অজ্ঞাত মামলা আর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:১১ পিএম

দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দিন দিন। বিভিন্ন স্থানে সংঘাত আর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। পত্রিকায় বড় বড় খবর আর পাঠক পড়ছেন সেসব ভীষণ আগ্রহ নিয়ে। রাজপথে উত্তেজনা না থাকলে তা নাকি রাজনীতি বলে মনে হয় না। এমনকি টেলিভিশনের টক-শো’তেও উত্তেজনা না ছড়ালে নাকি তা মানুষ দেখতে চায় না। যুক্তিপূর্ণ কথার চাইতে অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক কথা উচ্চস্বরে বললে নাকি দর্শক-শ্রোতাদের একটা বড় অংশ মনে করেন, দারুণ বলেছে, একেবারে প্রতিপক্ষকে শুইয়ে দিয়েছে। তর্কের মধ্যে মারমার কাটকাট ভাব থাকলে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের দর্শক সংখ্যা এবং মতামত প্রদানের হার বাড়তে থাকে তর তর করে। দর্শক-শ্রোতাদের এই ধরনের পছন্দের কারণ কী তা নিয়ে একটা গবেষণা হতে পারে, এবং তা মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে সহায়তা করতে পারে কিন্তু ব্যাপারটা যে গণতান্ত্রিক মানসিকতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অনুকূল নয় সেটা অনুভব করছেন সবাই।

কোনো রাজনৈতিক দল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা বলছে, একটি বড় জনসমাবেশ করেছে এটা কোনো খবর নয়। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে, আহত নিহত হয়েছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলন হয়েছিল খাদ্যের দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে। সরকারি দল টিটকারি করত এই বলে যে, এসব নিরামিষ আন্দোলন। এক পর্যায়ে আন্দোলন উত্তাপ ছড়াল, পুলিশের গুলিতে হতাহত হলেন অনেক আন্দোলনকর্মী। বিরোধী দলের জিজ্ঞাসা ছিল তখন, এবার কি আন্দোলনে আমিষ পাওয়া গেল? বাংলাদেশেও সমালোচনার ধরনটা সে রকমেরই। সরকারি দল বলতে থাকে, বিরোধীদের আন্দোলন করার সামর্থ্য নেই, জনগণ তাদের সঙ্গে নেই, এরকম আন্দোলন করে কিছু করতে পারবে না ইত্যাদি। এর ফলে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে তার কিছু নজির লক্ষ করা যাচ্ছে।

রাজনীতিতে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি থাকবেই। থাকবে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। পুলিশ এবং প্রশাসনের ভূমিকা তখন কীরকম হবে? তারা কি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী থাকবেন নাকি দলীয় কর্মীর মতো ভূমিকা পালন করবেন তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এর রাজনৈতিক সমাধান হয়নি বরং এই ধারণাটাই স্থায়ী হয়েছে যে, যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারা প্রশাসন ও পুলিশকে তাদের মতো করেই ব্যবহার করবেন। ফলে ক্ষমতাসীনরা আন্দোলনকারীদের পুলিশের ভয় দেখাবেন আর বিরোধী দল মোকাবিলা করবে পুলিশকে। পুলিশের ভূমিকা আর রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মনোভাব দুই ক্ষেত্রেই যখন মারমুখী অবস্থান তখন ক্ষমতাসীন দলের বক্তব্য উসকানির মতো শোনায়।

ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে পুলিশ নামে মাঠে, মারপিট করে, গুলি করে আবার মামলাও করে। এসব মামলার প্রকৃতিটাও ভিন্ন। আসামি করা হয় হাজার হাজার মানুষকে। গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছেড়ে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয় কর্মীরা। জেলে থাকে অথবা জামিন নিয়ে আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকে মাসের পর মাস। রাজনৈতিক বিরোধ পরিণত হয় রাজনৈতিক সহিংসতায় আর প্রতিহিংসাপরায়ণতায়।

হামলা মামলা গ্রেপ্তার তো আছেই এর সঙ্গে যুক্ত হয় গুম হয়ে যাওয়ার ভয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, দেশে কোনো গুমের ঘটনা ঘটে না। কিন্তু বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে গুম হয় এবং তা আতঙ্ক তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। যেমন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের এক জরিপে বলেছে গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে ৬০৪ জন গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের বিভিন্ন বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অথবা তারা হঠাৎ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। এসব নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের বেশিরভাগ আর তাদের স্বজনদের কাছে ফিরে আসেননি। আসক-এর মতে ৬০৪ জনের মধ্যে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, ৮৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, ৫৭ জন কোনো না কোনোভাবে ফিরে এসেছেন, বাকিদের খবর জানা নেই। একটা বিষয় খুবই আশ্চর্যের যে, যারা ফিরে এসেছেন তাদের কেউই বলছেন না যে কে তাদের আটকে রেখেছিল, তারা কোথায় ছিলেন এবং কীভাবে তারা ফিরে এলেন? একেবারে চুপচাপ হয়ে যান তারা।  

এ ধরনের কতটি ঘটনা ঘটেছে তা জানার উপায় কী? একটা উপায় সরকারি তথ্য, অন্যটি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট, যার বেশিরভাগই আবার পত্রিকার সংবাদ থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কিছুদিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে একটা জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে :  

২০২১ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন ৮০ জন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা গুলিবিনিময়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নিহত হয়েছেন ৮ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের পর শারীরিক নির্যাতনে ৬ জন, গ্রেপ্তারের আগে ১ জন ও পরে হার্ট অ্যাটাকে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশের কারাগারগুলোতেও মৃত্যুর ঘটনা কম নয়। ২০২১ সালে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে মারা গেছেন ৮১ জন। এর মধ্যে কয়েদি ২৯ জন এবং হাজতি ৫২ জন। আসক-এর পরিসংখ্যানে আরও তুলে ধরা হয়, ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন ১ জন।

সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বিচার প্রাণনাশ? বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামে এক ওয়েবিনারে কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়। তারা দাবি করেছেন সম্প্রতি এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং সিজিএসের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সিজিএসের কয়েকজন গবেষক গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন। তারা বলেছেন, আইনবহির্ভূত এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর পরিণতি বোঝার জন্য এই গবেষণাটি করা হয়েছে। তাদের গবেষণায় পাওয়া তথ্য ওয়েবিনারে প্রকাশ করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। প্রসঙ্গত তিনি জানান, ২০১৯-২০২১ পর্যন্ত তিন বছরের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা পরিচালনা করা হলেও এতে স্বাধীনতার পর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঘটা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর্যালোচনা রয়েছে। তারা গবেষণায় দেখিয়েছেন  বন্দুকযুদ্ধের ক্ষেত্রে পুলিশ এবং ডিবি পুলিশের সংশ্লিষ্টতা আছে ২৩৫টি ঘটনায় এবং র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা আছে ১৫৬টি ঘটনায়। তাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, আদালতের সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছয় ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এগুলো হলো বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, গোলাগুলিতে মৃত্যু, থানা বা রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যু, গুলিতে মৃত্যু এবং নির্যাতনে মৃত্যু। তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধ ৫১২ জন, ক্রসফায়ারে ৪ জন, গোলাগুলিতে ১৫ জন, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ১৫টি, গুলি করে হত্যা ৩৪ জনকে  এবং নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। সাধারণত গুলি ছোড়া হলে পুলিশের বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছে বোঝাতে বন্দুকযুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। তারা জানান সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী ৮৬ শতাংশ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এসব হত্যার ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা সংযোগ তারা দেখেছেন। তাদের মতে ২০০৫, ২০১৩ ও ২০১৮ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে নির্বাচনের আগে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বাড়ে। আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় এই ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালের ১৫ মে ‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ সেøাগান নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এই সময়কালে কোনো কোনো জেলায় দিনে একজনের বেশি মানুষও নিহত হন। কিন্তু মাদক বিক্রি কিংবা ব্যবসা কমেছে বলে মনে হয় না কারোরই। বরং মনে হতে পারে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা আড়ালেই এবং আরামেই থেকে যাচ্ছেন।  

এক্ষেত্রে আরও একটি ঘটনার কথা নিশ্চয়ই মানুষ ভুলে যায়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সন্ত্রাস দমনের নামে ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে যৌথবাহিনীর অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে ৫৯ জন মানুষ মারা যান। হৃদরাগে তাদের মৃত্যু হয়েছিল বলে সে সময় যৌথবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। ওই অভিযানের কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দিয়েছিল সে সময়কার সংসদ। যদিও পরে দায়মুক্তি বহাল থাকেনি। কিন্তু বিনাবিচারে হত্যার প্রবণতা কমেনি। 

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নিপীড়নের অনেক উদাহরণ দেশে আছে। এ ব্যাপারে বিদেশিরা উদ্বেগ জানানো আর সরকারকে ক্রমাগত উপদেশ দিয়েই যাচ্ছে। যে আমেরিকার সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য সরকার উদগ্রীব হয়ে থাকে সেই আমেরিকার  নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া কার্যক্রমের প্রধান মিনাক্ষী গাঙ্গুলী বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশে সরকারের যে আচার-আচরণ তার নজির তারা অন্য কোথাও দেখেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা ৯০টি দেশে কাজ করি। কখনই বলি না কোথাও আদর্শ অবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যাটা একেবারেই আলাদা। এখানকার সরকার কখনো স্বীকারই করতে রাজি নয় যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে।’ 

বিদেশিদের কথা থাক, সরকার স্বীকার করুক না করুক দেশের মানুষ কী দেখছেন এবং কী ভাবছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীর পল্লবী থানায় ২০১৪ সালে পুলিশি হেফাজতে বেধড়ক পিটুনিতে মৃত্যুবরণকারী জনির মায়ের আহাজারি, ‘ছেলে হত্যার বিচার কি দেখে যেতে পারব না!’ এরকম আহাজারি অনেক মায়ের।

ভয়ের পরিবেশে গণতন্ত্র থাকে না। মামলার ভয়, অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় থাকার ভয়, বছরের পর বছর মামলার জের টানার ভয়, মরে যাওয়ার ভয়ের পাশাপাশি গুম হয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে সুস্থ রাজনৈতিক চিন্তার চর্চা হবে কীভাবে?    

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত