বারবিল্যান্ড আমেরিকান সুলতানার স্বপ্ন

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৩, ১২:৩৩ এএম

আমি ছোটবেলা থেকেই হলিউডের ভক্ত। সহজলভ্যতার কারণে হলিউডের প্রচুর আজেবাজে ছবিও দেখে ফেলা হয়েছে। কিন্তু বারবি মুভি কোনোটাই দেখা হয়নি। তবে ডিজনির কয়েকটা রিসেন্ট ছবি দেখে বুঝেছি এখন ট্রেন্ড হচ্ছে গার্ল পাওয়ারের। নারীবাদের বাজার যেহেতু ভালো, হলিউড তাকে ক্যাশ করবে না, এ হতেই পারে না। উইমেন্স ফিল্ম বলে একটা জরা তো অলরেডি আছেই, কিন্তু বারবি শুধু আরও একটা নারী প্রটাগনিস্ট নিয়ে তথাকথিত নারীর গল্প বলা ছবি নয়। এর পেছনের কলকাঠিগুলোও খুব মজার।

ব্যাখ্যা করছি, এই বছর জুলাই মাসে একই দিনে (২১ জুলাই, ২০২৩) দুটি ছবি ওপেনহেইমার আর বারবি মুক্তি দেওয়া হয়েছে। প্রচুর মানুষ দুটো ছবিই দেখেছে, কিন্তু সবাই তো একদিনে দুই ছবি দেখবে না। ফলে বেশ একটা প্রতিযোগিতা আমদানি করা গেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে বারবিহেইমার। ওপেনহেইমার একটা বায়োপিক আর বারবি হচ্ছে কমেডি ফলে এই প্রতিযোগিতার কোনো মানেই হয় না। ওপেনহেইমার না দেখেও বলতে পারি, এটা আমাকে দেখতে হবে একা, কানে হেডফোন গুঁজে এবং সাবটাইটেলসহ, কিন্তু তারপরও ছবির অর্ধেক মাথার ওপর দিয়ে যাবে, ছবি সম্পর্কে এটা-ওটা পড়ে বুঝে তারপর আবার দেখতে হবে। আমি বলছি না, সবারই এই দশা হবে, কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলানের শেষ ছবি টেনেটের ক্ষেত্রে আমার এমনটাই হয়েছিল।

উল্টো দিকে বারবি হচ্ছে সবাই মিলে হই চই করতে করতে দেখে ফেলা যায়, এমন একটা ছবি। বারবি নিয়ে মিডিয়া কভারেজ এত বেশি হয়েছে, বলা চলে নিউজ মিডিয়াই বিনা পয়সায় বিজ্ঞাপন করে দিয়েছে অনেক। লোকে গোলাপি কাপড় পরে দেখতে যাচ্ছে, অ্যাডাল্ট কনটেন্ট আছে, নানা দেশে নিষিদ্ধ করেছে ইত্যাকার নানা নিউজ লোককে ছবি সম্পর্কে আগ্রহী করেছে। বাংলাদেশে সেলিব্রিটি নারী থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত নারীরাও গোলাপি পোশাক পরে সিনেপ্লেক্সে এই ছবি দেখে এসেছেন। নারীর সঙ্গে শিশু সব সময় অ্যাফিলিয়েটেড থাকে। অনেক মায়েরা বাচ্চাদের ছবি মনে করে শিশুদের নিয়ে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন এমন কথাও শোনা গেছে। এই ছবির টার্গেট অডিয়েন্স নারী হলেও বাই ডিফল্ট শিশুরাও চলে এসেছে দর্শক সারিতে। বারবি পুতুল দিয়ে শিশুরা খেললেও ছবিটা আসলে বড়দের জন্যই বানানো, রেটিং নিদেনপক্ষে ১৩+ হতে পারে।

স্পয়লার না দিয়ে ছবির প্লট লাইন ছোট করে বলি বারবিল্যান্ড বলে একটা জগতে গল্পের শুরু। এই দুনিয়ায় সবাই বারবি আর সবকিছু খুব পারফেক্ট। একদিন মূল চরিত্র স্টেরিওটিপিক্যাল বারবির মনে মৃত্যুচিন্তা এলো। তার পায়ের পাতা ফ্ল্যাট মানে মানুষের মতো হয়ে গেল। তার মনে হতে শুরু করল সে পারফেক্ট নয়। এ সময় উইয়ার্ড বারবি বলে আর এক চরিত্র রিয়েল ওয়ার্ল্ডে গিয়ে তাকে নিয়ে খেলে যে মেয়ে, তাকে খুঁজে বের করার বুদ্ধি দিল। বারবির এই যাত্রায় পিছু নিল তার জন্য নির্ধারিত ছেলে পুতুল কেন। কেন আর বারবি বাস্তব জগতে গিয়ে দেখল ইটস আ ম্যান’স ওয়ার্ল্ড। এতে দুজনের প্রতিক্রিয়া হলো দুই রকম কেন মহাখুশি হয়ে বারবিল্যান্ডে গিয়ে পুরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে লেগে গেল, বারবিল্যান্ডের নাম পাল্টে কেনডম বানিয়ে দিল সে। এদিকে বারবি রিয়েল ওয়ার্ল্ডে এসে আবারও এক্সিসটেনশিয়াল ক্রাইসিসে পড়ে গেল। বারবির এই ক্রাইসিস কীভাবে কাটল, সে কীভাবে খুঁজে পেল মুক্তির পথ, সেই গল্প দিয়ে শেষ হলো সিনেমা।   

কমেডির মোড়কে নারীবাদের রেফারেন্স হলিউডে নতুন নয়। ‘হু ইজ অ্যাফরেইড অব ভার্জিনিয়া উলফ’ নামে অনেক পুরনো একটা সিনেমা আছে, নাটক থেকে বানানো এই সিনেমা যদিও নারীবাদ নিয়ে নয়, আধুনিক জীবনে নারী-পুরুষ সম্পর্কে টানাপড়েন ও সংকট নিয়ে একটা ডার্ক কমেডি। হালের নেটফ্লিক্স থ্রিলার ছবি এনোলা হোমস তো রীতিমতো নারীবাদী সিনেমাই। এমন ছবিও প্রচুর তৈরি হয়েছে। কিন্তু বারবির মতো একটা বিতর্কিত চরিত্র নিয়ে নারীবাদ চর্চা করা/করানোটা একেবারেই বৈপ্লবিক বলা চলে। বারবি পুতুল নিয়ে শুরু থেকেই নারীবাদীরা সব সময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন এবং আছেন। শরীর নারীবাদী আলাপে খুব জরুরি প্রসঙ্গ। নারীর নিজের শরীরের ওপর অল্প কিছু অধিকার আদায় করতে শত বছর লেগে গেছে এবং এখনো সেই অধিকার পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, বহু পথ এখনো বাকি। শ্বেতাঙ্গ নীলনয়না সোনালি চুলের বারবি ডলকে বহুদিন ধরেই হোয়াইট সুপ্রিমেসি আর প্যাট্রিয়ার্কির ঠিক করে দেওয়া বিউটি স্ট্যান্ডার্ডের প্রচারক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু ক্যাপিটালিজম যেহেতু থেমে থাকে না, নানা রঙের নানা পেশার বারবি পুতুল হয়। এ কারণে বারবি সিনেমার প্যারালাল ইউনিভার্স, যার নাম বারবিল্যান্ড, সেখানে নারীর জগৎ। ঠিক যেন বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্নের মতো একটা জগৎ!

ছবিতে আমেরিকান সুলতানার স্বপ্ন বারবিল্যান্ডের দৃশ্য তৈরি করতে কোনো গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়নি, সব দৃশ্যে সেট সাজানো হয়েছে, ক্র্যাফটম্যানসশিপ সুন্দর। গল্পে কমিক অনেক বেশি হয়ে যায়নি, পরিমিত ছিল। সত্যি বলতে, এমন ঠিকঠাক হাস্যরস বহুদিন কোনো ছবিতে দেখিনি। তবে ছবির শুরুতে কুবরিকের ক্লাসিক ছবি স্পেস অডিসির আদলে বানানো দৃশ্যটাতে পুতুল ভাঙার অংশ আমার ব্যক্তিগতভাবে আপত্তিকর লেগেছে। শিশুরা রাগে দুঃখে আছড়ে আছড়ে পুতুল ভাঙছে, এই দৃশ্য কেমন জানি ভায়োলেন্ট! রক্তপাতের ভায়োলেন্সের চেয়ে অনেক বেশি কিছু এটা।

এই ছবির পরিচালক একজন নারী। বারবি পুতুলকে নারীবাদের আইকন বানিয়ে ফেলার মতো ব্যবসাসফল কালচার প্রডাক্ট উপহার দেওয়ার জন্য তিনি ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত, প্রশংসিত ও নিন্দিত হচ্ছেন যুগপৎ। নিন্দুকদের অনেকে প্লাস্টিক ফেমিনিজম বলে অভিহিত করেছে বারবি মুভিকে। টার্ম হিসেবে মন্দ নয়, কত রকমের ফেমিনিজমই তো আছে। ডিজনির গার্ল পাওয়ারওয়ালা অ্যানিমেশনগুলো, রাজকুমারবিহীন রাজকন্যা গল্পের সিনেমাগুলো প্রচুর কন্যাশিশুর মননে প্রভাব রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস। যেভাবে বারবি ছবির প্লাস্টিক ফেমিনিজমও বেশ কিছু মৌলিক নারী প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। এমনকি বারবির নিজের তৈরি বিউটি স্ট্যান্ডার্ডকেও ভাঙতে চেষ্টা করেছে এই ছবি। 

আবার একে সারকাজম বলে খারিজ করা যেতেই পারে। কেউ যদি দাবি করে, এই ছবি ফেমিনিজমকে রিডিক্যুল করার একটা পুরুষতান্ত্রিক এজেন্ডা, সে কথাও আমলে না এনে পারা যাবে না। বারবি ছবিতে নারীর সঙ্গে পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখানো হয়েছে ও নারীর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার মধ্য দিয়ে গল্প শেষ করা হয়েছে। আমেরিকান সুলতানার স্বপ্ন ‘আমরা সবাই বারবি আমাদের এই বারবির রাজত্বে’ মার্কা একটা ভুল মেসেজ দেয় নারীবাদ সম্পর্কে। নারীবাদীদের কোনোকালেই নারীর রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা বা দাবি ছিল না। নারীবাদ নারীর ও অন্য সব জেন্ডারের মধ্যে বৈষম্য নিরসনের কথা বলে, ইনসাফের কথা বলে। পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে নারীতন্ত্রের কথা বলে না।

আমেরিকান নারীবাদীরা অত্যন্ত চমৎকার। তারা নিশ্চয়ই বারবি মুভির প্লাস্টিক ফেমিনিজমের নানা বিশ্লেষণ করবেন। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, নারী পরিচালক দ্বারা নির্মিত ও আপাত নারীবাদী বার্তা সংবলিত এই সিনেমা আদতে একটা অ্যান্টাই ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডার অংশই। ওপেনহেইমারের বিপরীতে বারবিকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বাড়তি কাটতি করে নেওয়ার এই বিদ্বেষমূলক প্রতিযোগিতা তৈরি করার ঘটনাটাও এই দাবির পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। আমেরিকান কালচার ওয়ারের মতো পুরুষ বনাম নারী (অথবা ব্রেন ভারসাস বডি) বাইনারি অপোজিশন তৈরি করে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে নেওয়া গেল।

বারবি পুতুলের ব্যবসা আবারও চাঙ্গা হয়ে আসবে নিশ্চয়ই। চিকিৎসক থেকে নভোচারী এমনকি ফ্রিদা কাহলো বারবিও আছে বাজারে। ভার্জিনিয়া উলফ বা ক্যাথরিন ম্যাককিনন বা অ্যানড্রিয়া ডরকিন বারবিও তৈরি হয়ে যাবে নিশ্চয়ই শিগগির। এত চরিত্রের এত পেশার বারবি পুতুলের পোশাকই বিরাট একটা ইন্ডাস্ট্রি হওয়ার কথা। মুনাফাকেন্দ্রিক এই সভ্যতায় এর গুরুত্ব অনেক। প্লাস্টিকের তৈরি নারীবাদ বাজারকে উপহার দিচ্ছে বিরাট মুনাফা। 

কিন্তু শুধু সে জন্য নয়, সিনেমাটা নানা কারণেই দেখার যোগ্য। ফেমিনিজমের বর্তমান ট্রেন্ড অল ইনক্লুসিভনেসের কথা বলে, ইসলামিক থেকে নিয়ে ইকো সব রকমের নারীবাদী আলোড়নই মানবসভ্যতার পক্ষে উপকারী। কিন্তু একই সঙ্গে এ কথাও সত্য, বন্ধুর মুখোশে ঘুরে বেড়ানো শত্রু চিনতে পারাও জরুরি। রিয়েল লাইফে সিস্টারহুড এত সহজ কিছুও নয়, যেমনটা বারবিল্যান্ডে। অল ইনক্লুসিভনেস দেখাতে গিয়ে পুঁজিবাদের ধান্দা পূরণ করা কালচার প্রডাক্টকে ফেমিনিস্ট মেনিফেস্টো হিসাবে দেখাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তবে বারবি ছবিটা সবারই দেখা উচিৎ, কেননা এতে ভাবনার খোরাক আছে অনেক। বিশেষত ওপেনহেইমার দেখে মাথা জ্যাম হয়ে গেলে বারবি দেখলে সেই জ্যাম ছুটে যাবে নিশ্চিত।

লেখক কবি ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত