বছরে ৩ লাখ কোটি টাকার কর ফাঁকি

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৩, ০২:০৭ এএম

বাংলাদেশে করপোরেট, ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন খাতে কর ফাঁকি ও কর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আর্থিক অঙ্কে এর পরিমাণ ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে; যা এনবিআরের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সমান। কর ফাঁকির এই পরিমাণ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ও কল্যাণ ব্যয়ের প্রায় আট গুণ।

গতকাল সোমবার বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘করপোরেট খাতে কর স্বচ্ছতা এবং জাতীয় রাজস্ব ও বাজেটে এর কী প্রভাব পড়তে পারে’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ তথ্য তুলে ধরেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কর জালের আওতা বৃদ্ধি করা, কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। 

১২টি প্রতিষ্ঠান, ১০ জন সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ, এনবিআরের দুজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতামত এবং কর এড়ানো ও কর ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে সিপিডি গবেষণার হিসাবটি তৈরি করেছে। উন্নয়ন সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইডের সহায়তায় এই গবেষণা পরিচালনা করে সিপিডি।

কর অব্যাহতির নির্দিষ্ট সময় ও লক্ষ্য, আর্থিক খাতের সমন্বিত লেনদেন, এ-সম্পর্কিত রিপোর্ট ইন্টিগ্রেট হওয়া, ডিজিটালাইজেশন ও ইন্টারনেটভিত্তিক ট্রানজেকশন ও কর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলক সাসটেইনেবল রিপোর্টিংয়ে যাওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের ২০২২ সালের রিপোর্ট তুলে ধরে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রতি বছর সারা বিশে^ প্রায় ৪৮৩ বিলিয়ন ডলার কর ক্ষতি হচ্ছে শুধু কর ফাঁকি এবং কর এড়ানোয়। এর মধ্যে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে হচ্ছে ৩১২ বিলিয়ন ডলার। ব্যক্তিপর্যায়ে সম্পদশালীদের মাধ্যমে হচ্ছে ১৭১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এর মাধ্যমে অভিঘাত পড়ে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর ওপর। এর কারণে স্বাস্থ্য খাতের ৪৮ শতাংশ বাজেট কমে যায়।

গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘বৈশি^ক পর্যায়ে করপোরেট করহার কমে আসছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে বেড়েছে। করপোরেট করহার কমিয়ে কর জাল বাড়িয়ে কর আদায় করা দরকার। করহার  বাড়ানোর ফলে প্রচুর কালোটাকা থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ করপোরেট করহার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত আফগানিস্তানের পরে সর্বনিম্ন। পার্সোনাল ও সেলস ট্যাক্স কম না কিন্তু সেটা আমরা নিতে পারছি না। উচ্চ করহার প্রদান করেছি ঠিকই, কিন্তু তার যে সুফল সেটা আমরা ভোগ করতে পারছি না। আবার কর কমিয়ে দিলেও রাজস্ব বাড়ে, সেটারও নিশ্চয়তা নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত এবং করহারের মধ্যে ফারাকটা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। এর প্রধান কারণ করকাঠামোর দুর্বলতা।’

সিপিডির গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আকার ৩০ শতাংশ। অথচ কর-জিডিপি অনুপাত ৯ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বড় হলেই কর আদায় কম হবে তা নয়। ব্রাজিলের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ৩৩ শতাংশ। কিন্তু তার কর-জিডিপি অনুপাত ৩২ শতাংশ। অন্যদিকে চীনের জিডিপিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু দেশটির কর জিডিপি অনুপাত ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০১০ সালে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে করের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ ছায়া অর্থনীতিতে ৮৪ হাজার কোটি টাকা কর ক্ষতি হচ্ছে। সে হিসাবে ১১ বছরের ব্যবধানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে করের পরিমাণ বেড়েছে চার গুণ; যা জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। এই টাকা যদি পাওয়া যেত তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় তিন গুণ বৃদ্ধি করা যেত।

সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেন না। বিপুল পরিমাণ কর আওতার বাইরে থেকে যাওয়া কিন্তু একটা মাথাব্যথার কারণ ট্যাক্স জিডিপির ক্ষেত্রে। কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি না হওয়ার বড় কারণ এটি। অন্যদিকে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে ২ লাখ ১৩ হাজার কোম্পানি রেজিস্টার্ড হলেও রিটার্ন দাখিল করে মাত্র ৪৫ হাজার কোম্পানি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তার গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলেন, ‘কর অস্বচ্ছতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কর ফাঁকি ও কর এড়ানো। কর ফাঁকি দিতে গিয়ে কোম্পানি তার প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে থাকে; অন্যদিকে কর এড়ানোর বিষয়টি হলো লিগ্যাল ফ্রেমের আওতায় সরকারের দেওয়া সুবিধা গ্রহণ। আমাদের দৃষ্টিতে এটাও কর অস্বচ্ছতা।’

তিনি আরও বলেন, সরকারের ছাড়, বিভিন্ন ধরনের সুবিধা, ট্যাক্স ব্রেক, ইনসেনটিভ, যেগুলো আসলে সরকারের রাজস্ব ব্যয়, সেটির সুবিধা দিয়ে থাকেন। এটি কিন্তু বৈধ। কিন্তু কর ফাঁকি অবৈধ। একটি বৈধ এবং একটি অবৈধ। কিন্তু দুটোই কর স্বচ্ছতার পরিপন্থী। সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু একটি আদর্শ কাঠোমোতে বলা হয়ে থাকে এই জায়গাগুলো সমতাভিত্তিক হওয়া দরকার।

কর ফাঁকি ও কর এড়াতে আর্থিক তথ্য লুকাতে বা গোপন করার প্রবণতা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈশি^ক ইনডেক্সে কর ফাঁকি ও কর এড়াতে আর্থিক তথ্য গোপন করার প্রবণতায় ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম।  বাংলাদেশ ২০২২ সালে আগের বছরের চেয়ে দুই ধাপ পিছিয়েছে; অর্র্থাৎ দেশে আর্থিক তথ্য গোপন করার প্রবণতা বেড়েছে।

কর ক্ষতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজস্ব কর্মকর্তা ও অডিটরদের সঙ্গে কথা বলে যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তা হলো, কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর মাত্রা ব্যাপক। কর ফাঁকি যদি ৮০ শতাংশ হয়, তাহলে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব হারাচ্ছি। আবার কর ফাঁকি যদি ৫০ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে রাজস্ব হারাই ৪১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ৪১ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার মতো আমাদের বাড়তি কর আদায়ের সুযোগ রয়েছে।’

অন্যদিকে কর এড়ানোয় যে ব্যয় হচ্ছে সেটা যদি ৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত হয় তাহলে এর পরিমাণ ১৪ হাজার কোটি থেকে ৬৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকার পাচ্ছে না।

এ সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘একটি যৌক্তিক, স্বচ্ছ, প্রগতিশীল এবং সুষম করব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। করব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার আয় করে এবং সেই আয়টাই বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক কর্মকা-ে ব্যয় হয়ে থাকে। আমরা যত স্বচ্ছভাবে, যত ভালোভাবে এই করব্যবস্থাটা আধুনিক করতে পারব এবং করব্যবস্থা থেকে কর আহরণ করতে পারব; তত ভালোভাবে ব্যয়ের জন্য একটা স্পেস থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু করপোরেট খাতেই নয়, বিভিন্ন খাতে, ব্যক্তি খাতেও কর এড়িয়ে যাওয়া কিংবা কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া করের নীতিমালাগুলোর ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কম কর দেওয়ার একটা চেষ্টা বিশ্বব্যাপীই রয়েছে। এর মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জাতীয় উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত