মামা, ধর্ম যার যার উৎসব সবার

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ১০:০৯ পিএম

পৃথিবীতে মানুষের আনন্দ-উৎসবের শেষ নেই।

১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস, কিন্তু তাইওয়ানে ভূত-পেতনি মাসের সূচনা এইদিন, উৎসব দেশজুড়ে; আগস্টের শুরুতে কলম্বিয়ায় পুষ্প উৎসব, আর্জেন্টিনার ট্যাঙ্গো নাচের উৎসব, সিঙ্গাপুরে শিল্পকলা উৎসব। নটিংহিল কার্নিভ্যালে তো গোটা ইউরোপই যোগ দেয়; যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদাতে চলে বার্নিং ম্যান ফেস্টিভ্যাল। মানুষের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে পোড়ানো। অন্য মাসগুলোতে চলে বউ কাঁধে নিয়ে চলার উৎসব, এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর পা স্বামীর ঘাড়ের দুপাশে, মাথা নিচে, স্বামীর কোমর বরাবর। কানাডাতে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বরফে চুল ঢাকার উৎসব, জাপানে জননাঙ্গ উৎসব, থাইল্যান্ডে বানর খাওয়ানোর উৎসব, উত্তর কোরিয়া কাদা ছোড়াছুড়ি উৎসব, টমেটো উৎসব, কোলবালিশ লড়াই উৎসব। সব ক্ষেত্রেই উৎসব সবার। উৎসবের অর্থনীতি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। কিন্তু আর নয়।

হালে বাংলাদেশে যোগ হয়েছে জ¦ালানি তেল উৎসব। আমি কোনো দলে নেই, কোন্দলেও নেই; জাতের সঙ্গেও নেই, বজ্জাতের সঙ্গেও নেই, ডিজিটালেও নেই, ম্যানুয়ালেও নেই তবু এক রসিকের সৃষ্ট একটি ‘মিম’ আমার কাছে যখন এসেছে, অন্য কারও কাছে যেতে বাকি থাকার কথা নয়। ডলারের কাছে টাকার মার খাওয়া নাজুক পরিস্থিতির দিনেও আমি যথেষ্ট আমোদ পেয়েছি :

ওই মিয়া তোমার গাড়ি তো ডিজেলে চলে না। সিএনজিতে চলে। তুমি ভাড়া বাড়তি রাখবা কেন?

মামা, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার!

পূজা পার্বণের সময় ভোট টানার জন্য ধর্মীয় উৎসব যে সবার রাষ্ট্রীয়ভাবে তা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। ভিন্ন স্বাদের খাবারের লোভে আমি বিভিন্ন ধরনের উৎসবে যোগ দিই। কিন্তু জ¦ালানির বেপরোয়া মূল্যবৃদ্ধিতে যে উৎসবের সৃষ্টি হয়েছে তাতে কোন অশ^ডিম্ব যে খাবারের প্লেটে পরিবেশন করা হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

পেট্রল-অকটেন-ডিজেলের দাম বেড়েছে, সুতরাং স্থানীয় মাস্তান কাঁচাবাজারে ‘তোলা’র রেট বাড়িয়ে দিয়েছে, সুতরাং, জ¦ালানির সঙ্গে সম্পর্কহীন সব পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে, তাতে কোনো সমস্যা হয়নি, একজনও না খেয়ে মরেনি, দাম বাড়ায় আনন্দে বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে বিনে পয়সায় মান্না-সালওয়া ভক্ষণ করে দুহাত তুলে ‘তাহাদের’ পরমায়ু বৃদ্ধির দোয়া চালিয়ে যাচ্ছে। উৎসবের গুরুত্ব না বুঝে একজন নাগরিক তাকে নিয়ে ধারণ করা ভিডিওতে সরকারের প্রতি অবন্ধুসুলভ মনোভাব পোষণ করে বহুবার বলেছেন সরকার নাকি তাকে ‘বাম্বু’ দিয়েছে। এ কেমন উৎসব বানচাল করা কথা। উৎসব সবার। তেলের অতিবর্ধিত দাম যে এমনকি তেল-অসম্পৃক্তদেরও বিলিয়ন ডলার কামাইয়ের সুযোগ করে দিয়েছে বিপিসি কি সেই কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না?

আকবর আলি খান ও হাজার টাকার নোট :

সরকারি চাকরিতে নাম লেখানোর কিছুকাল পর লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৯৮৫-এর শুরুতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় শিক্ষক হিসেবে আকবর আলি খানকে পাই; আমলা ও লেখক হিসেবে তিনি সুপরিচিত।

ক্লাসে তিনি আমাদেরই জিজ্ঞেস করলেন, একটি হৃষ্টপুষ্ট মোরগের দাম কত? জবাব আসে ঊর্ধ্বে পঞ্চাশ টাকা।

তার জবাব ঊর্ধ্বে আর নিম্নে যাই হোক, আপনার হাতে যদি পঞ্চাশ টাকা থেকে থাকে তাহলে আজই একটি মোরগ কিনে জবাই করে মনের মতো করে রেঁধে খেয়ে ফেলুন। আর পরে মোরগ খাওয়ার আশায় যদি পঞ্চাশ টাকা জমিয়ে রাখেন তাহলে ওই টাকায় বড়জোর একটা রান খেতে পারবেন। যদি আরও অপেক্ষা করতে চান, করুন, তখন পঞ্চাশ টাকায় মোরগের একটা ছবি পাবেন।

আকবর আলি খানের কাছে পাঠ গ্রহণের চল্লিশ বছর পূর্তি হতে আরও তিন বছর বাকি। ফ্রায়েড চিকেনের দোকানে ড্রামস্টিক হিসেবে মুরগির কিংবা মোরগের একটি রানের দাম একশ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফুটপাতের ভ্যানে যে রান বিক্রি হচ্ছে তার দাম ষাট টাকাই ছিল, তবে আশঙ্কা করছি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ¦ালানি মূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে নিশ্চয়ই আরও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আকবর আলি খান মোরগের দাম এবং মোরগের ছবির দাম সময়ের ব্যবধানে যেভাবে তুলে ধরেছেন তখন এ নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-মশকারাও করেছি। একজন অন্যজনকে চেপে ধরেছি, মোরগ খেতে চাইলে মাল ছাড়ো, এখনি। ছবি দেখতে না চাইলে যা আছে পকেট ঝেড়ে ফেলে দাও।

স্বর্ণবিতানে সহস্র টাকার নোট

‘আল ইন্তিফাদা সূত্র’ উল্লেখ করে পাঠানো ক্লিপ পুরোটাই তুলে ধরছি। এতে হাজার টাকার একটি নোট, ২০০ টাকার একটি, ১০০ টাকার একটি, ৫ টাকার একটি ও ২ টাকার দুটি নোটের ছবি আছে। ভেতরের টেক্সটুকু বেশ কৌতূহলোদ্দীপক :

‘১০০০ টাকার নোট প্রথম ছাপানো হয় ২০০৮ সালে। ২০০৮ সালে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরির দাম ছিল ২৬০০০ টাকা (প্রায়)।

অর্থাৎ আপনি ২০০৮ সালে ২৬টি ১০০০ টাকার নোট দিয়ে এক ভরি স্বর্ণ পেতেন। আজ ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ৮৪০০০ টাকা। অর্থাৎ আজ আপনার ৮৪টি ১০০০ টাকার নোট লাগবে এক ভরি স্বর্ণ কিনতে।

এবার আসুন দেখি, এই এক হাজার টাকার মান এখন কত?

২৬০০০স্ট২৬=১০০০

২৬০০০স্ট৮৪=৩০৯

আপনার ২০০৮ সালের ১০০ টাকার নোটটির আজকের মূল্য ৩০৯ টাকা মাত্র। এখানে চালাকি করে বলা হয় যে স্বর্ণের দাম বেড়েছে। আপনিও সেটা ধরে নেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো, আপনার পকেটের/ব্যাংকের টাকার মূল্যমান কমেছে, যা আপনাকে বুঝতে দেওয়া হয় না।’

না হয় স্বর্ণের অলংকার ক্রেতা অবুঝই থেকে গেলেন।

স্বর্ণ ও টাকার হিসাবটা আর একটু পিছিয়ে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ডাইরেক্টরি অনুসরণ করে পেশ করা যাক। ১৯৭০-৭১ সালে ঢাকার বাজারে নিউ মার্কেটের মতো সম্ভ্রান্ত জায়গায় এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১৬০ টাকা। অর্থাৎ ১৬০ টাকার স্বর্ণের জন্য এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ৮৪০০০ টাকা। একই হিসাবে আপনার ১০০০ টাকার মূল্যমান সে ক্ষেত্রে দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৯০ পয়সা। ১৯৬৫-তে এক ভরির দাম ছিল ১৩৮ টাকা। অর্থাৎ তখনকার হিসাব ধরলে ১০০০ টাকা মূল্যবান ১ টাকা ৬৪ পয়সা।

১৯৫২ সালে সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৮৩ টাকা। মানে টাকা আর রুপি একই মাপের ধরলে এখনকার ৮৪০০০ টাকা মিলবে তখনকার ৮৩ টাকার স্বর্ণ। অর্থাৎ ১০০০ টাকার দাম স্বর্ণের হিসাবে ৭০ বছরের ব্যবধানে কমে দাঁড়িয়েছে ৯৯ পয়সার চেয়ে কিছু কম (০.৯৮৮ টাকা)।

সন্দেহ নেই এই হিসাবে এক ধরনের সমীকরণ রয়েছে। মাথাপিছু আয়ের প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্যান্য দ্রব্যের তুলনামূলক বিবেচনার কথা উঠতে পারে। তবে এটা তো সত্য ১৯৫২ সালে কেনা ৮৩ টাকার স্বর্ণ যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে ধরে রেখে ২০২২ সালে বিক্রি করলে ৮৪০০০ টাকাই হাতে আসত। অনেকের এসেছেও। ১৯৫২-তে ৮৩ টাকায় কেনা স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার এখনো যারা ধরে রেখেছেন, ধরে রাখুন এক লাখ টাকা পেত আপনাকে আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না। ৮৩ টাকায় স্বর্ণালংকারের একটা ছবিও হয়তো মিলবে না। সময় এসে গেছে।

মহাযুদ্ধকালের ব্যয় সংকোচন ফরমান

ভারত সরকারের ইনফরমেশন ও ব্রডকাস্টিং ডিপার্টমেন্ট দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইংরেজিতে যে সচিত্র ফরমান জারি করে রাজ্যসমূহে তা গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রচারিত হয়। বাংলার পত্রিকায় বাংলা ভাষায় তা প্রকাশিত হয়। এই ফরমানের টেক্সটসমূহ যেমন ছিল, ঠিক তাই উদ্ধৃত করছি:

আরও ব্যয় সংকোচন করুন

যুদ্ধের জন্য

শান্তির জন্য

মিতব্যয়ী হয়ে অভাব দূর করুন।

আজকাল অনেক জিনিসপত্রই দুষ্প্রাপ্য। আমদানি খুব কম। আপনার চাহিদা না কমালে গরিবরা তাদের নেহাত প্রয়োজনীয় জিনিসও পায় না। প্রত্যেক জিনিসই কম করে ব্যবহার করাই এখন স্বাদেশিকতা। মিতব্যয়িতা সব দিক দিয়ে ভালো আর্থিক ব্যাপারে তো বটেই। দৈনন্দিন ছোটখাটো সঞ্চয়ই মাসের শেষে মোটা হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের পরে জিনিসপত্রের দাম কমলে তখন বেশি টাকা খরচ করার সুযোগ হবে।

চারটি চিত্রে ব্যয় সংকোচনের চারটি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে :

১. গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিন।

যুদ্ধের জন্য পেট্রল দরকার।

২. শান্তি না আসা অবধি নতুন আসবাবপত্র কিনবেন না।

৩. চাকর কম রেখে চালিয়ে দিন।

৪. চিঠিতে কাজ চললে টেলিগ্রাম করবেন না।

যা না হলেও চলে এমন কিছু কিনবেন না।

বাংলাদেশ আর ঋণ নেবে না, কেবলই দেবে এমন মিনিস্টেরিয়াল ডিক্লারেশনের পরও বাংলাদেশ কিঞ্চিৎ বেকায়দায় পড়েছে, ‘তবে মাসখানেকের মধ্যেই এই অবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।’ তা নিশ্চয়ই হবে সে জন্য কিঞ্চিৎ ধৈর্য ধরতে হবে, ১০০ গ্রাম কাঁচা মরিচ কিনতে সরকারি গাড়ি কাঁচাবাজারে পাঠানো যাবে না, অনিবার্য না হলে বিদেশ সফর কমিয়ে আনতে হবে আশ্চর্য, ডিজিটাল বাংলাদেশেও ম্যানুয়াল আচরণ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণœ না করে পারে না। একমাত্র বড় ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়া আর সব কারবার ভিডিও কলে সেরেই নেওয়া যায়, কুইক রেন্টাল ভালো না মন্দ এসব প্রসঙ্গ না তুলে দিনে দু-চার-ঘণ্টা লোডশেডিং এমন মন্দ কিছু নয় পি কে হালদাররা ডলার যা নেওয়ার নিয়েছেন, নতুন পি কেরা যেন গডফাদার খুঁজে না পায় এসব আয়োজন নিশ্চয়ই করা হচ্ছে। যারা দেশকে শুষে খান তারাও জানেন দেশকে টিকিয়ে রাখতে হবে, না হলে তারা কি শোষণ করবেন!

আবার জিগায়...

কে মাহমুদের আঁকা একটি কার্টুন ক্লিপ অনেকের কাছেই পৌঁছে গেছে। ড্রাইভার ভ্যান নিয়ে বেরিয়েছেন। একজন অফিসগামী চাকুরে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, স্কুল ভ্যানের মতো অফিস ভ্যান সার্ভিস চালু করবা?

ভ্যান ড্রাইভারের জবাব, ‘আবার জিগায়... কাল থাইকা শুরু। আপনার ফেইসবুক আইডিটা দ্যান।’

এই টানাপড়েনের দিনে সরকারি গাড়িগুলোতে রেহাই দিতে, তেল বাঁচাতে, অফিস ভ্যান চালু করার কথা সরকার কেন ভাবছে না? ভ্যানগুলো পরিবেশবান্ধবও বটে। জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার উৎসব উদযাপন তো চলতেই থাকবে।

পাদটীকা : এই রচনাটির জন্য সামাজিক মাধ্যম (এ ক্ষেত্রে শুধু হোয়াটসঅ্যাপ) থেকে যেসব তথ্য ও উপাত্ত গ্রহণ করেছি তা ‘পাবলিক ডোমেইনভুক্ত’ বিবেচনা করে করেছি, সুতরাং কপিরাইট লঙ্ঘিত হয়নি। ধর্মীয় নিষ্ঠা নিয়ে যারা তেলের দাম বাড়িয়ে তেলের সঙ্গে অসম্পৃক্তদেরও যে উৎসব পালনের সুযোগ করে দিয়েছেন এই অর্থনৈতিক তত্ত্বটি যার মাথা থেকে এসেছে তাকে তো বলতেই হয়, মামা, অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার আসছে! নোবেল লেকচার লিখতে শুরু করে দিন।

লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত