পানিবন্দি ২৫ লাখ মানুষ

আপডেট : ১৮ জুন ২০২২, ০৫:০৮ এএম

এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আবারও প্লাবিত হয়েছে। রেকর্ড বন্যায় ডুবেছে সিলেট বিভাগের বেশিরভাগ অঞ্চল। টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুরমা আর কুশিয়ার কূল উপচে সিলেট আর সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৯০ শতাংশেরও বেশি প্লাবিত সুনামগঞ্জের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে সারা দেশের যোগাযোগ। বিভাগের অন্যান্য জেলার সঙ্গেও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। টেলিফোন নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে ও দুর্ঘটনা এড়াতে পুরো সিলেটের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সিলেট বিভাগ কার্যত সারা দেশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দুই জেলার কিছু উঁচু স্থান ও পাহাড়ি এলাকা ছাড়া সবখানে এখন পানি। সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ করা হয়েছে উড়োজাহাজ ওঠানামাসহ সব ধরনের কার্যক্রম। জেলা দুটির বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্দি হয়েছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। তাদের উদ্ধারে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। তবে টানা বর্ষণ ও মোবাইল-ইন্টারনেট সেবাও বিঘ্নিত হওয়ায় তথ্য প্রাপ্তি, উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিভাগের বাকি দুই জেলার নিচু এলাকায়ও ঢুকে পড়েছে বন্যার পানি। হবিগঞ্জে একটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে উত্তরের কয়েকটি জেলায়ও দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য ও দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যমতে, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বর ও কংস নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হয়েছে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, শেরপর, নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা। এসব এলাকায় ৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। পদ্মা-যমুনার পানি বাড়ায় বন্যার ঝুঁকিতে আছে গাইবান্ধা, বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ও শরীয়তপুরের নিচু এলাকা।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি আগামী কয়েক দিনে আরও খারাপ হতে পারে। কারণ আগামী তিন দিন ভারতের সংশ্লিষ্ট এলাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

এদিকে সিলেট অঞ্চলের এবারের বন্যা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ড। বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, একটি বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ ডুবে যাওয়ার মতো বন্যা এর আগে বাংলাদেশে হয়নি।

১৯৯৮ সালের জুন মাসে সিলেট বিভাগে অনেকটা এমন বন্যা হয়েছিল। কিন্তু এরপর বেশিরভাগ বন্যা মূলত হাওর ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জ ও সিলেট শহরে দুই-তিন দিনের জন্য হঠাৎ বন্যা হয়। কিন্তু পুরো সিলেট বিভাগের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হওয়ার মতো বন্যা হয়নি। চলতি বছরও মে মাসের বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার শহরে পানি ঢুকে পড়লেও এমন পরিস্থিতি এবারই প্রথম।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়ার বরাতে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সিলেটে এর আগে যত বন্যা হয়েছে, তা মূলত হাওর এলাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার গ্রাম, শহর ও উঁচু এলাকাও পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, ভারতে আগামী দুদিন অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতিরই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত তিন দিনে বাংলাদেশের উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তরের (আইএমডি) বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চেরাপুঞ্জি বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। গত বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা জুন মাসে ১২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর গত তিন দিনে সেখানে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এটিও গত ২৭ বছরের মধ্যে তিন দিনে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। ওই বৃষ্টির পানি ঢল হয়ে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সবকটি জেলায় প্রবেশ করে আকস্মিকভাবে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

সিলেট বিভাগে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা : স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বড় বিপদে পড়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের লাখ লাখ মানুষ। ঘরে পানি, সড়কে পানি, চারদিকে থইথই পানি। অনেকে ঘরের ভেতরে কলাগাছ কিংবা বাঁশের ভেলা বানিয়ে সেখানে অবস্থান করছে। বন্যার্ত এসব মানুষ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে। অনেকে অনাহারে-অর্ধাহারে আছে। সিলেট নগরীর সুরমা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা, সিলেট জেলার সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলার সব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ পর্যায়ে। গতকালও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের তোড়ে পানি বাড়ছে হু হু করে। সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারাসহ সব নদনদীর পানি বিপদসীমার ১ মিটারের বেশি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ, সিলেট-গোয়াইনঘাট, সিলেট-কানাইঘাট, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কও পানির নিচে চলে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন কেন্দ্রে পানি ওঠায় সুনামগঞ্জ জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সিলেটের কুমারগাঁও গ্রিড স্টেশনেও পানি উঠেছে। আর অল্প কিছু পানি বাড়লেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে কুমারগাঁও গ্রিড স্টেশনটিকে সচল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। সেখানে বস্তায় বালু ভরে সেই বস্তা দিয়ে চারদিকে উঁচু বাঁধ তৈরি করে পানি প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এ বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত মানুষদের উদ্ধার এবং ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলায় সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীও। সেনাবাহিনীর ৯টি ইউনিট গতকাল সকাল থেকে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার্তদের উদ্ধার ও সহায়তায় কাজ শুরু করেছে। নৌকা দিয়ে প্লাবিত এলাকার বাড়িঘর থেকে পানিবন্দি লোকজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেনাবাহিনী সদস্যরা। তারা আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে পানিবন্দি মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা ও বন্যা আক্রান্তদের চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছেন।

সিলেট সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল হামিদুল হক জানান, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সিলেটের তিন উপজেলা ও সুনামগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় সেনাবাহিনী পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারসহ পাঁচটি কাজে তৎপরতা শুরু করেছে। সিলেট কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি উঠে বিদ্যুৎ সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকটি খাদ্যগুদাম হুমকিতে রয়েছে। এগুলো রক্ষায়ও সেনাসদস্যরা কাজ করছেন।

এদিকে সিলেট নগরীসহ দুই জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বন্যার্ত মানুষদের ভিড় বেড়েছে। কোথায় কোথায় আবার আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা সংকট রয়েছে। এছাড়াও দুই জেলার বেশিরভাগ স্থানে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। সুরমা নদীর পানি উপচে সিলেট নগরের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নগরে নালা-নর্দমা আর বন্যার দুর্গন্ধযুক্ত পানির মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন ও মানুষজন। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা। সব মিলিয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের লাখ-লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি।

সুনামগঞ্জ জেলার পৌরশহর, দিরাই, শাল্লা, ছাতক, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর, মধ্যনগরসহ সব উপজেলার নতুন নুতন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুনামগঞ্জে বন্ধ আছে সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

গতকাল বিকেলে সরেজমিন সিলেট নগরের সোবহানীঘাট, যতরপুর, উপশহর, মেন্দিবাগ, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, সাদাটিকর, তেরোরতন, মাছিমপুর, কদমতলী, ছড়ারপাড়, কালীঘাট ও তালতলা, জামতলা, মাছুদীঘিরপাড়, লামাপাড়, বেতেরবাজার, ঘাসিটুলা, বাগবাড়ি, শেখঘাট, টিকরপাড়া, কুয়ারপাড়, কাজিরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি দেখা গেছে। এ সময় নগরের যতরপুর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ঘরের ভেতরে ও চারপাশে পানি থাকায় তিন দিন ধরে বন্দি অবস্থায় আছেন। প্রতিদিন পানি বাড়ছে, ফলে বাসার অনেক জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়াতে ভোগান্তির শেষ নেই। ঘরে রান্না করারও কোনো উপায় না থাকায় চিড়া-মুড়ি খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন তারা।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সিলেটের এ বন্যা ২০০৪ ও ১৯৮৮ সালের বন্যার মতোই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) সিলেট বিক্রয় ও বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল কাদির বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দুপুর ১২টা থেকে জিও ব্যাগ ফেলে কুমারগাঁও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে পানি প্রবেশ ঠেকাতে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা কাজ করছেন। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাতে সিলেট শহরে অন্তত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়। এরই মধ্যে সিলেটের সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। তবে সিলেট শহরকে কত সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে বলা যাচ্ছে না।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্যার্তদের উদ্ধার ও খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল বিকেলে প্লাবিত হয়েছে হবিগঞ্জ জেরার নবীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রবল বর্ষণে নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নে অবস্থিত কুশিয়ারা নদীর বাঁধ উপচে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে জনপদে। এতে পাঁচ-সাতটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড বস্তা দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করছে।

হবিগঞ্জে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলীয় মিনহাজ আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার পানির পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৭০ মিটার এবং শুক্রবার তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৯৫ মিটারে পৌঁছায়। রাতেই তা বিপদসীমা ৮ দশমিক ৫৬ মিটার অতিক্রম করতে পারে। যেভাবে পানি বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাত হচ্ছে তাতে করে ওই নদীর পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ময়মনসিংহে প্লাবিত দুই জেলা : অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ে ঢলের কারণে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার সিংহভাগ স্থান পানিতে নিমজ্জিত। বাদ পড়েনি উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কসহ উপজেলা পরিষদ, থানা কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার কার্যালয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে তিন-পাঁচ ফুট পানি থাকায় সড়ক দিয়ে চিকিৎসা নিতে আসতে পারছেন না রোগীরা। চিকিৎসার জন্য রোগী নিয়ে নৌকা করে আসতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগও হাঁটুপানির নিচে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে জানায় স্থানীয়রা।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ জানান, প্লাবিত এলাকার আশপাশে তাৎক্ষণিকভাবে আশ্রয়ণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যাদের বাড়িঘর নিমজ্জিত হয়েছে তাদের সেখানে নিয়ে আসা হচ্ছে। এখানে যারা অবস্থান করছে তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু করার তা করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে বৃষ্টি হওয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় শেরপুর জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড়ি এলাকার চারটি নদীর পানিই বৃদ্ধি পেয়েছে। মহারশি, ভোগাই, সোমেশ্বরী ও চেল্লাখালি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলা শহরে পানি ঢুকে পড়েছে। পানি বৃদ্ধিতে জনদুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যে এ দুই উপজেলার ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসক সাহেলা আক্তার জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটিতে যাওয়া যাবে না। শুকনো খাবারসহ ত্রাণ বিতরণে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

রংপুরে প্লাবিত কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর নিচু এলাকা : উজানের ঢল ও বৃষ্টিতে ফুঁসছে উত্তরবঙ্গের নদীগুলো। ক্রমেই বাড়ছে পানির স্তর। বড় ও ছোট নদীগুলো উপচে লোকালয়ে হু-হু করে প্রবেশ করছে বানের পানি। তলিয়ে যাচ্ছে বসতঘর ও ফসলি জমি। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিস্তা নদীর ঢল আরও বেড়ে যায়। গতকাল সকাল ৬টায় নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার (৫২.৬০) ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। তবে বেলা ৩টায় তিস্তার পানি বিপদসীমা ৭ সেন্টিমিটার নিচে নেমে এলেও বিকেল থেকে পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ফলে নদীর উজানের পানির চাপ কমাতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রেখেছে কর্র্তৃপক্ষ। নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকার ১১টি ইউনিয়ন এখন বন্যাকবলিত। এতে ১০ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ বানের পানিতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। নদীর বন্যার সঙ্গে আকাশের বৃষ্টি এসব পরিবারকে চরম পরিস্থিতির সৃষ্টি করে দিয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী স্বপন বাঁধ মসজিদপাড়ার ২৮০ পরিবার বসতবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়েছে। স্বপন বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে আকস্মিক পানি উঠে বাড়িঘর তলিয়ে দেয় তাদের।

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে চলায় চরম কষ্টে পড়েছে বানভাসি মানুষ। জেলার নিচু এলাকায় হঠাৎ পানি এসে বাড়িঘর ডুবে গেছে। জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সদর, উলিপুর ফুলবাড়ী, চিলমারী, রাজারহাট উপজেলার অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। চর ও দ্বীপচরগুলো প্লাবিত হওয়ায় ভেঙে পড়েছে এসব এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা। ঘরবাড়ি তলিয়ে থাকায় অনেক পরিবার ঘরের ভেতর উঁচু মাচা বানিয়ে ও নৌকায় দিন পার করছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টায় উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নদনদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড।

শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ : সিলেট বিভাগ ও নেত্রকোনা জেলার বন্যার্তদের জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে ২৬ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এ সহায়তার পাশাপাশি টাকা ও চালও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি প্যাকেটে চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনিসহ খাদ্যসামগ্রী রয়েছে। এতে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের এক সপ্তাহ চলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সিলেটের অনুকূলে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৩০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জের জন্য ৩০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, নেত্রকোনার জন্য ১০০ মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবার প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যায় আক্রান্ত এলাকার জন্যও খাদ্যসহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের জন্য ১০ লাখ টাকা এবং এক হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, রংপুর ও নীলফামারীর জন্য ৩ হাজার করে শুকনো এবং অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ শুধু আপদকালে বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে মানবিক সহায়তা হিসেবে বিতরণ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত