২০২২ সালে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় বাধা ছিল দুর্নীতি। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, ঋণপ্রাপ্তির অপর্যাপ্ততা এবং অদক্ষ প্রশাসনও বড় একটা বাধা। এসব সমস্যার সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও অস্থায়ী নীতি ব্যবসার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ ২০২২ শীর্ষক উদ্যোক্তা-জরিপে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপ বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ব্যবসার পরিবেশের অবনতি হয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জরিপের তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সে-সময় উপস্থিত ছিলেন। আইএমএফের ঋণের বিষয়ে সিপিডি বলেছে, দেশের প্রয়োজনকে বিসর্জন দিয়ে চাপ ঘাড়ে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে। ২০২৪ থেকে এই ঋণের দায় বহন করতে হবে।
পুঁজিবাজার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রবন্ধ উপস্থাপক ড. মোয়াজ্জেম বলেন, পুঁজিবাজারের দুর্বলতা ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। আর্থিক খাতের চারটি অঙ্গই বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। ‘পুঁজিবাজার’ এখন ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, দুর্নীতির পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সামনে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতির মতো যেসব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে সেগুলো তাদের ভাবাচ্ছে। এগুলোতে নজর দেওয়া দরকার।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৭৪ জন পদস্থ কর্মকর্তা গত বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই সময়ে এ জরিপে অংশ নেন। সেই হিসেবে এটি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ নয়।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ বলেছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে মুদ্রাপাচারের ঘটনা বেড়েছে। টাকা পাচারের কারণে ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়েছে। মুদ্রাপাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলেও জানিয়েছেন তারা।
প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ) কর্মকর্তা দুর্নীতিকে ব্যবসায় বড় বাধা উল্লেখ করেন। কোন কোন জায়গায় দুর্নীতি হচ্ছে সেটিও জরিপে উঠে এসেছে। ৬৪ শতাংশ কর্মকর্তা কর প্রদানে, ৫৪ শতাংশ ব্যবসায়িক লাইসেন্স নিতে, ৪৯ শতাংশ গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ নিতে এবং ৭৫ শতাংশ কর্মকর্তা আমদানি-রপ্তানিতে দুর্নীতির কথা বলেছেন।
৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মকর্তা দুর্নীতির পাশাপাশি ব্যবসার জন্য দুর্বল অবকাঠামো, ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ ব্যাংকঋণের অপর্যাপ্ততা ও অদক্ষ প্রশাসন, ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, ২৬ দশমিক ২ শতাংশ জটিল করব্যবস্থা ও উচ্চ করহার, ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ দুর্বল নীতিবোধ ও সরকারে স্থিতির অভাব, ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ অপরাধ ও উদ্ভাবনে অপর্যাপ্ত সক্ষমতা এবং ১০ দশমিক ৮ শতাংশ কর্মকর্তা শ্রম-সংক্রান্ত নিয়মনীতির সীমাবদ্ধতাকে সমস্যা বলেছেন।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, বড় কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন, খুচরা বিক্রিতেও বড় কোম্পানিগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে নীতিকাঠামো প্রযুক্ত হয় না। বড়, মধ্যম ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা আলাদা নীতিকাঠামো প্রয়োজন। নাহলে এসএমই টিকতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্নীতির কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। সেবার মূল্যও বাড়ছে। এই ঘানি সাধারণ মানুষকেই টানতে হয়। নানা স্তরে দুর্নীতি ব্যবসার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সিপিডি বলেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে অগ্রগতি দেখা যায়নি। হয় তা স্থবির ছিল নতুবা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। সবচেয়ে সমস্যাযুক্ত কারণ হিসেবে ‘দুর্নীতি’ এখনো রয়ে গেছে। অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যা ও নতুন সমস্যার ফলে দুর্নীতির তীব্রতা বেড়েছে।
ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জরিপ প্রতিবেদনে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় সংস্কার আনতে হবে; স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; নাগরিক ও ব্যবসায়িক সেবা নিশ্চিত করতে হবে; ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; আর্থিক খাতে সংস্কার আনতে হবে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দুর্নীতির পাশাপাশি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ব্যবসাকে আরও সমস্যায় ফেলছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে বৈদেশিক মুদ্রার উত্থান-পতন, আমলাতন্ত্র ও মূল্যস্ফীতি। আর বড় ব্যবসায়ীদের জন্য এসবের পাশাপাশি অবকাঠামোর অপ্রতুলতা সমস্যা তৈরি করছে।
তিনি বলেন, জীবনযাত্রার মানের অবনতির কারণে আইনশৃঙ্খলায় ব্যত্যয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপেশাদার আচরণ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। নির্বাচনের বছর সামাজিক ও রাজনৈতিক অশান্তি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
জরিপে বলা হয়, ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। এক ধরনের মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এসব এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
বলা হয়েছে, উন্নয়ন ব্যবসায়ীদের কাজও সহজ নয়। ব্যবসায় ‘প্রতিযোগিতা কমিশন’-এর ভূমিকা নগণ্য। ডমিন্যান্ট মার্কেট প্লেয়ার গড়ে উঠছে দেশে। জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে এসএমই’র ব্যবসাকে আরও সহজ করতে হবে।