আমরা যখন মাস্টার্সে পড়ি, আমাদের ঠিক আগের ব্যাচের বড় ভাই প্রথম শ্রেণি পাওয়া মনিরুস সালেহীন টিপু আমাদের শিক্ষক হলেন। আমরা জানি, আশির দশকে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণি পাওয়া মোটামুটি একটি রেয়ার বিষয় ছিল। একই হলে কাছাকাছি রুমে থাকতাম। গল্প আড্ডা বড় ভাইয়ের মতোই হতো। হঠাৎ স্যার হিসেবে ক্লাসে এলেন, কী বলে সম্বোধন করব? ভাই না স্যার? ক্লাসে স্যারই বলতাম। ক্লাসের বাইরে ‘ভাই’। একদিন শুনলাম, টিপু ভাই ডিপার্টমেন্টে আর নেই, সিভিল সার্ভিসে চলে গেছেন। প্রশাসন পরিচালনার জন্য তাদের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রয়োজন। অনেক সিএসপি অফিসার এ রকম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকে বড় আমলা হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে সরকারি ছাত্র সংগঠনের চোখ রাঙানো দেখা আর ডাইনিং হলে ডালের পানি খাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়া; এগুলো সামলিয়ে ক’জনের পড়াশুনা করার ধৈর্য থাকে? আমরা তো মেধাবীদের ধরে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সেভাবে উপযোগী করতে পারিনি। সেটি তো তাদের একার দোষ নয়, জাতীয় সমস্যা। পাকিস্তান আমলে এটি হতো, কিন্তু স্বাধীনতার পরেও কেন হবে? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা পড়াবেন? আর এসব তুখোড় শিক্ষার্থীদেরও কিন্তু সেই তথাকথিত সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষায় কোয়ালিফাই দেখিয়ে সিভিল সার্ভিসে ঢুকতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত বিষয় দেখে সিভিল সার্ভিসে নেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীরা যে যে বিষয়েই পড়ছেন সেই বিষয়ের ওপরই গভীরভাবে প্রশ্ন তৈরি করা হলে, সৃজনশীলতার স্বাক্ষর থাকলে, বিষয়জ্ঞানের ছাপ থাকলে এবং তার সঙ্গে বর্তমান জগতের রাজনীতি, পারিপাশির্^কতা, বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি মেলানো থাকলে বিসিএসের পুরো পদ্ধতি নিয়ে এত কথা হতো না। নীলক্ষেত থেকে বিসিএস গাইড কিনে মেধাবী শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি দখল করে সেই গাইড মুখস্থ করার বিষয়ও থাকত না। সামান্য একটি অংশ থাকতে পারে যা সব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ও সাধারণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহলে কারা পড়াবেন? আমাদের যেসব বন্ধুদের দেখতাম বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতেন, বাইরের জগতের সঙ্গে খুব একটা সংযোগ ছিল না। পত্রপত্রিকা পড়া কিংবা টিভি-সিনেমা দেখার প্রতি যাদের কোনো ধরনের ঝোঁক ছিল না, রাজনীতি তো নয়ই তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যখন ক্লাস পরিচালনা করেন শিক্ষকরা, তখনো সিরিয়াস শিক্ষার্থীরা বিসিএসের গাইড পড়েন। গাইড পড়বেন না তো কী করবেন?
এর সঙ্গে দ্বিতীয় আর একটি বাস্তব উদাহরণ না দিলেই নয়। উচ্চ মাধ্যমিকের পরে যারা আরও স্মার্ট তারা কিন্তু কোনো উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য খুব একটা লালায়িত হন না। তারা ডিফেন্সে ঢোকার জন্য তৈরি হন, কোচিং করেন, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেন যাতে সেনা অফিসার, নেভাল অফিসার কিংবা এয়ার অফিসার হতে পারেন। কারণ হচ্ছে মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বিভিন্ন কারণে তাদের ৭-৮ বছর সময় লেগে যায় প্রতিষ্ঠান থেকে বের হতে। বের হয়ে কিন্তু তারা বেকারের খাতায় নাম লেখান। তারপর আবার ভালো চাকরি পেতে হলে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিতে হয়, আবার সেই মুখস্থ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢোকার জন্য ভোর থেকে বিসিএস পরীক্ষার্থীরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। গ্রন্থাগার খোলে সকাল ৮টায়, কিন্তু গভীর রাত থেকে লাইনে ব্যাগ রাখার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এটি অনেক অর্থ বহন করে। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা হলে নিজ রুমে বা হলের রিডিংরুমে পড়ার পরিবেশ পান না। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার জায়গা, পড়ার জায়গা, গবেষণার জায়গা। সেগুলো আমরা নষ্ট করে ফেলেছি।
এটি হতে পারে যিনি যে বিষয়ে পড়াশুনা করছেন সেই বিষয়ের অন্তত একটা ভালো পারসেনটেজ হতে পারে তা ৫০ কিংবা ৬০ শতাংশ পরীক্ষা বিষয় থেকে হবে তাহলে শিক্ষার্থীরা যেমন আরও ক্রিয়েটিভ হতেন, তেমনি বিষয়ের প্রতি বেশি জোর দিতেন। এখানে আবার যারা গণিতে বা বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করেন তাদের নম্বর যারা ইতিহাস, বাংলা কিংবা ইংরেজিতে পড়েন তাদের সঙ্গে নম্বর টালি করলে মিলবে না। তাই, সাধারণ বিষয়গুলোর নম্বর তুলনা করতে হবে আর বিষয়ের নম্বর বিভাগ ভেদে বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে শিক্ষার্থীরা বই পড়া আরও ছেড়ে দেবেন। শিক্ষকরা ক্লাসে গিয়েও দেখবেন যে, শিক্ষার্থীরা বিষয় ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে বিসিএস গাইড নিয়ে ব্যস্ত, যেটি এখন হচ্ছে।
কোটার সুবাদে বা পিছিয়ে পড়া জেলার নাগরিক হওয়ার কারণে যারা বিসিএসে বড় বড় পদ দখল করে আছেন আর তাদের চেয়ে বহু যোগ্যতাসম্পন্ন ক্যান্ডিডেট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন অথচ রাষ্ট্রীয় কোনো হিসাবের মধ্যেই তারা নেই। এসব কারণে সবাই সরকারি চাকরি করতে ব্যস্ত, মহাব্যস্ত। ফলে, অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। তারপরের বিষয়টি হলো, বিসিএসের এসব চাকরিতে আছে সীমিত সংখ্যক পদ কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থী বের হচ্ছে অনেক। ইকুয়েশন এভাবে মেলানো যাচ্ছে না। তাই বেশি বেশি বেসরকারি চাকরিক্ষেত্রগুলোকে সরকারি পর্যায় থেকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের প্রয়োজন প্রকৃত গবেষকের, প্রয়োজন উন্নত মানের শিক্ষকের, মানসম্পন্ন ও নিবেদিনপ্রাণ চিকিৎসক, প্রচুর কৃষিবিদ প্রয়োজন এবং তাদের গুরুত্ব থাকতে হবে অনেক বেশি, প্রয়োজন দক্ষ ও প্রকৃত সৃজনশীল প্রকৌশলী। কিন্তু কি সমাজ কি পড়াশুনা ও কি ব্যবস্থা আমরা করেছি যে, সারা জীবন ডাক্তারি পড়ে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার জন্য গাইড পড়ছেন, সারা জীবন কৃষিবিজ্ঞান পড়ে এসিল্যান্ড হতে চাচ্ছেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে তারাও ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার জন্য পাগল। মনে রাখতে হবে, সমস্যা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি সরাসরি রাজনীতি না করেও পদোন্নতি পেতেন, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃতঅর্থে অবদান রাখতে পারতেন, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারতেন, সরকারি ছাত্র সংগঠনের মাস্তানদের খুশি করতে না হতো তাহলে তো তারা আমলা হওয়ার জন্য বিশাল জ্ঞানের রাজ্য ছেড়ে সেখানে যেতেন না। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এ বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে এগুতে হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেতের বিসিএস গাইড পড়ছে বলে চোখ টাটালে হবে না, কেন তারা পুলিশ অফিসার হবেন, কেন তারা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হবেন এসব নিয়ে পরশ্রীকাতরতা দেখালে হবে না।
লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক