সাজার আলাদা শুনানিতে আসবে ভারসাম্য

আপডেট : ২১ মে ২০২৩, ১২:৪০ এএম

কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হলে নির্দিষ্ট তারিখে সাজা বা খালাস দেওয়া আইনের প্রচলিত পদ্ধতি। হাইকোর্টের একটি রায়ে এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রাণদণ্ড ও যাবজ্জীবনসহ অন্যান্য সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের বিচারকদের আরও বেশি বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ধর্ষণের মামলায় বিচারিক আদালতে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির সাজা রহিত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের কিছু নির্দেশনা ও অভিমত এসেছে। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি বিশ^জিত দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর সরাসরি কাউকে সাজা না দিয়ে বিচারক তার অভিমত ব্যক্ত করবেন। কী ধরনের সাজা হবে বা হতে পারে পৃথক শুনানির পর তা নির্ধারণ করবেন বিচারক। রায়ে প্রাণদন্ডের মতো কঠোর সাজা, কনডেম সেলে থাকা আসামির বিচ্ছিন্ন জীবনের প্রসঙ্গসহ সর্বোচ্চ সাজার ক্ষেত্রে বিচারকদের আরও সতর্ক হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজা নিয়ে বিশ্বজুড়েই বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশেও বেশি মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে, আসামিকে শুধু ফাঁসি, যাবজ্জীবন বা অন্য মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করার প্রবণতা নিয়েও।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিন্ন সাজা নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে বিশে^র অনেক দেশে সাজা নির্ধারণের আগে পৃথক শুনানি ও বিচারকের মতামত প্রকাশের চর্চাও রয়েছে পাশের দেশ ভারতসহ অনেক দেশে। আইনজীবীদের মতে, বেশি বেশি কঠোর সাজার দৃষ্টান্ত তৈরি করে অপরাধ নির্মূলের ধারণা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধ, আইন ও আদালত নিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সুযোগ হবে। মামলাজট, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারক ও জনবল সংকটের মতো নানা কারণে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের এ রায় বাস্তবায়ন একটু কঠিন হলেও এ রায় সাজা, অপরাধীর সংশোধন কিংবা বিচারকাজে ভারসাম্য আনবে বলে মনে করেন তারা।

হাইকোর্টের এ রায় নিয়ে দেশ রূপান্তরের প্রশ্নের জবাবে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাননি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়টি এখনো পর্যালোচনা করিনি। তবে, হাইকোর্টের রায় আমরা সবাই মানতে বাধ্য। কিন্তু এটি আইনের সঙ্গে কতটুকু সম্পর্ক আছে না আছে, এটা দেখে সরকারের সঙ্গে কথা বলব। প্রয়োজন মনে করলে সরকার যদি অনুমতি দেয় আপিল বিভাগে যাব। এর আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’

প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, হাইকোর্টের এ রায় বাস্তবায়ন হলে ফৌজদারি কোনো মামলায় উভয় পক্ষের (রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষ) সন্তুষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হবে। বিচারকরাও কঠোর শাস্তি নির্ধারণের আগে বিবেচনার সুযোগ পাবেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘অপরাধ করলে সাজা হবে এটি আইনের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একপক্ষ রায়ে খুশি, অন্যপক্ষ ক্ষুন্ন। এখন রায় বা সাজা এমন হওয়া উচিত যাতে উভয় পক্ষের কেউ যেন ক্ষুন্ন না হয়। হাইকোর্টের এই রায়টি এমন পরিস্থিতি নিরসনে কতটুকু সহায়ক হবে তা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের আলোকে একটি গাইডলাইন বা আইন তৈরির প্রয়োজন হবে। সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া।’ 

হাইকোর্টের এই রায়ে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজা, ঘটনা বা পরিস্থিতির তীব্রতা, অপরাধীর বয়স, সামাজিক অবস্থান ও চরিত্র, একজন অপরাধী অভ্যাসগত বা পেশাদার অপরাধী কি না এমন প্রসঙ্গ যেমন এসেছে, তেমনি বিলম্বিত বিচারে আসামি বা অপরাধীর মানসিক যন্ত্রণা ভোগসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংশোধন প্রসঙ্গটিও এসেছে। একই সঙ্গে এসেছে স্যান্টেসিং গাইডলাইনের (অভিন্ন সাজা নীতিমালা) প্রসঙ্গটিও। মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজার বিষয়ে হাইকোর্টের অভিমত হলো একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়া একটি অত্যন্ত গুরুতর কাজ। আইন দ্বারা বাধ্য করা না হলে আদালত সর্বদা এ জাতীয় কোনো আদেশ দিতে অনিচ্ছুক। আধুনিক বিশ্বের কিছু দেশ ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা বাতিল করেছে। বাংলাদেশের বিচারিক আদালতগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের হার দ্রুত ও ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আদালত বলে, বিদ্যমান কারাবিধি অনুসারে বন্দিকে (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) বিচ্ছিন্ন কনডেম সেলে পাঠানো হয়। অন্যদিকে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হতে লাগে ছয় বছর। এ ছয় বছরে একজন আসামিকে বিচ্ছিন্ন সেলে থাকতে হয়। তাই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারকদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত।

সর্বোচ্চ দণ্ড নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যে হাইকোর্টের এমন পর্যালোচনা ও অভিমতকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, ফৌজদারি আইনে যাদের কঠোর বা অন্যান্য সাজা হয় তাদের শতভাগের কাছাকাছি নিম্নবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষ এবং অনেক ক্ষেত্রে শাস্তিটা সংশোধনমূলক না হয়ে অনেকটা প্রতিশোধমূলক হয়ে উঠেছে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘একটা সমাজ কতটা সভ্য সেটা সেই সমাজে কতসংখ্যক মৃত্যুদণ্ড হয় সেটি দেখলেই ধারণা পাওয়া যায়।’

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ফৌজদারি বিচারের শুরুতে শাস্তিটা ছিল প্রতিশোধমূলক। এরপর সেই ধারণা পরিবর্তিত হয়ে হলো শাস্তির মাধ্যমে অন্য লোকদের সতর্ক করা। কিন্তু এখন আবার প্রতিশোধমূলক শাস্তির নীতি চলে এসেছে। যে কারণে ফাঁসির দণ্ড কমছে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, ‘অধস্তন আদালতের বিচারকদের অনেকে মনে করেন, যত বেশি কঠোর সাজা দেওয়া যাবে তত দ্রুত পদোন্নতি। আবার অনেকে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে এই বিবেচনায় সাজা দেন। এখন কেন মৃত্যুদণ্ড, কেন যাবজ্জীবন পাঁচ বছর বা সাত বছর সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকে না। বিগত ১০০ বছরেও এই চর্চা তৈরি হয়নি। হাইকোর্টের রায়ে এ সুযোগটা তৈরি হলো।’ তবে, এ রায়ের আলোকে সাজার নীতিমালা বা আইন নিকট ভবিষ্যতে হবে কি না তা সরকারের আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টসের (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান মনে করেন, ‘এই রায়টি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। সাজার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর সংশোধনে সহায়ক হবে। তবে, এটি অপরাধপ্রবণতা রোধ করতে পারবে কি না সে নিয়ে আরও অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই রায়ের আলোকে সরকার অবিলম্বে একটি স্যান্টেন্সিং গাইডলাইন করতে পারে। প্রয়োজনে আইন করতে পারে। কেননা এ রায়ে সাজার বিষয়ে বিচারকদের আরও বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত