লোকসানের কারণ শুধুই ডলার

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:০৭ এএম

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড আমদানির দায় পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে। ডলার সংকটের কারণে সাবসিডিয়ারি তিন কোম্পানির কাঁচামালের আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় শতকোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে। ফলে ২০২২-২৩ হিসাববছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) আয় বাড়লেও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে লোকসানে পড়েছে ডরিন পাওয়ার। একই অবস্থা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানিরও। সাবসিডিয়ারি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানি করা কাঁচামালে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হওয়ায় শাহজীবাজার পাওয়ারও ব্যাপক লোকসানে পড়েছে।

বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও কাক্সিক্ষত নোট মার্কিন ডলার। আমদানি ব্যয়ের ধকল সামলাতে গিয়ে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রিজার্ভ বাড়াতে ব্যাপক সংস্কারের শর্ত মেনে বিদেশি ঋণের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছে সরকার। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বাড়তি থাকায় গত এক বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ২২ শতাংশের বেশি। কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এলসি খোলার পর তা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। সাধারণত এলসি খোলা ও নিষ্পত্তিতে ৩ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এ ব্যবধানের কারণেই বিনিময় হারে বড় লোকসান দিয়েছে পুঁজিবাজারের এ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো।

ডলার সংকটে শুধু ডরিন কিংবা শাহজীবাজার পাওয়ার নয়, রানার, ইফাদ, সিঙ্গার, জিপিএইচ ইস্পাত, বিএসআরএম লিমিটেড, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, এসিআইর মতো ব্র্যান্ড ভ্যালুর বড় কোম্পানিগুলোও শত শত কোটি টাকার লোকসান দিচ্ছে। বিনিময় হার, কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মূলত উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলো মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক হারে বাড়লেও একই হারে পণ্যমূল্য বাড়াতে পারেনি কোম্পানিগুলো। বিনিময় হারের কারণে ইলেকট্রনিকস খাতের জায়ান্ট কোম্পানি ওয়ালটনের নিট মুনাফা ৯৭ শতাংশ কমে গেছে।

শক্ত মৌলভিত্তির অনেক কোম্পানি নতুন করে লোকসানে পড়ায় মন্দায় থাকা পুঁজিবাজারের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে। তালিকাভুক্ত ৭০ শতাংশ কোম্পানির মুনাফা কমে গেছে। নতুন করে লোকসানে পড়েছে তালিকাভুক্ত ২৫ কোম্পানি। আর বিনিয়োগ করা ১৬৯ শেয়ারের দর কমে যাওয়ায় ১৮টি মিউচুয়াল ফান্ডও নতুন করে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে। অবশ্য এখনো বেশিরভাগ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসের কারণে সর্বনিম্ন মূল্যসীমায় আটকে রয়েছে। তবে এসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে বিনিয়োগকারীদের অনীহা রয়েছে। ফলে স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক লেনদেন তলানিতে নামছে।

বিশ্ববাজারের জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বাড়ায় গত বছর ৫ আগস্ট সরকার দেশেও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানি তেল ছাড়াও সম্প্রতি গ্যাস-বিদ্যুতের দামও বাড়িয়েছে সরকার। এর বাইরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর থেকে জাহাজ ভাড়া ও কাঁচামালের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনমুখী শিল্পের ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব ইয়াসিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিডল্যান্ড পাওয়ারের সাবসিডিয়ারি মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার কোম্পানির জন্য এইচএফও আমদানি করতে গিয়ে প্রায় শতকোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে। তিনি জানান, যখন এইচএফও আমদানির জন্য এলসি খোলা হয় তখন ডলারের বিনিময়মূল্য ছিল ৮৪ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। কিন্তু গত মার্চে খোলা এলসি ডিসেম্বরে পরিশোধের সময় ডলারের বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ১০৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে। ফলে এলসি পরিশোধের সময় অতিরিক্ত প্রায় শতকোটি টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। একটি সাবসিডিয়ারির কারণে বড় লোকসানে পড়তে হয়েছে শাহজীবাজার পাওয়ারকে।

শাহজীবাজার পাওয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, যার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার লিমিটেড। এটি ১৫০ মেগাওয়াটের এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি। আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে কোম্পানিটি। শাহজীবাজার পাওয়ার ও এর অধীন অন্যান্য কোম্পানি কিছুটা লাভজনক অবস্থায় থাকলেও শুধু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ারের কারণে চলতি ২০২২-২৩ হিসাববছরের দ্বিতীয়ার্ধে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ২১ কোটি টাকা নিট মুনাফা ছিল। প্রথম প্রান্তিকে কিছুটা মুনাফা থাকায় চলতি প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) শাহজীবাজার পাওয়ারের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ৫৮ কোটি টাকা। ডলারের কারণে ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি এই প্রথম লোকসানে পড়ল।

বিনিময় হারের কারণে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে লোকসানে পড়েছে ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড। তিন সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এইচএফও আমদানি করতে গিয়ে আর্থিক ব্যয় ৯৮ কোটি টাকা বেড়ে গেছে। এলসি খোলা ও নিষ্পত্তিতে ব্যবধানের কারণে চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানির আর্থিক ব্যয় হয়েছে ১০৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ডরিন পাওয়ারের নিট লোকসান হয়েছে ২২ কোটি টাকারও বেশি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ৩৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকার নিট মুনাফায় ছিল কোম্পানিটির।

ডরিন পাওয়ারের কোম্পানি সচিব মাসুদুর রহমান ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, এলসি নিষ্পত্তি করতে গিয়েই বিপত্তি তৈরি হয়েছে। এলসি খোলার সময়ে ডলারের যে দর ছিল নিষ্পত্তির সময়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। এ ব্যয় সমন্বয় করতে গিয়েই দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসানে পড়ে কোম্পানিগুলো।

চলতি প্রথমার্ধে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের আর্থিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা প্রায় ৮০ শতাংশই হয়েছে ডলারের বিনিময় হারের লোকসান থেকে। গত বছর একই সময়ে আর্থিক ব্যয় ছিল মাত্র ৫ কোটি টাকা। আর্থিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় কোম্পানিটি ৫৯ কোটি টাকার কর-পূর্ববর্তী লোকসানে পড়েছে। কর পরিশোধের পর কোম্পানির সমন্বিত নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ২৪২ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ায় এমনিতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দাম। কিন্তু পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দাম পুরোপুরি সমন্বয় সম্ভব হয়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আর্থিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, যা লোকসানে যাওয়ার প্রধান কারণ। ডলারের সংকট এখনো শেষ হয়নি। ব্যাংকগুলো আমাদের ডলার সংগ্রহ দিতে বলছে। কিন্তু এ সময়ে এটি খুবই কঠিন।’

ইস্পাত শিল্পের আরেক জায়ান্ট কোম্পানি জিপিএইচ ইস্পাত চলতি প্রথমার্ধে ৮৫ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা ছিল। চলতি প্রথমার্ধে ডলারের কারণে কোম্পানির আর্থিক ব্যয় ১৫৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।

চলতি ২০২২-২৩ হিসাববছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিক ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদক ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির লোকসান হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৩ কোটি টাকা। এতে করে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমে ৯৭ শতাংশ গেছে। একই খাতের আরেক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের নিট মুনাফা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।

সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান জানান, গত দেড় বছর সুতার দাম বেড়েছে ৬২ শতাংশ, কনটেইনার ভাড়া বেড়েছে ৩৫০-৪৫০ শতাংশ, ডাইস ও কেমিক্যালের খরচ বেড়েছে ৮০ শতাংশ। গত বছরের শুরুতে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে চলমান জ¦ালানি সংকটের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের অপ্রতুলতার কারণে কারখানাগুলোতে ডিজেল নিয়ে জেনারেটর চালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে বড় সংকটে রয়েছে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক।

চলতি প্রথমার্ধে তালিকাভুক্ত কোম্পানি স্টাইলক্র্যাফট, রহিম টেক্সটাইল, সায়হাম টেক্সটাইল, দুলামিয়া কটন, প্রাইম টেক্সটাইল, সাফকো স্পিনিং, মালেক স্পিনিং, জাহিন টেক্সটাইল লোকসানে পড়েছে। এর বাইরে রপ্তানি আয়ের ডলার থাকার পরও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ বস্ত্র খাতের কোম্পানির আয় আগের বছরের তুলনায় কমেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত