নির্বাচন এক নীতিতেই ঠিক হবে না

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:২৪ পিএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, মার্কিন ভিসানীতি। আবারও বললাম, কারণ গত মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘ভিসানীতি’ ঘোষণা করে, তখনো সেটা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমেরটা যদি ঝড় হয়, এবারেরটা তাহলে সাইক্লোন। ভিসানীতি ঘোষণার চার মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র তা প্রয়োগের ঘোষণা দিল। নতুন ভিসানীতিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সরকার সমর্থক এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। ভিসানীতির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কাজের মধ্যে রয়েছে : ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয় দেখানো, জনগণকে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চাকে সহিংসতার মাধ্যমে বাধাদান। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রচার করা থেকে বিরত রাখতে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার পদক্ষেপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

তখন বলা হয়েছিল, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ভোটার, রাজনৈতিক দল, সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সবার।’ ভিসানীতি ঘোষণার সময় বলা হয়েছিল, যারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চায়, তাদের সমর্থন দিতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি। তবে তখনো কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তখন আসলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের এই বার্তা দিয়েছিল যে তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।

মার্কিন ভিসানীতি নিয়ে তখনই নানামুখী আলোচনা হয়েছে। দুই পক্ষই পরস্পরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে। তবে মানতেই হবে, মার্কিন ভিসানীতি বাংলাদেশের  রাজনীতিতে দারুণ পরিবর্তন এনেছিল। এর আগে ২০২১ সালে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর মানবাধিকার পরিস্থিতির দারুণ উন্নতি হয়েছিল। যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকারও করেছিল। ভিসানীতি ঘোষণার পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতিতেও নাটকীয় বদল আসে। সরকারি দলের নেতারা মুখে যাই বলুন, মার্কিন ভিসানীতিকে তারা উপেক্ষা করেননি। বরং ভিসানীতির চাপে নিজেদের অনেকটাই বদলে ফেলেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার এখন অনেক বেশি সহনশীল, উদার। বিএনপি এখন অনেকটা নির্বিঘেœই তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে। সমালোচনার মুখে বদলে ফেলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। যদিও শঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে সব মিলিয়ে ভিসানীতির ইতিবাচক প্রভাবই পড়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতি তথা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। তবে সবকিছু একেবারে ঠিক হয়ে গিয়েছিল, এমনটা বলা সংগত হবে না। যে কোনো প্রক্রিয়া একটা ধারাবাহিকতা। রাতারাতি বাংলাদেশ স্বর্গ বনে যাবে, এমনটা যদি মার্কিনিরা আশা করে থাকে, তবে সেটা একটু বাড়াবাড়িই।

জাতীয় নির্বাচনের তিন মাস বাকি থাকতেই মার্কিন ভিসানীতির প্রয়োগ শুরু করাটা একটা চমক জাগানিয়াই। ভিসানীতি ঘোষণার চার মাস পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি প্রয়োগ শুরুর ঘোষণা দিল। গত ২১ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার জানান, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাদানে দায়ী ও জড়িত ব্যক্তিদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের সদস্য রয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, এসব ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে ক্ষুণœ করার জন্য দায়ী বা জড়িত বলে প্রমাণিত অন্য ব্যক্তিরাও ভবিষ্যতে এই নীতির আওতায় ভিসার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন। ওই সব ব্যক্তির মধ্যে বর্তমান ও সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা, বিরোধী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং আইন প্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা পরিষেবার সদস্যরা রয়েছেন। এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, গণমাধ্যমও ভিসানীতির আওতায় পড়বে।

তবে নির্বাচনের তিন মাস আগেই কোন বিবেচনায় ভিসানীতির প্রয়োগ করা হলো, তালিকা কারা তৈরি করল, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই বিবৃতিতে। গোপনীয়তার কারণে কাদের ওপর ভিসানীতির প্রয়োগ করা হচ্ছে, সে তালিকাও প্রকাশ করা হয়নি। এই তালিকা অবশ্য কখনো জানা যাবে না। যাদের ওপর ভিসানীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, মার্কিন দূতাবাস টেলিফোনে তাদের বিষয়টি জানিয়ে দেবে। বাতাসে অবশ্য অনেক নাম এবং লম্বা তালিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে এর কোনো সত্যতা নেই। যাদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে, তারা নিজেরা যদি না জানান, তাহলে জানার আর কোনো উপায় নেই।

মার্কিন ভিসানীতি বাংলাদেশের জন্য লজ্জার। নিজেদের বিষয়ে বাইরের লোকজনের এই মাতব্বরি সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকির। তবে এই পরিস্থিতি আমরাই সৃষ্টি করেছি। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অনড় অবস্থানই রাজনীতিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে। আর এই অচলাবস্থার ফাঁক গলেই কখনো যুক্তরাষ্ট্র, কখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাতব্বরি করার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে কাকে ঢুকতে দেবে কাকে দেবে না, সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু আরেক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর আগে তারা কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয়টি মাথায় রাখলে ভালো।

যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে, এটা ভালো। কিন্তু মার্কিন হস্তক্ষেপে বিশ্বের কোনো দেশে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন কোনো নজির নেই। বরং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। হুট করে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মেরে ফেলার ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ঘন ঘন ঘটে। বিশ্বের কোনো দেশেই গণতন্ত্র পূর্ণভাবে বিকশিত নয়। গণতন্ত্রের পথে নানা চ্যালেঞ্জ আছে। কোনো দেশে কম কোনো দেশে বেশি। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জটা বেড়েছে। যারা এত বড় বড় কথা বলছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনা বিশ্ব ভুলে যায়নি নিশ্চয়ই।

তারপরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে ভাবছে, এটা মন্দ নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার নামে তারা যেন বাংলাদেশকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে না ফেলে। মার্কিন ভিসানীতি বড় জোর কয়েক হাজার মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণার পরদিনই শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। অস্থিরতা তৈরি হয়েছে সব মহলেই। ব্যবসা-বাণিজ্যে এর কী প্রভাব পড়বে তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

তারচেয়ে বড় কথা হলো, এক ভিসানীতি কি বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ঠিক করে ফেলার জন্য যথেষ্ট? ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন যে ভালো হয়নি সেটা সবাই জানেন, স্বীকারও করেন। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতারাও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় সে দুটি নির্বাচন নিয়ে তাদের গ্লানির কথা বলেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ভালো না হওয়ার দায় অবশ্যই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। কিন্তু দায় পুরোটাই কি আওয়ামী লীগের? ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালে অংশ নিয়েছে নামকাওয়াস্তে নিজেদের নিবন্ধন টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। বিএনপি সহায়তা না করলে আওয়ামী লীগের পক্ষে একা একটি ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া একটি সাইকেলের মতো। সাইকেলের একটি চাকা নিষ্ক্রিয় থাকলে সেটি চালিয়ে নেওয়া মুশকিল। ২০১৪ সালে মার্কিন ভিসানীতি থাকলে সেটি বিএনপির ওপরই বেশি প্রয়োগ করতে হতো। কারণ তারা তখন নির্বাচন ঠেকানোর নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এখন বিএনপি একদফা আন্দোলন করছে। সামনে আরও জোরদার আন্দোলন, হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারে বিএনপি। সেক্ষেত্রে তাদের আন্দোলনও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিক্রয়ায় বাধা হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার কথা। ২০১৪ ও ২০১৮-এর পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন জনগণের আকাক্সক্ষা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়াও তাই। সরকারও একই সুরে কথা বলেছে। এখন সবার সুর একসুরে বাঁধতে পারাটাই জরুরি। এজন্য আমাদেরই আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে। গণতন্ত্র কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়, যে একটা ভিসানীতি দিল আর নির্বাচন ঠিক হয়ে গেল। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ধাপে ধাপে আমাদের উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছাতে হবে। ভয় দেখিয়ে কখনো জয় করা যায় না।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত