঙ্গে। নামঞ্জুর হয় অবশেষে দুটো রিভিশনই (৫০৯০/২০০০ ও ১৮১৮/২০০১) হাইকোর্টের ১০ জুলাই ২০১৮-এর একখানা রায়ে। উঠে গেল স্থগিতাদেশ, বহাল হলো আমার রায়-আদেশটা একেবারে অক্ষতভাবে। সর্বসাধারণের ব্যবহারের সমষ্টিবদ্ধ স্বার্থটা ‘থার্ড কেইস’ নয়, ছিল আসল কেইস। লুকিয়ে রেখেছিল রক্ষক-ভক্ষক-ভোগেচ্ছু সব পক্ষ মামলাটারই ভেতরে। আমি শুধু সেখান থেকে তুলে সামনে এনেছিলাম নিজ কর্তব্যে মমতা লাগিয়ে। কর্তব্যকর্মে মমতা লাগালে ক্ষমতার কমতি হয় না তেমন আসলে। উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ করিনি মোটে, রক্ষক-ভক্ষক মিলে চালিয়ে যাওয়া ‘নেপোয় মারে দই’-এর কারবার বন্ধ করে দিঘি দিয়েছিলাম সর্বসাধারণের ব্যবহার্যে ফিরিয়ে। নেপোর ভোগে যায় ১৯৭৩ সালে। চালিয়ে যাচ্ছিল ২৭ বছর অবাধে। নেহাত আমার হাতে পড়ে ২০০০ সালের রায়-আদেশে একটুখানি বাধা পড়েছিল কাগজে-কলমে। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে সে-বাধা কাটিয়ে চালিয়ে গেছে আরও ১৮টা বছর। রিভিশনে হাইকোর্টের এ-রায়ে সর্বসাধারণের ব্যবহারাধিকার বহাল হয়েছে কি দিঘিটাতে! নাকি অক্ষতই রয়ে গেছে নেপোর ভক্ষণকর্ম সরকারি রক্ষকদের গুরুদায়িত্বের ভিড়ে রায়-আদেশ অকার্যকর হয়ে পড়ে থেকে! নাকি আবার আটকে গেছে উচ্চ আদালতেরই রায়-আদেশ সর্বোচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে! কি জানি কী ঘটেছে সর্বশেষে! (সমাপ্ত)

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত