সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথের আন্দোলন-কর্মসূচিতে লাঠির সঙ্গে জাতীয় পতাকা বেঁধে অংশ নিচ্ছে। দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, আত্মরক্ষায় লাঠির সঙ্গে জাতীয় পতাকাসহ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে তারা, আক্রান্ত হলেই কেবল এটি ব্যবহার করা হবে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের লাঠির সঙ্গে জাতীয় পতাকা বহন করে বিএনপির কর্মসূচি পালনের সমালোচনা করে বলেন, ‘আন্দোলন করুন, কিন্তু লাঠিবাজি চলবে না। রাজপথ কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়। জনগণের জন্য রাস্তায় নামব আমরাও। অপেক্ষায় আছি, দেখছি। সামনের দিনে লাঠিতে জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠে নামলে বিএনপির খবর আছে।’
ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের জবাবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাবেশ তো আমরা করছি অনেক দিন ধরে। কখনো লাঠি নিয়ে নামিনি। এখন কেন নামতে হচ্ছে তা দেশবাসী জানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ যখন একাকার হয়ে আমাদের ওপর হামলা করছে তখন আত্মরক্ষায় আমরা লাঠি নিয়ে নেমেছি। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা করলে আমরা বসে থাকব না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’ গতকাল বুধবার বিকেলে রমনার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের সভা-সমাবেশে লাঠিসোটা বা দেশি অস্ত্র বহন করা যাবে না।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুরুতেই লাঠি নেইনি। যখন আক্রান্ত হয়েছি তখন আত্মরক্ষায় লাঠি নিয়েছি। আমরা চাই না লাঠি নিতে। আওয়ামী লীগ বিনা কারণে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা না করলে, পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে আমাদের লাঠির প্রয়োজন নেই। ডিএমপির এই নির্দেশনা শুধু বিএনপির জন্য কি না তা সময় হলে আমরা দেখব।’
অসহনীয় লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও পুলিশের গুলিতে দলের তিন নেতাকর্মীর মৃত্যুর প্রতিবাদে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির উদ্যোগে বনানীতে মোমবাতি প্রজ¦লন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। কর্মসূচি শেষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অতর্কিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল মিন্টুসহ অনেকে আহত হন। পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে বিএনপি নেতারা বলেন, ‘আঘাত আসলে তা মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত।’ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইটপাটকেল মারলে লাঠি নিয়ে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তারা।
এর পরের দিন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে খিলক্ষেত থানার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক শওকত উল ইসলাম লাঠি নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন। শওকত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার গুলশানে আমাদের শান্তিপূর্ণ মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করে। হামলায় আমাদের দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল মিন্টুসহ কয়েকজন আহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নেতাদের নিরাপত্তা না দিয়ে বরং তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। এটা খুব অন্যায়। এভাবে চলতে পারে না। এই কারণে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা লাঠি নিয়ে এসেছি।’
সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর হাজারীবাগের সিকদার মেডিকেল কলেজের কাছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী লাঠিতে জাতীয় পতাকা বেঁধে অংশ নেন। সেদিন সমাবেশের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গত মঙ্গলবার রাজধানীর ইস্কাটনের সমাবেশেও লাঠি বহন করে নেতাকর্মীরা। তবে সেদিন কোনো সংঘর্ষ হয়নি।
বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আমরা কর্মসূচি পালন করেছি কিন্তু কখনো লাঠি বহন করিনি, এখন করতে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করলে, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে আমাদের লাঠি হাতে নিতে হতো না।’
যুবদল নেতা এইচ এম দীন মোহাম্মাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হামলা ও পুলিশের নির্যাতন থেকে নিজেদের বাঁচাতে আমরা সমাবেশে লাঠি বহন করি।’ সাবেক ছাত্রদল নেতা আসাদুল আলম টিটু বলেন, ‘খালি হাতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আত্মরক্ষার্থে জাতীয় পতাকা বাঁধা বাঁশের লাঠির বিকল্প নেই। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে আমরা লাঠি নিয়ে সমাবেশে যাচ্ছি।’
সাবেক ছাত্রদল নেতা মির্জা ইয়াসিন আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন আমরা দেখি দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে, আমার ভাই লাশ হচ্ছে গুম হচ্ছে তখন আমরা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, আঠারো কোটি মানুষের ও আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য জাতীয় পতাকা বাঁধা বাঁশের লাঠি নিয়ে রাজপথে নেমেছি। এটা চলতেই থাকবে। আমরাই এই যুগের মুক্তিযোদ্ধা। গত ১৫ বছরের দুঃশাসন বিএনপিকে রত্নের খনি দিয়েছে, বিএনপিই তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে ইনশাআল্লাহ।’
সাবেক ছাত্রদল নেতা আজমল হোসেন পাইলট দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির কোনো সভা-সমাবেশেই দলের নেতাকর্মীরা প্রথমে হামলা করেছে এমন নজির নেই। প্রতিপক্ষ যখন রামদা-চাপাতি-রড-হকিস্টিক প্রভৃতি দেশি অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে তখন ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর উপায় থাকে না। আত্মরক্ষা করা ফরজ।’
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা জাহিদুর রহমান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সমাবেশে লাঠি বহন করি না। আমরা জাতীয় পতাকা নিয়ে সমাবেশে যাই। এটা করা হয় জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা বহন করার জন্য।’
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক হাফিজুর রহমান সোহান বলেন, ‘একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করা। কিন্তু সরকারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের দফায় দফায় হামলা বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের জীবন আজ শঙ্কাগ্রস্ত। আত্মরক্ষার্থে কর্মীরা সমাবেশে বাঁশের লাঠি নিয়ে আসছে।’
ছাত্রদল নেতা নাহিদুর রহমান নিপু বলেন, ‘বিএনপির চলমান বিক্ষোভ, সমাবেশ ও আন্দোলন দেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে গণতন্ত্রকামী বিএনপি নেতাকর্মীরা দেশপ্রেমের প্রতীকস্বরূপ সমাবেশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে আসেন। বাঁশের লাঠিকে হাতিয়ার বলার কোনো সুযোগ নেই। বিএনপির মূল হাতিয়ার হচ্ছে জনগণ।’