স্মার্ট রাজনীতির খোঁজে

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২২, ১০:৪৭ পিএম

সম্প্রতি লালবাগ দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থিত হাম্মাম স্থাপনার আমূল সংস্কার হচ্ছে মার্কিন দূতাবাসের অর্থ সহায়তায়। বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আমাদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার একজন স্থপতিও আছেন। তিনি মাঝে মাঝে এসে তদারকি করেন। গত ৫ অক্টোবর আমরা একসঙ্গে লালবাগ দুর্গে কাজ করছিলাম। প্রতিবারই তাকে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করি। সেদিন লাঞ্চের সময় এ বিষয়ে গল্প হচ্ছিল। মিস্টার নিলম করি (স্থপতি) বলছিলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজাপাকসের পরিবার অগণতান্ত্রিক আচরণ করে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। সে তুলনায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনেক দিক থেকে ভালো। তবে মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তেমনভাবে গণতন্ত্রের পথে হাঁটছেন, বলা যাবে না। আমি বললাম এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার অনেক রাষ্ট্রেরই বড় বাস্তবতা। সরকারে যারা থেকেছেন এবং থাকেন তাদের সবারই ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি মঞ্চের আর বক্তৃতার ভাষা হয়ে গেছে। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আচরণ দৃশ্যমান থাকছে না। বিরোধী দলের সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচারেও গণতান্ত্রিক আচরণ তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার গণতন্ত্র ধ্বংস করছে বলে সরকার পক্ষকে দোষারোপ করছে। লক্ষণীয় এরা যখন সরকারে ছিল তখনো গণতন্ত্র লাঞ্ছিত হয়েছে।

কি সরকারি পক্ষ, কি বিরোধী পক্ষ সবারই কথায় বা রাজনৈতিক বক্তব্যে যেটুকু স্মার্টনেস প্রত্যাশিত তাও পাওয়া যাচ্ছে না। যেন একটা বৃত্তে ঘুরছেন সবাই। দুটো পক্ষই যেন বিবদমান। ফলে উভয় পক্ষের নেতাদের ছক বাঁধা কর্তব্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা। প্রত্যেক পক্ষের নেতা বা মুখপাত্রদের প্রতিপক্ষের মু-ুপাত করার জন্য গৎবাঁধা কথাই প্রতিদিন নিরলসভাবে বলতে হচ্ছে। টিভি ক্যামেরার সামনে প্রতিদিন তারা একই নিন্দা বক্তব্য দিতে কিছুমাত্র বিব্রত হচ্ছেন না। বিরোধীদলীয় নেতাদের বিশেষ জপমালা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ‘পদত্যাগ’। বিএনপি নেতারা সরকারের পদত্যাগ দাবি গত চৌদ্দ বছরে কত-শতবার যে করেছেন এর পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই।

সরকার এবং বিরোধী পক্ষের নেতাদের গৎবাঁধা বক্তব্য এতটা পানসে হয়ে গেছে যে এখন আর অধিকাংশ দর্শক-শ্রোতার শোনার আগ্রহ থাকছে না। বিরক্ত দর্শক এখন উভয় পক্ষের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ পর্ব এলে টিভির চ্যানেল পরিবর্তন করে। রাজনৈতিক শব্দাঘাতের এমন বাস্তবতা উপমহাদেশের অনেক রাষ্ট্রেই রয়েছে। কিন্তু এতটা গ্রাম্যতা জড়ানো নেই কোথাও। একুশ শতকে এসে রাজনীতির ময়দান এতটা আনস্মার্ট হবে তা ভাবা যায় না।

সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে নিজেদেরই যে স্বরূপ উন্মোচন করছেন তা কি বুঝতে পারছেন? উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষকে ভোট চোর বলছেন। উভয় পক্ষই পরস্পরকে সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, টাকা পাচারকারী হিসেবে মানুষের সামনে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষ তাহলে কোন আসনে বসাবেন আপনাদের? একেই বোধহয় বলে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গ করা।

পাকিস্তান পর্ব থেকে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী কয়েক বছর পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতারা কমবেশি নিজেদের গণমানুষের নেতা ভাবতেন। তারা তখনো ভাবতেন জনগণের শক্তিতেই সবাই শক্তিমান। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সামনে তেমন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল না। এরপর ক্ষমতার রাজনীতি নতুন চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়। বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে চলে যায় ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বহুকাল আগে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগ। বিএনপি ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায় ছাত্রদল। জিয়াউর রহমান ‘রাজনীতিকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জটিল করে দেওয়ার’ ঘোষণা দিয়ে অস্ত্র আর অর্থ শক্তিতে বলীয়ান করে তোলেন ছাত্রদলের ছেলেদের। ছাত্রলীগও বসে থাকবে কেন! কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রযোজনায় তারাও নিজ উজ্জ্বল ঐতিহ্য ভুলে লাঠিয়াল হয়ে যায় নিয়ন্ত্রণকারী দলের। এভাবে ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বের বদলে নিজ দলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে পড়ে।

এককালে বাম ধারার ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে জাসদের নিয়ন্ত্রণে জাসদ ছাত্রলীগও সরব ছিল। এই দলের ভাঙনের মুখে জন্ম হয়েছিল বাসদ ছাত্রলীগের। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী শিবিরও একসময় দাপুটে ছিল। রগকাটা রাজনীতির ধারক হিসেবে এই দলটির কুখ্যাতি ছিল। তবে এই দলের দাপট ছিল অনেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষ এদের গ্রহণ করেনি কখনো। সম্ভবত দল রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকায় এসব ছাত্র সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় এসে ছাত্রসমাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বটে; অস্ত্র শক্তিতে বলীয়ানও করেছিলেন তরুণদের। কিন্তু শক্তিধর ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মাঝখানে পরে সংগঠনটি কিছুকাল তাণ্ডব চালিয়ে পরে গুটিয়ে যায়। এরপর থেকে মূল দল সরকারে থাকলে যুগপৎ ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল পেটোয়া বাহিনী হিসেবে দাবড়ে বেড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসবের বাস্তবতায় ছাত্র রাজনীতি থেকে মেধাবী ছাত্ররা নিজেদের সরিয়ে আনে। রাজনৈতিক ক্ষমতাবান নেতারা নিজ নিজ ক্ষমতার ভিত শক্ত রাখতে ক্যাম্পাস দখলে রাখতে নির্ভর করেন এসব ছাত্র রাজনীতির লাঠিয়ালের ওপর। রক্তের স্বাদ পেলে বাঘ যেমন হিংস্র হয়ে যায় তেমনি এসব সংগঠনের ছাত্রনেতাদের চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজ বানিয়ে কাঁচা টাকার স্বাদ পাইয়ে দিয়ে পশু বানিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসে এরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বন্ধু না হয়ে প্রভুরূপে নিজেদের প্রকাশ করতে থাকে।

পাকিস্তান আমলে বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা আমরা জানি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সামনের সারিতে ছিল। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের চেয়ে পুরনো প্রতিষ্ঠান। তাই ছাত্রদলের মতো ছাত্রলীগ জাতীয় দলের পকেট থেকে বেরোয়নি। ফলে সে যুগে ছাত্রলীগ কারও আজ্ঞাবহ ছিল না। বৃহত্তর জাতীয় প্রয়োজনেই ছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাই সে সময় ছাত্র নেতাকর্মীদের নৈতিকতার মান অত্যুচ্চে ছিল। সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল ছাত্র আন্দোলনের প্রতি। আইউব খান এনএসএফ গঠন করে তার আজ্ঞাবহ ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এনএসএফের ছোবল বিষ ছড়াতে পারেনি সাধারণ ও রাজনীতি করা ছাত্রছাত্রীর মধ্যে।

ছাত্র রাজনীতি কলুষিত হওয়ার পথ তৈরি হয় স্বাধীনতার পর থেকেই। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠিত হওয়ার পর এই দলের ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্রলীগ ভেঙে একটি অংশ হয়ে যায় জাসদ ছাত্রলীগ, অপর অংশটি পরিচিত হয় মুজিববাদী ছাত্রলীগ নামে। পরে আবার জাসদ ভেঙে বাসদ আত্মপ্রকাশ করে। এই দলের ছায়ায় বাসদ ছাত্রলীগ মাথাচাড়া দেয়। এভাবে ছাত্র রাজনীতি নিজেদের স্বাতন্ত্র্য হারাতে থাকে। জাতীয় দলের আজ্ঞাবহ সংগঠনে পরিণত হতে থাকে। এরপর ছাত্র রাজনীতির বড় স্খলন দেখা যায় ১৯৭৫-পাবর্তী সময়ে। সামরিক ছাউনি থেকে জন্ম নেওয়া দল বিএনপি জন্ম দেয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। আওয়ামী লীগ নতুন প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ছাত্রদের বিএনপির মতো করে লাঠিয়াল বানাতে থাকে। এভাবে নৈতিকতার স্খলন ঘটতে থাকে ক্যাম্পাসগুলোতে।

এ ধারায় রাজনীতির-বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির শোভন প্রকাশ নির্বাসিত হতে থাকে। ছাত্ররাজনীতির সব স্খলন ঘটেছে এমনধারা পথপরিক্রমণের মাধ্যমে। আজ সব নৈরাজ্যের দায় অবশ্যই আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিতে হবে। কোনো দলের নেতৃত্বই যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছেন না। দলীয় ছাত্রদের কাঁধে ভর দিয়েই যেন ক্ষমতায় টিকে থাকা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশবাসীকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবর্ণ করে ফেলা হচ্ছে। দলকানা নন এমন মেধাবী শিক্ষার্থী আর শিক্ষকর চরম হতাশায় নিপতিত হচ্ছেন।

আমাদের দেশের জাতীয় রাজনীতির দশা এর চেয়ে কোনো অংশে ভালো নয়। বচনে ভাবনায় নেতারা একুশ শতকের উপযোগী স্মার্টনেস দেখাতে পারছেন না। জনগণের কাছে গিয়ে জনমনোতুষ্টির পথে না হেঁটে পরস্পরের মধ্যে রাজনৈতিক ঝগড়াকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যেন ভাবছেন ঝগড়ায় জিতলেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের হাতে। নেতারা বুঝে গেছেন জনগণের কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। তাই নেতাকর্মী-সমর্থকদের উসকে দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা অনেক বেশি সহজ।

আমাদের পথহারা রাজনীতির নেতা-নেত্রীরা জানেন রাজনীতি নামের বস্তুটি আফিমের মতো। একবার আসক্ত করাতে পারলে অন্ধভক্ত বানিয়ে ফেলা যাবে। এই ভক্তি কখনো রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান হওয়ার লোভে কখনো সহজ অর্থপ্রাপ্তির লোভে। রাজনীতির খাতায় নাম লেখালে অনেকেরই আর যুক্তি-বুদ্ধি ও বিবেক কাজ করে না। দেশপ্রেম নির্বাসিত হয়। তাই আসক্ত প্রজন্ম একবারও খুঁজে দেখে না কোন আদর্শের পথ অনুসরণ করছি এবং কেন করছি। কাকে বা কাদের নেতা মানছি! দেশ কল্যাণে তারা কতটা সততার পথে হেঁটেছেন।

দেশপ্রেমিক প্রজন্মের তো অনুপ্রেরণা হওয়ার কথা মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত চেতনা ধারণ করছে কারা? অথবা চেতনা থেকে সবাই দূরে সরে গেছেন কি না! ক্ষমতায় থেকে অথবা না থেকে কারা সন্ত্রাস-দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন? এসব না ভেবে যদি তারুণ্য কারও বা কোনো দলের প্রতি সমর্থন জানায় তাহলে তা হবে অন্ধ সমর্থন জানানো। এতে মুক্ত বিবেক লাঞ্ছিত হবে। সচেতন প্রজন্মের চাওয়া হবে সততার ওপর দাঁড়িয়ে একুশ শতকের উপযোগী স্মার্ট রাজনীতি। যেখানে নেতাদের প্রত্যেকটি শব্দ চয়ন হবে ওজস্বী-মার্জিত। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে প্রতিপক্ষকে। চলনে-বলনে-আচরণে প্রমাণ রাখতে হবে তারা জনগণের কল্যাণে নিবেদিত দেশপ্রেমিক দল। গণতন্ত্রের পথ ধরে হেঁটে তারা জনগণের কাছে পৌঁছাতে চান। জনগণই তাদেও পৌঁছে দেবে ক্ষমতার মসনদে।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত