শুনি তো সেই কোন ছোটবেলা থেকেই যে, কলম তলোয়ালের চেয়েও শক্তিশালী। কিন্তু ইদানীং এই বয়সে এসে কেন জানি না বড় ধাঁধায় পড়েছি। বুঝতে পারছি না আদৌ কলম কতটা শক্তিশালী। কত লিখব, কত বলব জমাট বাঁধা এই অন্ধকার সময়ের কথা। সব লেখার কী স্বাধীনতা আছে! যেটুকু যা লিখি, সেখানেও কিছু লোক এসে হুমকি দেয়, এসব চলবে না। সত্যি কথা লিখলেও নাকি ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। মুশকিল হচ্ছে, যারা আমাকে হুমকি দেয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় গালমন্দ করে, অমুকের দালাল বলে, তারা বুঝতেই চায় না যে, আধুনিক পৃথিবীতে, প্রযুক্তির যুগে কোন দেশে কী ঘটছে তা কোথাও ধামাচাপা দিয়ে গোপন করা যায় না। তুমি সত্য কথা চাপা দিতে জেলে দেবে, ধমকাবে, বড়জোর খুন করবে তাতেও চিরদিন কখনোই শাসকের কুকীর্তি চাপা থাকবে না। আমার দেশেই বিজেপি শাসনে, কালবুর্গি, পানেসর, স্ট্যান স্বামী, গৌরী লঙ্কেশের মতো স্পষ্ট বক্তাকে সত্যি কথা বলার ‘অপরাধে’ মরতে হয়েছে। এখনো আর কতজনকে সেই তালিকায় দেখতে হবে জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি যে, আমার দেশ আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
যেভাবে আমাদের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যাথলিটদের রাস্তায় ফেলে মারা হয়েছে, যেভাবে দিনের পর দিন তাদের অসম্মান করা হচ্ছে বিজেপি নেতা ব্রিজভূষন শরন সিংকে বাঁচাতে, যে আড়ম্বর করে ঢাকঢোল পিটিয়ে সাধু সমাবেশ করে কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করে নতুন সংসদ ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন হলো এবং যার বা যাদের কুৎসিত বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও রেল দুর্ঘটনায় শত শত লোকের মৃত্যু হলো তার প্রত্যেকটি সম্পর্কে একটি কথাই বলার অশ্লীল। অশ্লীল এবং অবশ্যই চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন। অন্তঃসারশূন্য, বাকপটু, দাম্ভিক, চরম অসত্য কথনের নায়কদের পক্ষেই এই নির্মমতা সম্ভব।
কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব তাই তো বুঝতে পারছি না। প্রত্যেক ঘটনার পেছনে আছে আমাদের ক্ষমতায় মদমত্ত সরকারের অপদার্থ আচরণ। একদা ভারতের বহির্বিশ্বে সুনাম ছিল জোট নিরপেক্ষ নীতির কারণে। জওহরলাল নেহরু, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী থেকে রাজীব গান্ধী, হাজারো সমালোচনা সত্ত্বেও তাদের বিদেশনীতি মোটের ওপর ছিল আন্তর্জাতিক মহলের প্রশংসিত। বিজেপি ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে সেই সুনামটুকুও যত দিন যাচ্ছে তত তলানিতে এসে ঠেকছে। চীন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা না হয় বড় দেশ, মিয়ানমার ধরে নিলাম মিলিটারি রেজিম রয়েছে, কিন্তু এখন তো দেখছি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার নেপাল, ছোট্ট ভুটান তারাও সমান ক্ষুব্ধ ভারতের দাদাগিরি দেখে। বাংলাদেশের সরকার সাধারণভাবে চুপচাপ থাকলেও তাদের বিপুলসংখ্যক জনগণের মধ্যে যে ভারতবিরোধী ক্ষোভ বাড়ছে তা সে দেশে গিয়ে রাস্তাঘাটে একটু-আধটু কান পাতলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
মনে আছে কয়েক বছর আগে ঢাকা এয়ারপোর্টে, ইমিগ্রেশন করার সময়ে, খুব ভদ্র গলায় এক বাংলাদেশের আধিকারিক জানতে চেয়েছিলেন, আপনারা আমাদের পানি দেন না কেন! বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফের ও ইমিগ্রেশন অধিকাংশ অফিসারদের বড় অংশ যে আচরণ পড়শি দেশের নাগরিকদের সঙ্গে করেন তা কোনো সভ্য দেশ করে না। সীমান্ত হত্যা নিয়ে বলতে গেলে তো আস্ত বই হয়ে যাবে। পাশাপাশি ঘুষপেটিয়া ও অন্যান্য বিদ্বেষমূলক কুৎসা তো সংঘ পরিবারের দৈনন্দিন রুটিন। বাংলাদেশ যেহেতু পড়শি, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনতার বাসস্থান, তাই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে তাদের জুজু দেখিয়ে মিথ্যা বলে বলে মেরুকরণ করা বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা। সমস্যা হচ্ছে, যে বাংলাদেশের অনেক প্রগতিশীল লোকজনকে দেখি বিভ্রান্ত হয়ে ভারতের শাসক ও জনগণের প্রতিবাদী অংশকে সমার্থক করে তুলতে। নেপাল ও অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রেও এই সমস্যা বাড়ছে।
আর এখন তো এই সেন্ট্রাল প্লাজার দেয়ালে ভারত সরকার যে ম্যুরাল বসিয়েছে তাতে তাদের চিন্তাভাবনা পুরোপুরি বেআব্রু হয়ে গেছে। সেই ম্যাপে অখণ্ড ভারতের কথা বলা হয়েছে। যে ভারতের অঙ্গ হয়ে শোভা পাচ্ছে পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ। এ ঘটনা নিছক আস্ফালন বা দাদাগিরি নয়। এই অখণ্ড ভারত জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের শাসকদের মূল মস্তিষ্ক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কাক্সিক্ষত জনপদ। আপনি নাগপুরে আরএসএসের সদর দপ্তর বা কলকাতার কেশব ভবনে গিয়েও একই মানচিত্র দেখবেন। এ নিয়ে আরএসএস কর্তাদের কোনো হেলদোল নেই। তারা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কৌশলেও অন্য দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে বহুদিন ধরেই সক্রিয়। কী তাদের বিশ্বাস? সেটা না হয় আরএসএস নেতাদের মুখেই শুনুন।
২০১৭ সালের সাতাশ অক্টোবর, আরএসএস সুপ্রিমো মোহন ভাগবত দলের কর্মিসভায় বলছেন, ‘জার্মানি কাদের রাষ্ট্র? জার্মানদের। ব্রিটেন কাদের? ব্রিটিশদের। আমেরিকা আমেরিকানদের। ফলে কোনো সন্দেহ নেই, হিন্দুস্তান হচ্ছে হিন্দুদের রাষ্ট্র। অন্যান্য সম্প্রদায় এখানে থাকতে পারবে অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি মেনে, ভারত মাতার সন্তান হয়ে...।’
ঘুরেফিরে এই দর্শনের ফেরিওয়ালা বিজেপি। ১৯২৫ সালে আরএসএস জন্ম নিয়েছিল। ১৯৫১ সালে জন্ম নেয় তাদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ভারতীয় জনসংঘ। তার অনেক পরে জনতা পার্টি ভেঙে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। আজ আরএসএসের প্রচারক নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি এ দেশের সর্বেসর্বা। আরএসএস আগামী বছর শতবর্ষ পালন করবে। ফলে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন জোট ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করার পরম মুহূর্ত আগত ভেবে তারা এমন বেপরোয়া হয়ে যাবতীয় আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে আরএসএসের মানচিত্রকে দেশের বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন। এসব হচ্ছে ছোট ছোট টেস্ট কেস। কে কতটা গর্জে ওঠে দেখে নেওয়া। কোন দেশ কতটা গুরুত্ব দিয়ে নিজের ভূখ- হাতছাড়া হতে চলেছে দেখেও নীরব থাকে না, মেরুদণ্ড সোজা রেখে প্রতিবাদ করে তাও পরখ করা। এখন অবধি যা দেখলাম, সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ভারতকে হুমকি দিয়েছে নেপাল। পাকিস্তান অসন্তুষ্ট। তবে লিখিতভাবে সেরকম কিছু বলতে শুনিনি। বাংলাদেশের সরকারের কোনো বিবৃতি এখনো চোখে পড়েনি।
ইতিমধ্যেই বিজেপি অনুগত অনেকেই মানচিত্রটা আসলে পুরনো সময়ে ভারত দেশটি কেমন ছিল, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চেয়ে ম্যুরালটি করা হয়েছে বলে যাবতীয় দায় থেকে সরকারকে মুক্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। বিজেপির একাংশ বলতে চাইছেন, ও তো সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে ভারত জনপদের ছবি। চ-াশোক অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের পর কীভাবে অহিংস নীতি গ্রহণ করে ধর্মাশোক হয়ে উঠলেন এ মানচিত্র সেই সময়ের সাক্ষী। কোনো কোনো মহল দাবি করছে, ব্রিটিশ আসার আগে যে সুপ্রাচীন সংস্কৃতি এ দেশে ছিল এই মানচিত্র তার সাক্ষ্য দেয়। মজা হচ্ছে, ঘুরেফিরে সেই বহুত্ববাদী সংস্কৃতি অস্বীকার করে রামায়ণের কল্পিত কাহিনি বা প্রাচীন ভারতগাথা জনমনে ফিরিয়ে আনা।
হিন্দু বা মনুবাদী কালচারাল হেজিমনি চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কিন্তু হিন্দুত্ববাদী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলের নতুন নয়। এ কাজ তারা বহুদিন ধরেই কাঁটাতারের রাজনৈতিক সীমানা লঙ্ঘন করছে সেটা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। ফলে মানচিত্র দেখে অবাক হলেও চমকে যাওয়ার কিছু নেই। আর একটা সূক্ষ্ম অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একদিক অনেকের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। সেটা হচ্ছে নানান কৌশলে গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব বড় মুখে ঘোষণা করা। সে অশোক বলুন বা চোল সাম্রাজ্যের সেঙ্গোলÑ সব মিলিয়ে রাজরাজড়ার যুগবন্দনা। ঠিক সে কারণেই নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর সৌজন্য দেখানোর প্রয়োজনটুকুও অনুভব করেন না মোদি। শরীরী ভাষ্যে তিনিই হয়ে ওঠেন মহারাজাধিরাজ। নিমেষে ভারত চলে যায় তপোবনের কালে। সাধুদের মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আভূমি নত হয়ে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে তিনি হাঁটতে থাকেন। হাতে থাকে আরএসএসের অদৃশ্য গেরুয়া ঝা-া। অনুগতরা কলরব করতে থাকেন। জয় ঘোষণা হতে থাকে, এক জাতি, এক পতাকা, এক নেতার। নিন্দুকদের কেন জানি না কারণ ছাড়াই হিটলার-মুসোলিনিকে মনে পড়ে যায়।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
[email protected]