প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীদের হালের চাকরির বাজারে কদর বেশি। এরপর বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের। মানবিক ও কলা বিভাগের বিষয়গুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। অবশ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সীমিত পরিসরে এ বিভাগগুলো রাখছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগ খুলতে, সংশ্লিষ্ট বিষয় পড়তে ও পড়াতে চরম অনীহা। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, শিক্ষার্থীর নীতি-নৈতিকতা শেখা প্রয়োজন; ইতিহাস ও সাহিত্য জানাবোঝাও প্রয়োজন। তার জন্য বাংলা, ইতিহাস, দর্শনের মতো বিষয়গুলো পড়া দরকার শিক্ষার্থীদের। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব বিষয় খুলতেই আগ্রহী নয়। পড়ানো তো দূরের কথা। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও এসব বিষয় পড়তে আগ্রহী হতে দেখা যায় না তেমন।
সমাজের জন্য যেমন ডাক্তার, প্রকৌশলী দরকার, ঠিক তেমনি সাহিত্যিক, দার্শনিক, ইতিহাসবিদও প্রয়োজন। এজন্যই মানবিক ও কলা বিভাগের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজে যেমন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ডাক্তারের প্রয়োজন ঠিক তেমনি সৃজনশীল ব্যক্তি, সাহিত্যকর্মী, শিল্পীসহ নানা ধরনের মানুষের প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা সমাজ নিয়ে চিন্তা করে তাদের খুব প্রয়োজন। বিশ্বায়নের এ যুগে এসব মানুষের সংখ্যা কমছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, এসব বিষয় পড়লে চাকরি পাওয়া যাবে না। এরকম চলতে থাকলে একটা সময় আসবে যখন মানবিক মূল্যবোধ কমে যাবে। এটা ইতিমধ্যে উন্নত বিশ্বে হয়েছে। আমাদের দেশেও হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৯৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। শিক্ষার্থী ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ১০৭ জন। তাদের মধ্যে কলা ও মানবিকের বিষয়গুলো পড়েছে ৩২ হাজার ৭১৩ জন। মোট শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ মাত্র। ইংরেজি বিষয়টি মানবিক ও কলা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা সব বিশ^বিদ্যালয়েই রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই অন্য কোনো বিভাগের শিক্ষার্থী যে ইংরেজি বিষয়টা পড়ছে তার তথ্য মানবিক ও কলা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে মনে হয় মানবিক বিভাগে বেশ কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে। ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষার্থীদের বাদ দিলে কিন্তু মানবিক ও কলা বিভাগে শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।
ইউজিসির ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। তাদের ২২ হাজার ১০৬ শিক্ষার্থীর মাত্র ৬৬৭ জন মানবিক ও কলা বিভাগের। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)-এর ৮ হাজার ৭০৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৯, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর ৯ হাজার ৬০৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৯৩, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ১২ হাজার ১৯৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৮৩, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ৪ হাজার ৮৪২ জনের মধ্যে ৫৩৫, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ১৩ হাজার ৫৪৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০২, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ৯ হাজার ৬৭১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৬৫, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর ৪ হাজার ২৪৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৯৮ জন মানবিক ও কলা বিভাগে পড়ছেন।
মানবিক ও কলা বিভাগে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়ছেন শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে। তাদের ৪ হাজার ৬২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৩৭৬ জনই মানবিক ও কলা বিভাগে পড়ছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। তাদের ১৭ হাজার ১০৫ শিক্ষার্থীর ১ হাজার ৮২৩ জন মানবিক ও কলা বিভাগে। তৃতীয় সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে; ৭ হাজার ১২০ শিক্ষার্থীর ১ হাজার ৫২০ জন মানবিক ও কলা বিভাগে পড়ছেন। তবে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলোতে কলা ও মানবিকের শিক্ষার্থীই নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোর্স-কারিকুলামে মানবিকের বিষয়গুলো তেমনভাবে না থাকলেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) মানবিকের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সটি ১৬০ ক্রেডিটের। একজন শিক্ষার্থীকে সাড়ে ৯ ক্রেডিটের মানবিক, সোশ্যাল সায়েন্স ও বিজনেসের বিষয় পড়তে হয়। ইংরেজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ইকোনমিকস, অ্যাকাউন্টিং, সোশিওলজি, গভর্নমেন্ট ও ডেভেলপিং ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ স্কিল পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। এমবিবিএস অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদেরও মেডিকেল এথিকস নামে একটি বিষয় পড়তে হয়।
বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীর স্কিল ডেভেলপমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইনোভেটিভ কাজে আমাদের শিক্ষার্থীদের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করা হয়। এর মানে এই নয় যে, তাদের মেধা কম বা নিম্নমানের। অনেকে নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। এজন্যই মূলত প্রকৌশল শিক্ষায়ও মানবিকের বিষয়গুলো রাখা হয়েছে। তবে কোর্স দিয়ে সবসময় মানবিকতা শেখানো যায় না। তারপর ছাত্রদের শেখাতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সফল স্কিল কোর্স রাখা জরুরি। এর মধ্যে মানবিকের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত।’
সূত্র জানায়, দেশের ১০৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টিতে বাংলা বিভাগ চালু ছিল। সেগুলো হচ্ছে সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়, সিসিএন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি ও রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই ১৮ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থাকলেও চার বছরের স্নাতক (সম্মান) রয়েছে সাত-আটটিতে। সেগুলোও ভালোভাবে চলছে না। শিক্ষার্থীর অভাবে অনেক বিশ^বিদ্যালয় তাদের বাংলা বিভাগ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে।
২০১৭ সালে ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের সিদ্ধান্তে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশের অভু্যুদয়ের ইতিহাস’ এবং ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ নামের দুটি বিষয় যোগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কমপক্ষে দুই ক্রেডিট যাতে এ বিষয় দুটি পড়ানো হয় সে ব্যাপারে নির্দেশনাও জারি করে ইউজিসি। কিন্তু নির্দেশনার ছয় বছর পার হলেও বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় তা মানছে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ অনুযায়ী। এ আইনে কোনো কোর্সে বাংলা বিষয় যোগ করার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে ইউজিসির অনুরোধে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কান দিচ্ছে না। আর বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে প্রকৌশল, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত মানবিক ও কলা বিভাগের কোনো বিষয়ই পড়াতে চায় না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের আয় করে নিজেদের চলতে হয়। শিক্ষার্থীরা যেহেতু টাকা দিয়ে পড়ছে, তাই তারা মানবিক ও কলা বিভাগের বিষয়গুলো পড়তে চায় না। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিভাগগুলো খুলতে অনীহা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানবিক বিষয় না পড়লে তো মানবিক মানুষ গড়া যাবে না। অন্যান্য বিদ্যা হয়তো একটা কঙ্কাল গড়তে পারবে, কিন্তু তাতে রক্ত-মাংস হবে না। রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে যারা যুক্ত তারা মোটেই এ বিষয়গুলো ভাবছেন না। এটা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়।’
