ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ কিন্তু জি-২০ গ্রুপের সদস্য নয়। তবু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ আমন্ত্রণে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর ২ দিনব্যাপী সেই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের একমাত্র অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাজির হয়ে নিজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের প্রথম রাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দেওয়া নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রী পৃথিবীর অধিকাংশ শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আন্তরিক পরিবেশে কথা বলেন। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যে সম্মান জানিয়েছেন, তা কূটনৈতিক বিজয় হিসেবেই চিহ্নিত হবে। পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়েওল এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজের সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠক করেন।
সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ‘টেকসই উন্নয়ন’। জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর আওতায় বিশ্বঅর্থনীতির ৮৫ শতাংশ এবং বিশ্ববাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ জনগণও রয়েছে এসব দেশে। ক্রেমলিন অবশ্য আগেই জানিয়েছিল, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সম্মেলনে অংশ নেবেন না। এছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও যে সম্মেলন থেকে দূরে থাকবেন সেটিও সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে।
‘এক বিশ্ব, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’ শীর্ষ সম্মেলনের এই মূল প্রতিপাদ্যের অধীনে শেখ হাসিনার এই সম্মেলনে যোগদানের সবচেয়ে বড় অর্জন, অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নির্বাচনের আগে সর্বশেষ দীর্ঘ বৈঠক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও ভারত তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। দুদেশের মধ্যে সই হওয়া তিন সমঝোতা স্মারক হলো কৃষি গবেষণায় সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং দুদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক লেনদেন সহজীকরণ। এই বিষয়টি পুরোপুরি অর্থনৈতিক হলেও এর একটা রাজনৈতিক সিগন্যাল রয়েছে। এটা বিবেচনায় নিতে হবে।
ভারতের আমন্ত্রণে এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম দিনে দুটি অধিবেশনে বক্তব্য দেন। জি-২০ সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ কী পেল, ঘুরেফিরে আসছে এমন প্রশ্ন। আসলে এই সম্মেলনের দুই অধিবেশনে, বিশ্বদরবারে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। নৈশভোজের ফাঁকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও কুশল বিনিময় হয় প্রধানমন্ত্রীর। আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের মধ্যে বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুই দফার কুশল বিনিময়ের যে চিত্র দেখা গেল, তাতে অনেকের ধারণা যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাংলাদেশের ব্যাপারে আগের অবস্থান থেকে সরে আসবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের পর সে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুই দফায় কুশল বিনিময় ও আলাপ। আগের দিন শেখ হাসিনা- নরেন্দ্র মোদি এবং জো বাইডেন-নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর নৈশভোজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা ও বাইডেনের মধ্যে আলাপচারিতা অনেকটাই তাৎপর্যপূর্ণ। বিষয়টিকে পররাষ্ট্র কৌশলের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে হবে।
জি-২০ সম্মেলনের মঞ্চেই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে জৈব জ্বালানির বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল বায়োফুয়েল অ্যালায়েন্স (জিবিএ)। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নেতৃত্বাধীন এই জোটের সদস্য হলো বাংলাদেশও। ভারতের প্রস্তাবে এই জোটের সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোনো জোটের সদস্য হলো বাংলাদেশ। এই অন্তর্ভুক্তির একটা আলাদা রাজনৈতিক অর্থ রয়েছে। সামনেই তা প্রকাশ পাবে।
সহজেই বলা যায়, এক ছাদের নিচে বিশ্বের সব বাঘা বাঘা নেতাকে পাওয়া গেল। যা নিকট অতীতে বাংলাদেশের জন্য বিরল ঘটনা। সার্বিকভাবে বললে, এ সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি এক ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি। কোনো দ্বিধা নেই, বিষয়টি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই বিবেচিত হবে। এই সম্মেলনের পরই ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। তিনি জলবায়ু তহবিলে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে ভারত সফর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বরাজনীতিতে চাপমুক্ত করতে পেরেছে। যদিও এ ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধু ভারতই সহযোগিতা করেছে। যেমনটি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। তুলনাটা এই কারণে করা হচ্ছে যে, সম্মেলন শুরুর আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি ও বিএনপি মিলিতভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচনের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল। যদিও দেশের সংবিধানে সেই সুযোগ নেই।
শোনা যায়, এর পেছনে বিদেশি একটা লবি কাজ করেছে সরকারের বিরুদ্ধে। যদিও বিদেশি অতিথিরা প্রধানমন্ত্রীর ওপর শুধু নিরপেক্ষ নির্বাচনের আহ্বান জানান। একটিবারের জন্যও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা তারা বলেননি। শুধু বলেছেন, সুষ্ঠু একটা নির্বাচনের কথা। বিদেশিদের এমন ঘনঘন সফরে বিরোধী দল মনে করেছিল, এইবার আর আওয়ামী লীগের রক্ষা নেই। গোপনে তারা এগিয়েছিলেনও অনেকদূর। এমন কথাও শোনা গিয়েছিল, আগামী অক্টোবর থেকেই দেশের রাজনৈতিক চিত্র বদলে যাবে ১৮০ ডিগ্রি! তখন আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। অথবা সরকার থেকে বিতাড়িত হবে। অনেকে এমন কথা বলতেও দ্বিধা করেননি, সরকারের নাকি পালানোর পথও খোলা থাকবে না!
কিন্তু জি-২০ সম্মেলনে বিশ^নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সুসম্পর্ক এবং পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য দেখে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ অনেকটাই হতাশ হয়েছে। তারা বুঝে গেছেন, কোনোভাবেই বর্তমান সরকারকে চলমান বিরোধী আন্দোলনের জোরে পদত্যাগে বাধ্য করানো যাবে না। কারণ একদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পক্ষে জোরালোভাবে রয়েছে রাশিয়া। এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে চীন। আর পরীক্ষিত বন্ধু দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এমন অবস্থায় যে, তাকে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যার প্রতি বিশে^র অনেক দেশের নজর রয়েছে। যদিও দেশের ৩ দিকে ভারত আর ১ দিকে বঙ্গোপসাগর। যে কারণে বাংলাদেশে কিছু করতে হলে, ভারতের সম্মতি নিয়েই করতে হবে। আবার সেই বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়েও রয়েছে বিশে^র অনেক পরাশক্তির সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এমন প্রস্তাবও দিয়েছে। যদিও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি কোনোভাবেই সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটি করতে দেবেন না। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে, সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটি হলে চীন-ভারতকে চাপের মুখে রাখা যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশও থাকবে তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় তা হয়নি। এমনি এক পরিস্থিতিতে ভারতে হলো জি-২০ সম্মেলন।
তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে, কোন চরিত্রে ধাবমান হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তারপরও সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এমন একটা সিদ্ধান্তে সহজেই পৌঁছানো যায়, জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রাপ্তি অনেক। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এর মাধ্যমে বর্তমান সরকার যা অর্জন করেছে তার প্রাপ্তিফল স্বস্তিদায়ক। আগামী নির্বাচনেও এর ধনাত্মক ফলাফলই দেখা যাবে।
লেখক: সাংবাদিক