‘শুরু থেকেই বাস দ্রুতগতিতে চলছিল। এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীদের অনেকেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিলেন। কেউ চোখ বন্ধ করে ঝিমোচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় কিছুই টের পাইনি। যখন জ্ঞান ফেরে দেখি চারপাশে রক্ত আর লাশ। উঠে বসতে গেলে মাথা ঘুরে পড়ে যাই। পরে কিছুটা সুস্থবোধ করলে চারপাশে বোঝার চেষ্টা করি। তখন টের পাই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেছে! সড়ক থেকে গাড়ি উল্টে নিচে পড়ে দুমড়েমুচড়ে গেছে।’ এভাবেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করছিলেন পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনার কবলে পড়া বাসের যাত্রী গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর যুবক উজ্জ্বল। মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীবাহী এই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন, যাদের মধ্যে ২৫ জনের অবস্থা গুরুতর। গতকাল রবিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে কুতুবপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত ইমাদ পরিবহনের বাসটি গতকাল ভোর সাড়ে ৪টায় খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। এরপর পদ্মা সেতুর আগে শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় এক্সপ্রেসওয়েতে নিয়ন্ত্রণ হারায় সেটি। বাসটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিং ভেঙে নিচে খাদে পড়ে যায়। এতে বাসটির সামনের অংশ একেবারে দুমড়েমুচড়ে যায়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এক্সপ্রেসওয়েতে এটিই সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। বেপরোয়া গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি দুর্ঘটনায় পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ১৪ জন মারা যান। পরে আহতদের উদ্ধার করে শিবচরের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনজন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। আহতদের শিবচরের এবং ঢামেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই শুরুতে স্থানীয় মানুষ এগিয়ে আসেন উদ্ধারকাজে। পরে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস যোগ দেয়। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিতে ৫৪টি আসন ছিল, তবে যাত্রী ছিলেন কমপক্ষে ৬০ জন।
এ দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে জেলা প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ছাড়া প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার এবং আহতদের ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, ইমাদ পরিবহনের বাসটি খুলনা থেকে ভোরে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। পথে বাগেরহাট, গোপালগঞ্জসহ সড়কের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী তোলে।
নিহতদের মধ্যে ১৭ জনের মরদেহ ছিল শিবচরে। তাদের সবার লাশ পরিবারের কাছে বিকেল ৩টার মধ্যে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে যাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয় তারা হলেন গোপালগঞ্জের গোপীনাথপুর এলাকার তৈয়ব আলীর ছেলে হেদায়েত মিয়া, বনগ্রাম এলাকার শামসুল শেখের ছেলে মোস্তাক আহমেদ, সদর উপজেলার নশর আলী শেখের ছেলে সজীব শেখ, পাচুরিয়া এলাকার মাসুদ হোসেনের মেয়ে সুইটি আক্তার, টুঙ্গিপাড়ার কাঞ্চন শেখের ছেলে করিম শেখ, সদর উপজেলার আবু হেনা মোস্তফার মেয়ে আফসানা মিমি ও মুকসুদপুর এলাকার আমজেদ আলীর ছেলে মাসুদ আলী, খুলনার সোনাডাঙা এলাকার শেখ মোহাম্মদ আলীর ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন, সাউথ মেন্টাল রোড এলাকার চিত্ত রঞ্জন ঘোষের ছেলে চিন্ময় প্রসূন ঘোষ, ডুমুরিয়া এলাকার পরিমল সাদুখার ছেলে মহাদেব কুমার সাদুখা, আমতলা এলাকার শাহজাহান মোল্লার ছেলে আশফাকুর জাহান লিংকন, বাগেরহাট জেলা শহরের শান্তি রঞ্জন মজুমদারের ছেলে অনাদি মজুমদার, ফরিদপুরের হিদাডাঙ্গা এলাকার সৈয়দ মুরাদ আলীর ছেলে মো. ইসমাইল হোসেন, নড়াইলের লোহাগড়া এলাকার বকু শিকদারের ছেলে ফরহাদ শিকদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলী আকবরের ছেলে ও ইমাদ পরিবহন বাসটির চালক জাহিদ হাসান, চালকের সহকারী মিরাজ এবং পাবনার সুজানগরের গহর আলীর ছেলে ইউসুফ আলী।
আর ঢামেক হাসপাতালে ছিল মিনহাজ বিশ্বাস (২০) ও শেখ আলী আকবরের (৭৫) লাশ। মিনহাজ গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মানিকদী গ্রামের মিজানুর রহমান বিশ্বাসের ছেলে। আর আলী আকবরের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায়।
মাদারীপুর পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, ‘অতিরিক্ত গতির কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। বেপরোয়া গতিতে চালানোর কারণেই বাসটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যায়। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দুর্ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন : ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাদারীপুর জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পল্লব কুমার হাজরাকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এতে সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান ফকির, বুয়েটের এআরআইয়ের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ-ই রাব্বি এবং মাদারীপুর বিআরটির সহকারী পরিচালক নুরুর হোসেন। গতকাল দুপুরে এসব তথ্য জানান শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’
নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের সহায়তা : দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিবুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
খুলনা থেকে ১৭ যাত্রী নিয়ে ছাড়ে বাসটি : খুলনা থেকে ১৭ জন যাত্রী নিয়ে ইমাদ পরিবহনের বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গিয়েছিল। পথে বাগেরহাটের ফকিরহাট ও গোপালগঞ্জ থেকেও আরও যাত্রী ওঠে বাসটিতে। খুলনার রয়্যাল মোড়ের কাউন্টার মাস্টার মো. শাফায়েত হোসেন মামুন জানান, ভোরে চারজন যাত্রী নিয়ে ইমাদ পরিবহনের বাসটি সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে যায়। সেখান থেকে আরও কয়েকজন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
ইমাদ পরিবহনের খুলনা জোনের ম্যানেজার জাকির হোসেন বলেন, ‘ভোরে খুলনার ফুলতলা থেকে একজন যাত্রী নিয়ে বাসটি রয়্যাল মোড়ের কাউন্টারের সামনে আসে। রয়্যাল মোড় থেকে কয়েকজন যাত্রী নিয়ে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে যায়। এখান থেকে ১৭ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। পথিমধ্যে বাগেরহাটের ফকিরহাট ও গোপালগঞ্জ থেকে আরও যাত্রী ওঠে বাসটিতে।’
সোনাডাঙ্গা থেকে ইমাদ পরিবহনের বাসটিতে ওঠা যাত্রী রফিকুল ইসলাম মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে গেছেন। তিনি পেছনের সিটে বসা ছিলেন। কীভাবে কী ঘটে গেল তা তিনি বলতে পারছেন না।
ঢামেকে চিকিৎসার জন্য ৯ জন : শিবচরের দুর্ঘটনায় আহতদের ঢামেক হাসপাতালে আনার আগে দুজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া আহত ৯ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হলেও ভর্তি রয়েছেন তিনজন। বাকিরা অন্যান্য হাসপাতালে চলে গেছেন। গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তাদের উদ্ধার করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। আহতরা হলেন বাসযাত্রী ফয়সাল আহমেদ (৩৬), আ. হামিম (৫০), বদরুদ্দোজা (৩০), পঙ্কজ কান্তি দাস (৪০), ঝুমা (৩৪), বুলবুল আহমেদ (৫০) ও এনামুল (৩৫)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বলেন, ‘মাদারীপুরের দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ৯ জনকে আনা হয়। তাদের মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থাতেই নিয়ে আসা হয়েছিল। আহতদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে পঙ্কজ কান্তি দাস, ঝুমা ও বুলবুল ভর্তি আছেন। তাদের অবস্থা গুরুতর। বাকিরা অন্যান্য হাসপাতালে চলে গেছেন।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন মাদারিপুর (শিবচর) প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা ও ঢামেক প্রতিনিধি
রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
এদিকে রাজধানীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বগুড়া, যশোরের মনিরামপুর, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও মাগুরায় পুলিশ সদস্যসহ আরও চারজন নিহত হয়েছেন। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
ঢাকা : গত শনিবার রাতে দুর্ঘটনায় নিহত হন কোরবান ব্যাপারী (৩০) ও শাহাবুদ্দিন (৩০)। নিহত কোরবান ব্যাপারীর বাড়ি শরীয়তপুর নড়িয়া উপজেলায়। তার বাবার নাম মৃত আবদুল হক ব্যাপারী। রাজধানীর শ্যামপুর ফরিদাবাদ লেনে থাকেন তিনি। নিহতের বড় ভাই সাদিকুর রহমান জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিল কোরবান। ফরিদাবাদ স্কুলের সামনে একটি ট্রাক মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিলে ছিটকে পড়ে সে। এতে সে ওই ট্রাকের চাকায় পৃষ্ট হয়। তাকে উদ্ধার হাসপাতালে নিলে রাত ২টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
এদিকে নিহত শাহাবুদ্দিনের ভগ্নিপতি আনিসুর রহমান জানান, শাহাবুদ্দিনকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কদমতলী ধলেশ্বর ঘাটে একটি বালুর ট্রাক ধাক্কা দেয়। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে রাত দেড়টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
বগুড়া : বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার জামাদার পুকুর এলাকায় ট্রাকের চাপায় আনুমানিক ৩৩ বছর বয়সী সাব্বির হোসেন নামে এক মোটরসাইকেলের চালক নিহত হয়েছেন।
মনিরামপুর (যশোর) : যশোরের মনিরামপুরের বটতলা এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় এম এ খালেক (৪৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
কুড়িগ্রাম : সদর উপজেলার ব্র্যাকমোড়ে বালুবোঝাই ট্রাক্টরের চাপায় শিশু মেরাজ হোসেন (৪) নিহত হয়।
মাগুরা : মাগুরার রামনগর এলাকায় বাসের ধাক্কায় লাবনী ভদ্র (২৬) নামে এক নারী পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন লাবনী ভদ্রর স্বামী পুলিশ কনস্টেবল প্রসেনজিৎ বিশ্বাস (২৯) ও মেয়ে অঙ্কিতা বিশ্বাস (৪)।
