হাজার বছরের বিদেশি শাসনের নিগড়ে আর্থ-সামাজিক শোষণ-বঞ্চনা আর বণ্টন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক ‘মুক্তির সংগ্রাম’ দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে চূড়ান্ত বিজয়ে বিভূষিত হয়। সমতটের এই ভূখন্ড ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রকৃতির মিশ্র সহযোগিতাপ্রাপ্ত একটি দেশ। কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর বাংলাদেশের অবস্থান হয়েও মাথার ওপর হিমালয় পর্বত এবং পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর থাকায় বাংলাদেশ মৌসুমি বায়ুমন্ডল ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াবলয় নিয়ে সুজলা-সুফলা। প্রকৃত অর্থে ‘এমন দেশটি (অন্য) কোথাও খুঁজে পাওয়ার নয়। ছিলও না। এ কারণেই দেশটির প্রতি বিদেশি বর্র্গী, হার্মাদ, হায়েনার আধিপত্যের আকাক্সক্ষা অতীতে প্রবল ছিল তো বটেই, হাজার বছরের ঔপনিবেশিক শাসন তার প্রমাণ। দেশটির আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা-ব্যবস্থায় বিদেশিদের বিদ্যমান আগ্রহ ও ভূমিকা সে নিরিখেই।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের শতকরা ২৯ ভাগ আসে কৃষি ও তদসংশ্লিষ্ট খাত থেকে। সমতল ভূমির মোট জমির শতকরা ৯২ ভাগ ব্যবহার হয় কৃষিকাজে আর কৃষিকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে শতকরা ৬৪ ভাগ মানুষ। কৃষি খাতে দেশের সিংহভাগ ভূমি ব্যবহৃত এবং এ খাতই কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। এ প্রেক্ষিতে কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, উচ্চ ফলনশীল শস্যের উৎপাদনে সহায়তাকারী বীজ, উপকরণ, সার ইত্যাদি সরবরাহ, কৃষককে সহজ শর্তে মূলধন জোগান এবং তার উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিপণনব্যবস্থা তদারকি করে কৃষিব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং কৃষি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদারকরণের মাধ্যমে কৃষিকেই দেশের জিডিপির অন্যতম জোগানদাতা হিসেবে পাওয়া গিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং কৃষির উন্নয়নকামী পদক্ষেপ; নদীমাতৃক দেশে পানি সম্পদের সদ্ব্যবহার এবং নদীশাসন ও নৌযোগাযোগ; জনবহুল জনপদের জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় কাঁচামালের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশজ সম্পদের সমাহার ঘটিয়ে উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণে স্থানীয় সঞ্চয়ের বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ, ব্যক্তি তথা বেসরকারি খাতের বিকাশ, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্ভাবনার বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নের অন্যতম, বাঞ্ছিত ও কাক্সিক্ষত উপায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অনিষ্টকারী প্রভাব ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করে কৃষিব্যবস্থাকে সম্ভব মতো নিরাপদ সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ আশানুরূপ হলেই বাংলাদেশের সমৃদ্ধি সাধনে অনিশ্চয়তা ও ভবিতব্যের হাতে বন্দিত্বের অবসান ঘটবে। গবেষণার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল শস্যের উৎপাদনে প্রযুক্তির বিবর্তন ঘটাতে হবে, শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে উৎপাদন বাড়ানোর ফলে জমির উর্বরা শক্তির অবক্ষয় ঘটতে থাকলে আখেরে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। খাদ্যশস্যের বর্তমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিশেষ করে কৃষি এবং সার্বিকভাবে পরিবেশের ভবিষ্যৎ যাতে বিপন্ন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের নদীশাসনের উদ্যোগকে কার্যকর তথা পানিপ্রবাহ যথাযথ রেখে নদীর নাব্য বজায় রাখা আবশ্যক হবে। পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়া হলে কৃষিকাজ তো বটেই, সুপেয় পানির অভাবসহ পরিবেশ বিপন্নতায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের মাধ্যমে কৃষিজমির যথেচ্ছ ব্যবহার দুঃসহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের শোচনীয় অবস্থা দেখে এবং হাওরের মাঝ দিয়ে উঁচু বাঁধ দেওয়ার কর্মফল ইতিমধ্যে মিলেছে। নৌপথে যোগাযোগের যে নেটওয়ার্ক নদীমাতৃক বাংলাদেশের, তা অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ের হওয়া সত্ত্বেও, উপযুক্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে সেটিও ক্রমে হাতছাড়া যাতে না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দেওয়ার ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। দ্রুত এবং সহজ যোগাযোগের উপায় হিসেবে সড়ক নেটওয়ার্কের তুলনামূলক উপযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় আসার অর্থ এই হতে পারে না যে, নৌপথ বিলুপ্তির মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হতে হবে। নৌপথের ন্যায্য বিকাশ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ছাড়াও মৌসুমি বলয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যও অতি জরুরি।
মাছ-ভাতের বাঙালির প্রধান দুই উপজীব্যের অস্তিত্ব ও বিকাশও তো দেশের অগণিত খাল-বিলের নাব্যের ওপর নির্ভরশীল। শত শত সেতু নির্মাণকে উন্নয়নের প্রতিভূ ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। সেতু নির্মাণে ধারকর্জের হিসাব কষলে সেতুর উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ যাতে না হয় সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় উপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক হবে। সড়ক নির্মাণের তাৎক্ষণিক উপযোগিতা টেকসই হওয়ার ওপর নজর দেওয়া দরকার। নতুবা সড়ক বানানো ও মেরামত করার কাজকে কার্যকর পাওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতকে স্বয়ম্ভর করতে গিয়ে পরনির্ভরশীলতায় ঘাঁটি যাতে গাড়তে না হয় সে আশঙ্কার প্রতি সুবিচার করতে হতে পারে। সব কিছুর ওপরে জেনারেশনের পর জেনারেশন প্রকৃত শিক্ষা ও উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছে কিনা সেটা দেখা আরও জরুরি। মানসম্মত শিক্ষা, নীতি-নৈতিকতার বিকাশধর্মী বিদ্যাচর্চা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না হলে বেকারের ভারে ন্যুব্জ দেশে বিদেশিরা এসে রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে এ বিষয়টি জাতীয় দায়িত্ববোধের আওতায় আসার বিকল্প নেই।
দেশীয় শিল্প সম্ভাবনাকে উপযুক্ত প্রযতœ প্রদানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। দেশজ কাঁচামাল ব্যবহার দ্বারা প্রয়োজনীয় ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরিতে দেশের শিল্প খাতকে সক্ষম করে তুলতে হবে এবং এর ফলে বিদেশি পণ্যের ওপর আমদানিনির্ভরতা তথ্য মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে। শিল্প ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আর বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহারে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত অগ্রগতির হিসাবসংক্রান্ত তুলনামূলক সারণিগুলোর সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান, সম্পর্কের শুমার ও বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ অর্থনীতির অগ্রগতি ও গতিধারা শনাক্তকরণে অসুবিধা হয় না। দেখা যায়, আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ জিডিপির অংশ হিসেবে ক্রমে বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানির মিশ্র প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অস্থিতিশীল ও ভিন্ন মাত্রিক ট্যারিফ স্ট্রাকচারের প্রভাব পড়েছে বহির্বাণিজ্যে ভিন্ন অনুপাতে। এতে বোঝা যায়, বিশ্ব বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য সাধারণ সূত্র অনুসরণ করতে দ্বিধান্বিত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাভা-ার ব্যবস্থাপনায় আত্মঘাতী পদক্ষেপ, ব্যাংকিং খাতকে অন্তঃসারশূন্য করার পরিণতি দেখার জন্য অপেক্ষারও অবকাশ নেই। উৎপাদন না বাড়লেও সরবরাহ সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়ে মূল্যস্থিতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। আবার ইনফরমাল বর্ডার ট্রেডের ফলে দেশজ উৎপাদনের বিপত্তি ঘটতেই পারে। ইনফরমাল ট্রেড বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অদৃশ্য এক অন্ধগলি ও কালো গর্ত হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের পুঁজি, মানবসম্পদ, ব্যাংকের টাকা এবং আমদানিকৃত সামগ্রী অন্য দেশে পাচার হয়েছে, আবার কোনো কোনো বিদেশি পণ্যের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে আরোপিত ট্যারিফে দেশি সামগ্রী উৎপাদন ব্যবস্থার স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত হয়েছে।
বুদ্ধি ও বিবেচনা প্রয়োগ করে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা বাস্তবায়নে চাই আন্তরিক ও নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস। সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা ঠুনকো কার্যকরণকে উপলক্ষ করে নেওয়া পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী ফল বয়ে আনে না। শুধু নিজের মেয়াদকালে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণ করলে, ধারাবাহিকতার দাবিকে পাশ কাটিয়ে ইতিপূর্বে গৃহীত কার্যক্রমকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার রেওয়াজ শুরু হলে টেকসই উন্নতির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রূপকল্প প্রণয়নকারীর প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ়প্রত্যয়। সমস্যা গোচরে এলে ব্যবস্থা নিতে নিতে সব সামর্থ্য ও সীমিত সম্পদ নিঃশেষ হতে দিলে প্রকৃত উন্নয়নের জন্য পুঁজি ও প্রত্যয়ে ঘাটতি তো হবেই। তেল আনতে নুন ফুরায় যে সংসারে সেখানে সমৃদ্ধির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। সমস্যারা পরস্পরের মিত্র একটার সঙ্গে একটার যেন নাড়ির যোগাযোগ। আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে ব্যক্তি নিরাপত্তার, ব্যক্তি নিরাপত্তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার, সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে আয় উপার্জনের সব কার্যক্রমের কার্যকারণগত সম্পর্ক রয়েছে। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চাই আয়-উপার্জনের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। শিক্ষা কর্মদক্ষতাকে, স্বাস্থ্যসেবা কর্মক্ষমতাকে, কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতা উৎপাদন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটবে এটাই প্রত্যাশা। সর্বত্র সেই পরিবেশের সহায়তা একান্ত অপরিহার্য, যেখানে সীমিত সম্পদের ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব। একটাকে উপেক্ষা মানে যুগপৎভাবে অন্যান্য অনেক সমস্যাকে ছাড় দেওয়া। সমস্যার উৎসে গিয়ে সমস্যার সমাধানে ব্রতী হতে হবে। এ কাজ কারও একার নয়, এ কাজ সবার। সমস্যার মোকাবিলায় প্রয়োজন সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা পরিপোষণের জন্য নয়। যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য জনমত সৃষ্টিতে, আস্থা আনয়নে ও একাগ্রতা পোষণে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সংস্কার বাস্তবায়ন কোনো মতেই সহজসাধ্য নয় বলেই সর্বত্র দৃঢ়চিত্ততা আবশ্যক। এখানে দ্বিধান্বিত হওয়া, দ্বিমত পোষণ কিংবা প্রথাসিদ্ধবাদী বশংবদ বেনিয়া মুৎসুদ্ধি মানসিকতার সঙ্গে আপস করা বা রাখার সুযোগ থাকতে নেই।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক