স্কুলে ভর্তির জন্য লটারি পদ্ধতির শুরুটা হয় করোনা মহামারীর সময়ে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুলগুলো বন্ধ থাকার পর, এই ব্যবস্থাতেই নতুন ক্লাসে ভর্তি নেওয়া হয় শিশুদের। এর আগ পর্যন্ত ভর্তি-যুদ্ধ নামে এক ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হতো কোমলমতি শিশুদের। ৪/৫/৬ বছর বয়সী শিশুদেরও সারা বছর ধরে ভর্তি কোচিংয়ের নামে অমানুষিক চাপ দিয়ে অভিভাবকরা তাদের নামিয়ে দিতেন যুদ্ধে। ‘ভালো স্কুল’ বলে যেগুলো পরিচিত সেগুলোতে আসন সংখ্যা যত, তাতে এই সব খুদে যোদ্ধাদের সবার সংকুলান হতো না স্বাভাবিকভাবেই, ফলে যুদ্ধের ময়দানে নিহত হতো তাদের স্পিরিট। নিজেদের আশা পূরণ না হওয়ার দুঃখে কাতর অভিভাবকরা যদিও সেই হত্যাকাণ্ডের খোঁজ খুব একটা রাখেন না।
অভিভাবকদের কেউ কেউ অবশ্য এই যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন, লটারি ব্যবস্থা তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কোচিং, ভর্তি বাণিজ্য, শিশুদের অন্যায্য প্রতিযোগিতার চাপ থেকে রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন শিক্ষামন্ত্রীও।
তবে এ বছর লটারি ব্যবস্থার বেশ কিছু দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়েছে একই তালিকায় এক শিশুর নাম বারবার এসেছে। লটারি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে অনিয়ম শুরু করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসৎ শিক্ষক-কর্মচারী থেকে শুরু করে অভিভাবকরাও। একই শিশুর নামে অবৈধভাবে একাধিক জন্মসনদ তৈরি করে প্রাণপণে তারা পছন্দের স্কুলে সন্তানকে ভর্তির চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ফলে প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে পুরো পদ্ধতিটিই। ভাগ্যপরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া অভিভাবকদের অসন্তোষ তো রয়েছেই। অনেকেই বলছেন, লটারির কারণে অনেক ‘মেধাবী’ শিশু ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। জীবনের সব পর্যায়েই যেহেতু পরীক্ষা দিতেই হয়, শৈশব থেকেই তার অভ্যাস করাতে হবে, এমনও যুক্তি দিচ্ছেন কেউ কেউ। লটারিতে সুযোগ না পেয়ে শিশুদের মানসিক যন্ত্রণার কথাও বলছেন অভিভাবকরা।
প্রত্যেকটি বাচ্চাই মেধাবী। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেই মেধা কীভাবে প্রস্ফুটিত করতে হয় তার সঠিক কৌশল নেই। আর লটারিতে সুযোগ না পাওয়া যেমন দুঃখজনক, সারা বছর অসম্ভব চাপ নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে না টেকাটা বাচ্চাদের জন্য আরও ভয়াবহ। স্কুল-সমাপনী পরীক্ষা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় যে বয়সে, সে বয়সে হয়তো এই চাপ নেওয়া যায়, কিন্তু স্কুলপড়ুয়া ছোট ছোট শিশুদের সেই চাপ দেওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। তাও যদি এই পরীক্ষা অসম না হতো! গুটিকয়েক তথাকথিত ভালো স্কুলে কয়টি বাচ্চার সুযোগ পাওয়া সম্ভব? আর পরীক্ষা দিয়ে পাস করা শিশুরাই শুধু মেধাবী, লটারিতে চান্স পাওয়ারা মেধাবী না এরকম ভাবাও ঠিক না।
লটারিতে চান্স না পাওয়া ভাগ্যাহত শিশুদের (নাকি অভিভাবকদের) মানসিক যন্ত্রণার কথা যদি বলতে হয়, শিশু জানবে কেন সে লটারিতে চান্স পায়নি? বা সে এখন যে স্কুলে পড়ে সেটা ভালো না? এই সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা অভিভাবকরা নিজেরা নিলেই পারেন কিন্তু। শিশুদের যেহেতু পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে না, লটারির এত খুঁটিনাটি তাকে জানিয়ে ভারাক্রান্ত করার তো কোনো প্রয়োজন নেই। লটারি ব্যবস্থা যদি টিকে থাকে, এক বছর না পেলেও পরের বছর আবার চেষ্টা করার সুযোগ থাকবে।
আর এক বাচ্চার একাধিক স্কুলে সুযোগ পাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক, তার বিপরীতে বলা যায়, যে বাচ্চা একসঙ্গে ৫টা স্কুলে সুযোগ পাছে, সেও কিন্তু একটা স্কুলেই ভর্তি হয়। ফলে ওই ফাঁকা সিটে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে বাচ্চা ভর্তি করার সুযোগ থাকে।
বাচ্চার ‘মেধা’ যাই হোক, ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সবারই পাওয়া উচিত। তবে এখানে ‘ভালো’ স্কুল বলতে আমরা যা বুঝি তা আসলেই কতটা ভালো, সেটাও বিবেচনা করা উচিত। বাসায় কিছুটা যত্ন নিলে, যে কোনো স্কুলে থেকেই ভালোভাবে পড়াশোনা করানো সম্ভব। বিশেষ করে যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি শিশুকে ভালো পরিবেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ করে দিতে পারছে না, তখন কিছুটা দায়িত্ব তো পরিবারের ওপরেও বর্তায়। তবে রাষ্ট্র যাতে তার এই দায়িত্ব পালন করে, সেজন্য সরকারকে হিসাব দিতে বাধ্য করাও সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।
জন্মসনদ তোলায় অনিয়ম, স্কুলে দুর্নীতি, এই ঘটনাগুলো দেশের সব পর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতি সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ার একটা ধারাবাহিকতা মাত্র। এর সমাধান করতে হলেও, সেই মূল জায়গাতেই যেতে হবে।
এই আলোচনা শুরু হলে অবশ্য কেঁচো খুঁড়তে সাপের দেখা পাওয়া অবশ্যম্ভাবী, আর সেই সাপের সঙ্গে লড়াই করার মতো সাহস, কথা কিংবা সামর্থ্য সবার নেই। তাছাড়া, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে গোটা একটা গ্রিক ট্র্যাজেডি লিখে ফেলা সম্ভব। তবে এই ‘লটারি না মেধা যাচাই’ বিতর্কে সেসব বাদ দিয়ে খুব সুনির্দিষ্ট কিছু আলাপ হওয়া জরুরি।
ভর্তিযুদ্ধের নামে শিশুদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, আবার তা ফিরে আসুক তা কারোরই কাম্য নয়। কোচিং আর ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত যারা তারাই সম্ভবত আবারও ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার পক্ষে ওকালতি করছেন। সন্তানের মঙ্গল কীসে, তা না বুঝেই এক শ্রেণির অভিভাবকরাও মরিয়া হয়ে উঠেছেন ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনতে। নিশ্চিত করেই বলা যায়, পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হলে টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনতেও পিছ-পা হবেন না কিছু অভিভাবক।
সেই পথে আর ফিরে না গিয়ে, লটারি পদ্ধতিই স্কুলে ভর্তির জন্য স্থায়ী করে দেওয়া উচিত। অন্তত প্রথম কয়েকটি শ্রেণির জন্য হলেও। আর এই পদ্ধতিতেও যেসব অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে কিছু সংশোধনও আনা যেতে পারে।
লেখক : গণমাধ্যম বিষয়ক উন্নয়নকর্মী
