নতুন কারিকুলামে অভিভাবকদের উদ্বেগ

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩, ১০:১৮ পিএম

আমাদের প্রাথমিকের কারিকুলাম যোগ্যতাভিত্তিক হলেও মাধ্যমিকের কারিকুলাম ২০১২ সাল থেকে শিখনফল ভিত্তিক। শিখনফলভিত্তিক কারিকুলামে শিক্ষার্থীর নিজস্ব সৃজনশীলতা আর কল্পনার জগৎ থাকে উপেক্ষিত, তথ্য স্মরণে রাখার বিষয়টিই মুখ্য। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে চালু হওয়া নতুন কারিকুলামে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন-শেখানোর মাধ্যমে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি প্রথম শ্রেণি, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে প্রাথমিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি ও মাধ্যমিকের অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে চালু হতে যাচ্ছে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে  ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায় নতুন কারিকুলাম পরীক্ষাবিহীন পড়াশুনার মতো মনে হচ্ছে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে। সাধারণত আমরা পড়াশুনা নিয়ে ছেলেমেয়েদের ভীষণ ব্যস্ত রাখার পরিবেশে অভ্যস্ত যেখানে প্রচুর হোমওয়ার্ক থাকবে, টিউটরের কাছে ও কোচিংয়ে দৌড়াদৌড়ি থাকবে। তাহলেই না শিক্ষার্থী কিছু শিখছে বলে মনে হয় অনেকের কাছে। তবে, এ কথাও ঠিক যে, বাচ্চাদের বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে ব্যস্ত রাখা কিন্তু শিক্ষার অপরিহার্য অংশ যদি সেই ব্যস্ততা ফলপ্রসূভাবে করানো হয়ে থাকে। ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়তে বসবে, পরীক্ষা নামক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে- এটি আমাদের বহুদিনের শিক্ষা কালচার। উত্তরপত্রে যদি শিক্ষার্থীরা কিছু না-ই লিখে তাহলে শিক্ষকরা তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করবেন আর অভিভাবকরাই বা কী বুঝবেন? নতুন কারিকুলামে মাউশির নির্দেশনা অনুসারে ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন কিন্তু সামষ্টিক আর বাকি ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের অবিরত অবলোকনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। এই ৪০ শতাংশ সামষ্টিকের বিষয়টিকে অনেকে ধরে নিয়েছিলেন যে লিখিত পরীক্ষা হবে, কিন্তু সেটি দেখা যাচ্ছে না। 

শ্রেণিকক্ষের এবং মাঠপর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে চিত্র সেটি কিন্তু আনন্দের নয়, বরং ভয়াবহ। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাচ্ছে না, গেলেও যাচ্ছে আর আসছে, কিছুই পড়ছে না, লিখছে না। আগে লিখিত পরীক্ষার তাড়না থাকায় শিক্ষার্থীরাও মোটামুটি ক্লাসে আসত এবং অভিভাবকরাও শিক্ষার্থীরা কিছু শিখছে বলে মনে করতেন। কিন্তু লিখিত পরীক্ষা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়াতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসছেন না। অভিভাবকও সেভাবে তাড়া দিচ্ছেন না। অন্যদিকে নতুন কারিকুলামে পাঠদান পদ্ধতি আগের চেয়ে একটু বেশি প্রস্তুতি বা কর্মসম্পাদনমূলক হওয়ায় কেউ কেউ এটাকে কষ্টসাধ্য পদ্ধতি হিসেবেই মনে করছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু ব্যয়সাপেক্ষও বটে। আগের পদ্ধতিতে সাধারণভাবে শিক্ষকরা একই প্রস্তুতিতে যুগ যুগ ধরে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। নতুন কারিকুলাম বিষয়ে তাদের অনেকে ভাবছেন নিত্যনতুন চিন্তার প্রয়োগ সময়, শ্রম এবং ব্যয়সাপেক্ষ। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বেশ ঝামেলাযুক্ত যা অধিকাংশ শিক্ষকদের পক্ষে সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে যেসব বিদ্যালয় একটু তৎপর সেখানকার ছেলেমেয়েরা প্রচুর প্রজেক্ট ওয়ার্ক করছে যা অনেক অভিভাবক বলছেন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

এটি আমরা অস্বীকার করতে পারব না যে, সমাজের চরম অবক্ষয়ের যুগে নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের প্রথাগত পড়াশোনার বাধ্যবাধকতা না থাকার পরিবর্তটিতে তারা একরকম হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এটি ডাইজেস্ট করা অনেক শিক্ষকের পক্ষে, শিক্ষার্থীদের পক্ষে এবং অভিভাবকদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে, এটাও সত্যি যে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার নামে যে প্রচন্ড চাপ দেওয়ার বিষয়টি একেবারেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। আবার এত ছোট বয়সের শিক্ষার্থীদের আনন্দের মাধ্যমে শেখানোর কথা বলে পরিবর্তিত কারিকুলামটি অনেকের কাছে ইউটোপিয়ান আইডিয়ার মতো মনে হচ্ছে। এ দেশের শিক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষাদানের অবস্থা অন্য দেশের সঙ্গে মিলবে না। তবে বেসিক জায়গাগুলোতে ঠিক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যে কিছু লিখতে পারে, লিখে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে, তারা যেসব বিষয় পড়ছে সেগুলো ভাষায় লিখে প্রকাশ করতে পারে কি না সেটি তো আমাদের দেখতে হবে। সেই ব্যবস্থা কারিকুলামে যেভাবে বলা ছিল তা তো বছর শেষে এসে দেখা যাচ্ছে না। হতে পারে এটি সাহায্যকারী বইয়ের নামে গাইড বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করার জন্য। কিংবা কোচিং সেন্টারগুলোর দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্যই কি এই নতুন শিক্ষাব্যবস্থা? সাহায্যকারী বই এবং ক্লাসরুমের বাইরে কোচিং বা শিক্ষকের সাহায্য নেওয়া হাতেগোনা দুএকটি দেশ ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আছে। একটু আলাদা, একটু রকমফের। আমাদের দেশে কোচিং ও নোটবাণিজ্য যেভাবে চলে আসছিল সেটি কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উৎস থেকে এবং বিভিন্নভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হবে, জ্ঞান আহরণ করতে হবে। তারা কতটা অর্জন করেছে, কীভাবে অর্জন করেছে সেটি দেখার জন্য অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে। প্রশ্ন করলে কিংবা লিখিত পরীক্ষা থাকলে শিক্ষার্থীর বাইরের নোট পড়বে তাই লিখিত পরীক্ষা নেব না, এটি কেমন সমাধান?

শিক্ষার্থীদের বাস্তবজ্ঞান অর্জন করতে হবে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে, হাতে-কলমে শিখতে হবে। তবে এগুলো হতে হবে আংশিক। হঠাৎ করে পুরোটাই অভিজ্ঞতাভিত্তিক এবং পুরো মূল্যায়নটিই ধারাবাহিক করে ফেলাটা বোধ হয় বাস্তবসম্মত নয়। উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা মনে করছেন, মূল্যায়নের সব নম্বর দেবেন শিক্ষকরা। শিশুরা পড়বেও না, লিখবেও না। এমনকি তারা বাসায় ফিরে পড়ার টেবিলেও বসছে না। এ কাজ সে কাজ নিয়ে ব্যস্ত। পড়ার কথা বললেই বলে, যা করছি, তা দেখে স্যাররা নম্বর দেবেন। পরীক্ষার যে অবস্থা হয়েছিল তাতে শিক্ষার্থীরা আসলেই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল আবার এখন যা হচ্ছে সেটিও তো রিজোন্যাবল মনে হচ্ছে না।

অনেকে বলছেন এই পদ্ধতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে। বছর শেষে সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় ভালো শিক্ষার্থীরা যা শিখবে বা যেভাবে শিক্ষাটা পাবে, পেছনের সারির শিক্ষার্থীরাও সেভাবেই শিক্ষাটা পাবে। এতে মেধাভিত্তিক বৈষম্যের নিরসন হবে। এগুলো তো ধারণার কথা কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে তো ভাবতে হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও অভিভাবকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না। আবহমান কাল ধরে শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ম ছিল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা পাঠদান করবেন, শিক্ষার্থীরা পড়বে, বুঝবে এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে পরীক্ষা দেবে। উত্তরপত্রে তারা যা লিখবে, তা দিয়েই মূল্যায়িত হবে পরবর্তী ধাপে উত্তীর্ণ হওয়া বা না হওয়া। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এটাই দীর্ঘদিনের চিত্র। বিজ্ঞানের শাখাসমূহে প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা ছিল ২৫ নম্বর করে। থিউরির সঙ্গে প্রাকটিক্যাল একটি চমৎকার সমন্বয়। এখন যেটি দেখা যাচ্ছে আনন্দের নামে শিক্ষার্থীরা বই পড়া বাদ দিয়ে পুরোটাই প্রাকটিক্যালের মতো অবস্থা। এটি একবারে করা কতটা ঠিক হয়েছে, কতটা বাস্তবসম্মত হয়েছে তা নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করার অবকাশ ছিল। বলা হচ্ছে- পরীক্ষাভীতির পরিবর্তে আনন্দঘন পরিবেশে নির্ভার হয়ে শিক্ষার্থীরা পঠন-শিখন পরিচালনা করবে। তাদের পাঠ্যপুস্তকের অতিরিক্ত বোঝা কমবে। দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং জীবন ও জীবিকাঘনিষ্ঠ শিক্ষা ও যোগ্যতা অর্জন করে শিক্ষার্থীরা বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার উপযোগী নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। কিন্তু এসব বাস্তবায়নে মাঠের বাস্তবতা কি সেই কথা বলছে?

একজন শিক্ষার্থীকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে সারা বছর পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর বা পিআই এবং বিহ্যাভিয়ারল ইন্ডিকেটর বা বিআই-এর সাহায্যে বিভিন্ন পারদর্শিতার মাত্রা যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষা দক্ষতাসহ শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সক্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দক্ষতা ইত্যাদি এবং আচরণিক মাত্র যেমন সততা, সাহস, সহনশীলতা, পরম সহিষ্ণুতা, দায়িত্বশীলতা, জেন্ডার সচেতনতা ইত্যাদির মাত্রা রেকর্ড করা হয় এবং সামষ্টিক ও শিখনকালীন মূল্যায়নের সমন্বয়ে তৈরি ট্রান্সক্রিপ্ট দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি যাচাই করা হবে। এক্ষেত্রে প্রতি শ্রেণি শেষে শিক্ষার্থীদের সবল ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এভাবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পারদর্শিতা ও আচরণিক মাত্রার রেকর্ডগুলো ব্যানবেজ কর্তৃক প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ডাটাবেজ সংবলিত ইউনিক আইডির বিপরীতে জমা হবে। এই সিদ্ধান্তও আকর্ষণীয় এবং চমৎকার কিন্তু এগুলো ধাপে ধাপে করা যেত। যেমন ২০ শতাংশ বা ২৫ শতাংশ প্রথম কয়েক বছর। কারণ শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিকের সঙ্গে অন্য গুণাবলির প্রকাশ ও বৃদ্ধি দরকার, সেটি আমাদের পূর্ববর্তী কারিকুলামে সেভাবে ছিল না। যেমন একজন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায় কিন্তু দেখা গেল সে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। অথচ এটি একটি  অত্যাবশ্যকীয় গুণ। কিন্তু এটি করতে গিয়ে সব উল্টিয়ে ফেলা কতটা যৌক্তিক হয়েছে সেটি আমরা নির্ধারণ করার জন্য কিন্তু কোনো ব্যবস্থা রাখিনি।লেখক

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত