নির্বাচনী হাওয়ায় সরল ভাবনা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২২, ০৯:৪২ পিএম

নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এটিই সংগত। হাওয়ার দাপট বিএনপির ঘরেই বেশি। অনেকদিন কোণঠাসা অবস্থায় ছিল বিএনপি। এখন তো ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। দলটির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সংকট সময়ে যেখানে শক্ত নেতৃত্ব দরকার তখন প্রধান নেতানেত্রী চিহ্নিত করা যাচ্ছে না এই দলটিতে। বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। বিএনপি নেতারা যেভাবে বিদেশে চিকিৎসার জন্য চাপ দিচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে না দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা তার রয়েছে। তারপরের নেতা তারেক রহমান। তিনি লন্ডন প্রবাসী। আইনের ভাষায় পলাতক আসামি। তার নেতৃত্ব নিয়ে শুনি দলের মধ্যে মত-দ্বিমত রয়েছে। প্রচারণা রয়েছে তার সঙ্গে জামায়েতে ইসলামীর সখ্য বেশি। বলা হয় জামায়েতের ফর্মুলায় যত উগ্রবাদী সিদ্ধান্ত তার মধ্য দিয়ে কার্যকর করার চেষ্টা করেছে বিএনপি। এখন অনেক বিএনপি নেতাও মনে করেন এসব ছিল বিএনপির রাজনৈতিক ভুল।

ক্ষমতায় থাকা দল কিছু কিছু ভুল করে। সেসব বিরোধী দলের রাজনীতিকরা লুফে নেন। উন্নয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারলেও তাদের ভুলও কিছু কম নয়। ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব খারাপ নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি কমাতে পারেনি সরকার। এরমধ্যে যুক্ত হয়েছে বৈশি্বক সংকট। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কষ্টের দায় কোনো না কোনোভাবে সরকারের ওপরই বর্তায়। আর এসব দুর্বলতাকে ইস্যু হিসেবে নিয়ে বিএনপির পক্ষে নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত করার কথা। দুই একটি জনসভায় লোকসমাগম করতে পেরে বিএনপি নেতারাও যেন আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন। জনসমাগমের পেছনের কারণটা সবারই জানা। আওয়ামী লীগ তাদের শক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে নিশ্চয়ই আরও বিপুল জনসমাগম করতে পারবে। দুপক্ষের জনসভায় একটি অংশে অভিন্ন মানুষই পাব। বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বেশি দরকার ছিল জনগণের কাছে যাওয়া। অতীতে ক্ষমতায় থেকে বিএনপি নেতাদের দুর্নীতির খতিয়ানও কিছুমাত্র কম ছিল না। ভোট ডাকাতি ও ভুয়া ভোটার তালিকা তৈরির অভিযোগও বিএনপির ওপর ছিল। আমাদের সব পক্ষের নেতাদের বুঝতে হবে এখন অ্যানালগ ধারায় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের রাজনীতি করে জনগণকে প্রভাবিত করা যাবে না। যারা দলনিষ্ঠ মানুষ তারা যুক্তি ও বিবেক দিয়ে কিছু দেখবে না কিন্তু তাদের সমর্থনই শেষ কথা নয়। সাধারণ ভোটার কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত হয়ে এখন মূল্যায়ন করতে শিখেছে। তাই জনগণের আস্থা নিয়েই এগুতে হবে।

নিকট অতীতে দৃষ্টি ফেরালে কি অনেক কিছু স্পষ্ট হয় না? রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০৮-এ সাধারণ মানুষের হিসাব মিললেও নির্বাচনে ভূমিধস পরাজয় বিএনপির মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। তারপরেও বাস্তবতা মেনে বিএনপির যেভাবে দল গুছানো ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করা উচিত ছিল সে পথে খুব একটা হাঁটেনি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভুলপথ পরিক্রমণ করেছিল তখন আওয়ামী লীগ। অভাবনীয় বিশাল বিজয়ে যতটা আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল তার সিকি পরিমাণ বিজয়ের কারণ মূল্যায়ন করে দেখেনি। আওয়ামী লীগের বিশ্বাস করা উচিত ছিল বিএনপির প্রতি মুখ ঘুরিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার বিকল্প না থাকায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারে চমকের ফুলঝুরি ছিল। যা আকৃষ্ট করতে পেরেছিল ভোটারকে। যদিও আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকদের আচরণ মানুষের অজানা নয়। তবুও নিরুপায় মানুষের লোভ হয় আশাবাদী হতে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতি ও রাজনৈতিক দুর্নীতিবাজদের ওপর যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল তাতে রাজনীতিবিদরা এবার শুদ্ধ হবেন। শুদ্ধ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবেন। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ প্রবল জনসমর্থনের শক্তিতে রাজনীতিকে পরিশুদ্ধের পথে নিয়ে যাবে। মহাজোটের ‘দিন বদলে’র সে্লাগানটিকে তাই মানুষ বিশ্বাস করেছিল। এমন প্রবল জনসমর্থনের শক্তিকে সে-সময় তেমন মূল্য দেননি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। উপরন্তু বিশাল সমর্থন পেয়ে যেন আত্ম অহংকার বেড়ে গিয়েছিল। কল্পতরুর মগডালে উঠে গিয়েছিলেন।

শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সততা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিল। আমলাতন্ত্রের ভেতরকার দুর্নীতির আরও বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। নগরবাসী থেকে শুরু করে দেশবাসীকে সেবা প্রদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোয় ঘুষ-দুর্নীতি অনেক বেশি প্রকাশ্য হতে থাকে। তিতাস, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, জমি কেনাবেচা, নামজারি, হোল্ডিং ট্যাক্স সব প্রতিষ্ঠানেই সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ ঘুষ সন্ত্রাসীদের হাতে বিপর্যস্ত। প্রশাসনে কঠিন দলীয়করণ, রাজনৈতিক দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও সরকারি প্রশ্রয়ে দলীয় সন্ত্রাসীদের আজদাহা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি ক্রমবর্ধমান অপকর্মের কারণে সাধারণ মানুষের চোখে সরকার অনেক বেশি হেয় হয়ে পড়েছিল। জন্ম দিয়েছিল শেয়ারবাজার ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি।

দেশবাসীর এসব কষ্ট লাঘবের জন্য সরকার ও সরকারি দল তখন তেমন আন্তরিকতা দেখাতে পারেনি। বরঞ্চ কল্পতরুর চূড়ায় বসে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বক্তৃতা বিবৃতিতে প্রতিনিয়ত অসহিষ্ণু আচরণ করতে থাকেন। সুশীল সমাজের সমালোচনা থেকে পথনির্দেশ না নিয়ে দারুণ হামবড়া শব্দে তাদের মুন্ডুপাত করছিলেন প্রতিনিয়ত। এসব আচরণ দেখে সচেতন মানুষ আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করে সরকারি দল ও সরকার যেন ইতিহাস আবর্তনের সত্য ভুলে গেছে। সাধারণ মানুষ যেমন সমর্থন দিতে জানে তেমনি সমর্থন তুলে নিতেও জানে। ক্ষমতায় থাকলে যেন অন্ধত্ব বরণ করে নিতে পছন্দ করে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি তার সময়ে ক্ষমতার দাপট কম দেখায়নি। অন্যায়, দুর্নীতির পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছিল। নানা অন্ধকার পথ তৈরি করে ভেবেছিল ক্ষমতা চিরস্থায়ী। এর পরিণতি ভালো হয়নি। গণশক্তির টর্নেডোতে দাবার ঘুঁটি উল্টে গিয়েছিল। এসব কারণে আশাবাদী মানুষ বিশ্বাস করেছিল বাস্তবতা হয়তো যথার্থ শিক্ষা দিতে পেরেছে আওয়ামী লীগকে। কিন্তু লঙ্কায় গিয়ে হনুমান হওয়ার প্রবণতা থেকে বেরুতে পারল না কোনো পক্ষ।

অতঃপর নির্বাচনী পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আগের নীতি থেকে ফিরে আসে। ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগ উত্থাপিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিএনপির পছন্দ হয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই পদ্ধতি মানায় না। তবুও গণতান্ত্রিক দল বলে দাবিদার দলগুলো থেকে অমন দাবি উঠে আসে কারণ তারা সরকার ও সরকারি দলকে বিশ্বাস করে না। সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে এমন আশঙ্কা থাকে। সে-সময় বিএনপি নেতৃত্ব সুশাসন উপহার দিতে না পারায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। তাই তারা আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সমর্থন জানিয়েছিল। জনসমর্থনের উত্তাপে বিএনপি জোট সরকার মানতে বাধ্য হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি। এরপরে এই তথাকথিত নিরপেক্ষ সরকারও সমালোচিত হয়েছে। আজ বিএনপি আবার তাদের অপছন্দের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সোচ্চার। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে একসময় বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ হরতালে হরতালে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল জনজীবন। এখন ভিন্ন থিওরি দিচ্ছে। একেই বোধ হয় বলে ‘রাজনীতি’!

২০১৪-এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব আত্মচৈতন্যে ফিরতে পেরেছিলেন। এটাকে আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা নেতৃত্বগুণের সাফল্যই বলতে হবে। এক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃত্ব অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তারা স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া, আপসহীন নেত্রী আর তারেক রহমান জিন্দাবাদের মধ্যেই আটকে ছিলেন। একটি দুর্নীতিপরায়ণ দলের তকমাই বেশি জুটেছে বিএনপির। ক্ষমতায় থাকতে এমন কোনো দৃশ্যমান কর্ম রেখে যেতে পারেননি যা আজ নির্বাচনের মাঠে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করবেন। অন্যদিকে পরিকল্পনামাফিক কর্মসূচি নিতে থাকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। সাফল্যের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পেরেছে। বিদ্যুতের সংকট অনেকটা সুরাহা করতে পেরেছে। নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। নাগরিক দুঃখ লাঘবে অনেক উড়াল সেতু হয়েছে। মেট্রোরেল এখন বাস্তবতার সন্নিকটে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। অর্থনীতির সূচক দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। দাঁড়াতে যাচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে। সাধারণ মানুষ এসবের ইতিবাচক ফল ভোগ করছে। তাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন আসছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বর্তমান সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, চিকিৎসা সুবিধা ইত্যাদির সুফল ভোগ করছে। নির্বাচনের মাঠে এসব কি আওয়ামী লীগের পক্ষে শক্তি জোগাবে না?

আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্ভাগ্য নির্বাচনী ডামাডোলের সময়ে বৈশি্বক সংকটের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের দিকে। এ-সময় যতটা দক্ষতার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এ থেকে বিএনপি রসদ সংগ্রহ করতে পারে। তবে সে পথ বিএনপির জন্য খুব যে কুসুমাস্তীর্ণ হবে তেমন মনে হয় না। কারণ সরকারি দুর্নীতির কথা বলতে গেলে তাদের সময়ের দুর্নীতির কথা সামনে চলে আসবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গ এলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সঙ্গে বিএনপির বন্ধুত্বের কথা চলে আসবে। তবে যদি বিএনপির নেতৃত্ব দলীয় নীতিনির্ধারণে আন্তরিক হতে পারেন, দলকে সুসংগঠিত করতে পারেন, প্রয়োজনে আন্দোলনের জন্য মাঠে নামতে নেতারা আত্মপ্রত্যয়ী হতে পারেন তাহলে দলটির পথ পরিক্রমণ সহজ হতে পারে। যে অবস্থায় বিএনপি দাঁড়িয়েছে তাতে ক্ষমতায় আসার নানা অন্ধকার পথ আবিষ্কারের চিন্তা না করে ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথেই এগিয়ে যাওয়া উচিত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাফল্যের পালকে অনেক সোনালি আভা লাগাতে পারলেও সরকার কালিমামুক্তও নয়। বর্তমান বাস্তবতায় এই দলটির শুদ্ধতার পথে হাঁটার সুযোগ অনেক বেশি।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত