বিরোধিতার মধ্যেই মোদির ওয়াশিংটন সফর

আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ১০:৩৪ পিএম

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওয়াশিংটন সফরের আগে প্রস্তুতি হিসেবে ঝটিকা সফরে নয়াদিল্লি এলেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান। তার এ সফর কিন্তু অস্বাভাবিক। সাধারণত পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনীতিকদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্পষ্টতই খোদ হোয়াইট হাউজ এই রাষ্ট্রীয় সফরটি পরিচালনা করছে। তারাই এর সরাসরি দায়িত্ব নিচ্ছে।

এটাও কিছুটা অস্বাভাবিক যে, সুলিভান নয়াদিল্লিতে বাছাই করা সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে সফরের কিছু সম্ভাব্য ফলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অথচ আমাদের নিজস্ব পক্ষ এখনো সেগুলো নিয়ে কোনো কথা বলেনি। সুলিভান দৃশ্যত এ সফরের সম্ভাব্য ফলাফলের বিষয়ে লোকজনের ব্যাপক আগ্রহের বিবেচনায় আমাদের সরকারকে এ ক্ষেত্রে টেক্কাই দিলেন। মিডিয়ারও ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে নরেন্দ্র মোদির এ সফর। তিনি কম্পিউটারের সেমি-কন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে সহযোগিতায় ‘উল্লেখযোগ্য ফলাফল’ এবং ‘অনেকগুলো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘোষণার’ সম্ভাবনার কথা বলেছেন।  এর মধ্যে আরও থাকবে ৫জি, ৬জি ও ওপেন আরএএন চালু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মেশিন লার্নিং এবং অ্যাডভান্সড ওয়্যারলেস পদ্ধতির বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের মতো ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি। অত্যাধুনিক বিমানের ইঞ্জিন জিই ৪১৪ বিষয়ে, তিনি অগ্রগতির প্রচেষ্টার কথা বলেছেন কিন্তু ঠিক কোন ক্ষেত্রে সে সম্পর্কে বাড়তি  কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের সুলিভান বলেন, ‘লক্ষ রাখুন এবং দেখুন আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।’

সুলিভান দুই দেশের প্রতিরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ শৃঙ্খল আরও একীভূত করার দীর্ঘমেয়াদি দূরকল্প এবং ‘ভারতের স্বার্থের অনুকূল’ এমন প্রযুক্তি স্থানান্তরের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এ লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মার্কিন সরকারের প্রতিটি বিভাগকে ভারতের সঙ্গে গভীরতর প্রতিরক্ষা বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘অপ্রয়োজনীয় এবং সেকেলে’ বাধা এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কথার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে এই যে, বিস্তৃত এই ক্ষেত্রটিতে চলার গতিপথটি তৈরি করা হচ্ছে। এজেন্ডাকে বাস্তবায়িত করার জন্য এখনো অনেক কাজ বাকি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দ্য ইকোনমিস্টের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সফরের ফলাফল সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে সংযত ছিলেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন পক্ষেরই বলা উচিত তারা কতটুকুর ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। আর কূটনীতির খেলায় দীর্ঘ সময় ধরে থাকার অভিজ্ঞতার নিরিখে এটা স্বাভাবিক যে, তিনি ‘সতর্ক’ থাকবেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা এড়িয়ে চলবেন। জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। দেখতে হবে প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন পৌঁছানো নাগাদ আমরা কতটা কী গুছিয়ে আনতে পারি।’ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় ভারতবিরোধী লবি যতটা সম্ভব এই সফরের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে উদ্যত। বাইডেন প্রশাসন এই সফরটিকে যে গুরুত্ব দিতে চায় তার পরিপ্রেক্ষিতে এসব তৎপরতা খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। তবে এটি মার্কিনিদের সঙ্গে কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় তারই পরিচায়ক।

কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস) ১৫ জুন ‘ভারত : মানবাধিকার পরিস্থিতির মূল্যায়ন’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই অত্যন্ত নেতিবাচক প্রতিবেদনটি বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সম্প্রতি ভারতের বিরুদ্ধে যা লিখেছে তারই একটি সংকলন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতকে ‘মার্কিন সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ এবং কিছু বেসরকারি সংস্থা অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের (যার মধ্যে অনেকগুলো গুরুতর) স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনা রাজ্য এবং ফেডারেল সরকারের এজেন্টদের হাতে সংঘটিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বে, বিশেষ করে ২০১৯ সালে তাদের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ এবং মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনের ঝোঁকটি কোনদিকে তা স্পষ্ট। প্রতিবেদনে সুইডেনভিত্তিক ‘ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসিজ’ প্রকল্পে উল্লেখ করা নিন্দাও তুলে ধরা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, ভারত একটি ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ এবং ‘গত ১০ বছরের সবচেয়ে খারাপ স্বৈরতন্ত্রগুলোর মধ্যে একটি’। বলা হয়েছে, ফ্রিডম হাউজ ভারতকে আবারও কেবল ‘আংশিকভাবে মুক্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সংখ্যালঘুদের নিপীড়নের বিষয়টিও উদ্ধৃত করা হয়েছে। যারা এ প্রতিবেদনের খসড়া তৈরি করেছেন তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা স্পষ্ট। প্রতিবেদনের সঙ্গে থাকা মানচিত্রটি উস্কানিমূলকভাবে অরুণাচল প্রদেশের ওপর চীনের দাবিকে দেখায়। অথচ মার্কিন সরকারের অবস্থান রাজ্যটির ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বকেই স্বীকৃতি দেয়। নিউইয়র্কের কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনসের প্রকাশিত ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নালে ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, গণতন্ত্রের পিছিয়ে যাওয়া এবং ইউক্রেন সংঘাতের বিষয়ে অবস্থান নিয়ে অনেক নিবন্ধই প্রকাশিত হয়েছে। এসব স্পষ্টতই একটি প্রচারণা, যা জার্নালটির রাজনৈতিক, একাডেমিক এমনকি নৈতিক মানকে প্রতিফলিত করে।

মার্কিন প্রশাসনের অধিকতর দায়িত্বশীল, পরিপক্ব ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি এবং মার্কিন মিডিয়া, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং ভারতবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের দেশটির বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘গেরিলা যুদ্ধের’ মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর দ্য ইকোনমিস্টের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারে এটির প্রতিই ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘অনেকগুলো মিডিয়া হাউজ, কিছু থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, অনেক আন্দোলনকর্মী, সংগঠন এবং অনেক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আমাদের এই সমস্যাটি হচ্ছে। আমাদের নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে বলে তারা এসব করতে শুরু করেছে।’

এনডিটিভি অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

লেখক:  ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং কূটনীতিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত