পদ্মা সেতু নিয়ে আত্মঘাতী রাজনীতি কেন

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ১০:৩৩ পিএম

পাকিস্তানি শাসনামলে অনেক কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখার কোনো কারণ ছিল না। সে সময় আমরা ছিলাম নিপীড়িত। সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত পূর্ব পাকিস্তানের সোনালি আঁশ পাট। আর এ টাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। তাই পদ্মা সেতু তো দূরের কথা বুড়িগঙ্গা সেতু গড়ার চিন্তা করাও আমাদের জন্য বাতুলতা ছিল। স্বাধীনতা একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করে। আত্মবিশ্বাস বাড়ায় স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মনে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে খুব দেরি করতে হতো না যদি না পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রের ঘেরাটোপে আমাদের পড়তে না হতো।

আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর মধ্যে গোপালের প্রতিরূপ দেখতে পেয়েছিলাম। একটি বড় দুঃসময়ের পর গোপাল বাংলার রাজদ- হাতে নিয়েছিলেন আট শতকের মাঝপর্বে। এর আগের একশত বছর অরাজকতায় ছেয়ে গিয়েছিল বাংলা। রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল চলছিল। একশ বছরের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ ও রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল মানুষ। তাই অভিজাত শ্রেণি প্রথম গণতান্ত্রিক আচরণ করে নির্বাচন করেন গোপালকে।

গোপালের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডুবন্ত দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। গোপাল সফল হয়েছিলেন। এরপর তিনি শক্তিশালী পালবংশের পত্তন করেন। চারশ বছরের দীর্ঘ সময়ে পাল রাজারা দেশটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রত্যয়টি ছিল এখানেই। ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আমাদেরও বিশ্বাস ছিল গোপাল এক দুঃসহ সময়ে সংকট থেকে জাতিকে বের করতে পেরেছিলেন, বঙ্গবন্ধুও পারবেন। এ কারণে সাধারণ বাঙালির মধ্যে হতাশা ছিল না। বঙ্গবন্ধুও দৃঢ়তার সঙ্গে হাল ধরেছিলেন। বহির্বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে লাগলেন। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। গোপালের মতো বঙ্গবন্ধুও দেশকে অনেকটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অংশের মানুষ ও রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের অগ্রগতির শক্তিকে নস্যাৎ করতে গোপন তৎপরতা চালায়। এর ফল হিসেবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের সূত্রে আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারাই। এরপর আমাদের সম্ভাবনার আলো অনেকটাই ঘোলাটে হয়ে যায়। বিএনপি নামের নতুন রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা চলে আসে। এসময় থেকে ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তিকে মহানন্দে পর্দার অন্তরাল থেকে উন্মুক্ত মঞ্চে আসতে দেখা যায়।

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানান বিএনপি প্রধান ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ জিয়াউর রহমান! শোনা যায় এ পর্বে গোপন বিচারের মাধ্যমে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়েতে ইসলামীর নেতারা মন্ত্রী হতে থাকেন। পরে যাদের অনেকেই আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে যেমন পশ্চিম পাকিস্তানি ক্ষমতাধররা পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন নিয়ে ভাবেননি, বিএনপিও দীর্ঘ শাসনকালে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য লক্ষণীয় মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেনি। দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলে বাংলাদেশ তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ নানা ঝড়ঝাপটার পর ক্ষমতায় এসেও প্রধানত নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে খুব বেশি প্রত্যাশা জাগাতে পারেনি। কমিয়ে আনতে পারেনি দুর্নীতির দুষ্ট গ্রাস। অবশেষে ধীরে ধীরে দুর্বলতা কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্রমে ঘুরে দাঁড়াতে থাকে বাংলাদেশ। দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটতে থাকে। আমদানির পাশাপাশি রপ্তানির তালিকাও ক্রমে বড় হয়। দেশের শ্রমিকরা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠাতে থাকেন। অনেক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার সাহস দেখান শেখ হাসিনা। যমুনা নদীর ওপর তৈরি হয় বঙ্গবন্ধু সেতু। এতে উত্তর বাংলার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের পথ তৈরি হয়। বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রে বড় রকমের পরিবর্তন আসে। এরপর থেকে স্বপ্ন তৈরি হতে থাকে পদ্মা সেতুর জন্য। এই সেতু বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের সহজ যোগাযোগ তৈরি হতে পারত। স্পষ্ট হয়েছিল পদ্মা সেতু হলে বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচক অনেক ওপরে উঠে যাবে। ২০০৯ সালে যখন পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারি উদ্যোগ শুরু হয় তখন দুই ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। প্রথমত, যে দেশি-বিদেশি অপশক্তি বাংলাদেশের উন্নয়ন চায় না তারা উন্নয়নের গতি থামিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করবে কি না! দ্বিতীয়ত, খরস্রোতা পদ্মা সেতু তৈরিতে বিশাল নির্মাণ ব্যয় করতে হবে, বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ আমরা পাব কি না!

আমাদের আশঙ্কা অমূলক ছিল না। দেশবাসীর মনে আশাবাদ জাগিয়ে ঋণ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান। অল্পদিনের মাথাতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগে বিশ্বব্যাংকসহ সব সংস্থা ঋণদানের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায়। বিশ^ব্যাংকের চাপে দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে যোগাযোগমন্ত্রী মহোদয়কে পদত্যাগ করতে হয়। সচিব মহোদয়কে জেলে যেতে হয়। একই সঙ্গে এদেশের মানুষের আশার আলো নিভে যায়। স্বাভাবিকভাবে সরকার একটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। যেহেতু এদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি বরাবরই অনেকটা প্রকাশ্যে চলে তাই সাধারণ মানুষও দুর্নীতির অভিযোগকে অমূলক ভাবেনি। কিন্তু যখন সরকার থেকে বলা হয় তখনো ঋণের টাকা উত্তোলনই করা হয়নি তাহলে দুর্নীতি হয় কেমন করে? এই প্রশ্নে মানুষের ধারণায়ও পরিবর্তন আসতে থাকে।

শেষপর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধানে দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। মামলা ওঠে কানাডার আদালতে। এসময় থেকেই ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। শোনা যায় মামলা না চালানোর জন্য বিশ^ব্যাংক প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু আদালতের দৃঢ়তায় তদন্ত চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত রায়ে জানিয়ে দেওয়া হয় দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ইতিমধ্যে অধিকাংশ মানুষের জানা এই কথাগুলো লিখতে হলো এজন্য যে, বরাবর যে আশঙ্কা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াক, অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাক তা চায় না। দেশের অভ্যন্তরে এদের তাঁবেদার গোষ্ঠী চেষ্টা করেছে অগ্রগতির পথে কাঁটা বিছাতে। তাই শেষ চেষ্টা করেছে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন যাতে না হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু জানতেন দুর্নীতির অভিযোগ অমূলক, কানাডার আদালতও নিশ্চিত করেছে তাই অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। জানিয়ে দিলেন কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করবেন। এতে বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকেই। অনেক অর্থনীতিবিদ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। পদ্মা সেতু করতে পর্বতপ্রমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ এত অর্থ পাবে কোথায়?

আমাদের মতো ইতিহাসের ছাত্ররা হয়তো আশার আলো দেখতে পেয়েছিল। ইতিহাসে বারবার দেখেছি জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে সব অসাধ্য সাধন করা যায়। চৌদ্দ শতক থেকে ষোল শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত দুশো বছর বাংলার তুর্কি শাসকরা দিল্লির স্বদেশি তুর্কি সুলতানদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলায় স্বাধীন সুলতানির পত্তন করেন। দিল্লির শক্তিমান সুলতানরা এই স্বাধীনতা কেড়ে নিতে বারবার আক্রমণ পরিচালনা করেছেন। এসময় বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা পেয়েছিল প্রধানত গণশক্তির সমর্থনের কারণে। সে-সময় বাংলার সুলতানরা ধর্মনির্বিশেষে সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা সাফল্য পেয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আরেকবার গণশক্তির তেজ অনুভব করা গিয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদাতিক বাহিনী বলে দাবিদার পাকবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পরে তখন প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা। যারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ দূরের কথা হয়তো ছুঁয়েও দেখেনি। এই গেরিলারাই শেষ পর্যন্ত বিজয়কে এগিয়ে দিয়েছিল।

অনুমান করি প্রধানমন্ত্রী এই গণশক্তির ওপর ভরসা করেই নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করার সাহস পেয়েছিলেন। এদেশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। পদ্মা সেতুর জন্য নানা রকম ট্যাক্স-ভ্যাট আদায় করা হয়েছে। এজন্য ট্যাক্সদাতারা কোনো আপত্তি তোলেননি। এ-কারণেই প্রধানমন্ত্রী সেতু উদ্বোধন করতে গিয়ে জনগণের সমর্থনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নকে জনগণ তাদের বিজয় হিসেবেই দেখেছে। কা-ারি হিসেবে দেখেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি যারা চায়নি সেই পরাজিত দেশ পাকিস্তানি শাসকরাও বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নকে অভিনন্দন জানিয়েছে। অভিনন্দন জানিয়েছে পৃথিবীর প্রভাবশালী অধিকাংশ রাষ্ট্র। বিশে^র প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমগুলো অভিনন্দন জানাতে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু দেশে বিএনপির প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করেছে। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর বিএনপির প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বাস ছিল। কিন্তু পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হওয়ার পর সরকারকে অভিনন্দন জানানো থেকে দলটির নেতারা বিরত রইলেন। তদন্ত ছাড়াই মনগড়া দুর্নীতির অভিযোগ করে যেতে থাকলেন। এভাবে বিএনপি নেতারা তাদের রাজনীতিকে আবার প্রশ্নের মুখে ফেলে দিলেন।

পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হওয়ায় বিএনপি নেতা-নেত্রী ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ যারা আনন্দ পায়নি? দেশের এগিয়ে যাওয়ার বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আশায় বুক বাঁধছে না? এ-কারণে আমাদের মনে হয় পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে না পারা জনগণের কাছে হীনমন্যতার পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হবে। অমন নেতিবাচক রাজনীতি থেকে সরে আসতে না পারা যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য আত্মঘাতী হবে বলে আমরা মনে করি।

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত