সামান্য আয়েই করের ভয়

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৩, ০২:১১ এএম

আয়কর আইন অনুযায়ী প্রকৃত আয় মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি বা বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি হলেই একজন ব্যক্তিকে বছর শেষে কর দিতে হবে। না হলে জেল-জরিমানা। বর্তমান পরিস্থিতিতে একে বাড়তি চাপ মনে করছেন সাধারণ আয়ের মানুষ। অনেকেই বলেছেন, যা আয় করি তা দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় পূরণ করতেই হিমশিম খাচ্ছি। কর দেব কোথা থেকে? অন্যদিকে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আইন করে সাধারণ মানুষকে কর পরিশোধে বাধ্য করছে। অথচ সরকারের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সম্পদশালীদের কাছে পড়ে আছে। তা আদায়ে অগ্রগতি নেই।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে, মূল্যস্ফীতি ওই অর্থবছরে গড়ে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ ছিল। পরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ হার ৫ দশমিক ৪৪, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭৮, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৬ শতাংশ হয়। মূল্যস্ফীতির হিসাব ভিন্ন হলেও পরের চার অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা একই রাখা হয়। করোনার মতো ভয়ংকর ব্যাধির কারণে অর্থনীতিতে ধস নামে। সাধারণ মানুয়ের অনেকের আয় কমে যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে অনেকে দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছ থেকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ব্যাপক চাপ আসে। করদাতা হারানোর ভয়ে এনবিআর আপত্তি জানায়। শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে ২০২০-২১ অর্থবছরে করমুক্ত আয় ৩ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়; যা চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরেও বহাল রাখা হয়েছে।

করোনা শেষ না হতেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বৈশি^ক মন্দা ও ডলার সংকট চলছে। প্রায় ছয়-সাত মাস থেকেই ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না, চাকরিতে বেতন বাড়ার সুখবর নেই বললেই চলে। আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে গড়ে কয়েক গুণ। এক বছরে খাদ্যপণ্যের সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত সব ধরনের খরচও বেড়েছে। সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। বিবিএসের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে মার্চে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩৩, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারিতে ৮ দশমিক ৭৮ ও জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ ছিল।

বর্তমানে আয়কর আইন অনুযায়ী, করদাতাদের আয় ৩ লাখ পর্যন্ত করমুক্ত। পরবর্তী ১ লাখ পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ৫, পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০, পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫, পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ ও অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর ধার্য রয়েছে।

চাকরিজীবী সাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করি। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ১২ হাজার টাকা ভাড়া বাসায়

থাকি। খাবার খরচে ১৫-১৬ হাজার টাকা লেগে যায়। সন্তানের পড়ালেখা, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ চালিয়ে নিতে অর্থ সংকটে পড়ি। কর দিতে না পারায় আমার অনেক সহকর্মীকে কর সার্কেলে তলব করা হয়েছে, জরিমানা করা হয়েছে। অনেকের হিসাব জব্দ পর্যন্ত করা হয়েছে। আইনের এমন কঠোরতা থাকলেও জীবনযাত্রার খরচ এত বেড়েছে যে এর মধ্যে কীভাবে করের টাকা জোগাড় করব?’

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ রুপি। পাকিস্তানে করমুক্ত আয়ের সীমা ৬ লাখ রুপি। থাইল্যান্ডে করমুক্ত আয়ের সীমা দেড় লাখ থাই বাথ। আর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে করমুক্ত আয়ের সীমা ১২ হাজার পাউন্ড। দেখা যায় কর ব্যবস্থাপনা উন্নত এমন বেশির ভাগ দেশের করমুক্ত আয়সীমা বাংলাদেশের চেয়ে গড়ে বেশি।

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছর এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশে আগামী অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা এক লাফে ৬০ হাজার কোটি বাড়িয়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে যে গাইডলাইন অর্থ মন্ত্রণালয়ে ও এনবিআরে পাঠিয়েছেন, সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, বৈশি^ক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সরকার চেষ্টা করছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিফলন রাখতে হবে। সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়ে এমন কেনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। সাধারণ মানুষের ওপর ভার হয় এমন রাজস্বের ভার কমাতে হবে।

গত মার্চ পর্যন্ত এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআর আগামী অর্থবছরে একটি টাকারও করছাড় দিতে রাজি নয়; বরং কোন খাতে নতুন কর-ভ্যাট-শুল্ক আরোপ করা যায় তার পথ খুঁজছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত এনবিআরের তৈরি এক প্রতিবেদনে বলা হয়, করমুক্ত সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হলে এক করবর্ষে (এক বছরে) এনবিআরের আদায় কমবে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। বছরে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয় আছে এমন করদাতাদের অধিকাংশই সাধারণ আয়ের। যদিও বর্তমানে ইটিআইএনধারী ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে রিটার্ন অর্ধেকে নেমেছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বছরে ৪ লাখ বা ৫ লাখ টাকা আয়সীমার মধ্যে থাকা সাধারণ আয়ের মানুষের কাছ থেকে এনবিআরের মোট লক্ষ্যমাত্রার অতিসামান্য আয় হয়। প্রায় এক বছর থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষ বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এসব মানুষকে চাপে ফেলে অল্প পরিমাণ কর আদায় করা ঠিক না। এতে তাদের কষ্ট বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব ফাঁকিবাজদের মধ্যে উচ্চ আয়ের করদাতা বেশি। তাই সাধারণ আয়ের করদাতাদের কিছুটা ছাড় দিয়ে বেশি আয়ের রাজস্ব ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের মনোযোগী হওয়া দরকার। এতে এনবিআরের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি হবে।

বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জোরালো দাবি জানিয়ে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরে আবেদন করেছে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর আবেদনে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করার দাবি করেছে। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি মে. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশি^ক মন্দার কারণে বেশি দামে পণ্য কিনে ন্যূনতম লাভে বিক্রি করলেও প্রায় সব জিনিসের দাম বেশি। সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের চাপে পড়েছে। প্রায় সব খরচই বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত