এটা নিষেধাজ্ঞা নয় সতর্কবার্তা

আপডেট : ২৬ মে ২০২৩, ০৬:১৫ এএম

বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তা করারও পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা খোলামেলাভাবেই বলছে, তারা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। গত বুধবার দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণায়ও সেই প্রত্যাশার কথাই বলা হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঘোষিত ভিসানীতি নিয়ে আসলে কোনো রাজনৈতিকপক্ষ বা নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কারও নেতিবাচক বা ইতিবাচক মন্তব্য করার সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। এখানে তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সবপক্ষের প্রতিই একটা বার্তা দিয়েছে। এটাকে সতর্কবার্তা বলা যেতে পারে। তবে এটা কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। কাজেই কারও খুশি হওয়া বা বেজার হওয়ার বিষয় এ নতুন ভিসানীতিতে নেই।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটা সারা বিশ্বে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন তথা জো বাইডেন প্রশাসনের যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ করার লক্ষ্য, এটি তারই একটি প্রচেষ্টা।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল এবং নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবেন তাদের অবশ্যই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকেই যাওয়া উচিত। তারা বলেন, বিএনপি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। তারাও বিদেশিদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করছে। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ সফরে আসা মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল বৈঠক করছে। এসব বৈঠকে তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না বলে দাবি করেছে। এজন্য তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক মহল থেকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনো কোনো বক্তব্য আসেনি। সবাই দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা করে। তারা মনে করেন, এবার নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিদেশিদের কোনো বিষয় নেই। তারা বরং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনেই চায়। আর এর মধ্যে সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ও দেশের বাইরে তার বক্তব্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বার্তাই দিচ্ছেন। তারপরও বড় দল বিএনপির দাবিগুলোর বিষয়ও হয়তো বিদেশিরা দেখছে।

প্রসঙ্গত, নতুন ভিসানীতিতে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত বা তাতে সহায়তা করলে যেকোনো ব্যক্তিকে আর ভিসা নাও দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যাদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মরত কিংবা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, সরকারি বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা পরিষেবার সদস্যরাও রয়েছেন।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. বশির আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই কথা বলছে। গত ২০২২ ও ’২৩ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। গত এক বছরে ওয়াশিংটন থেকে অনেক কর্মকর্তারা এসেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী এবং বাংলাদেশের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক রিলেশনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়েও তারা তাদের অভিমত প্রকাশ করেছেন। সেসব বক্তব্যে তারা বলেছেন, পরবর্তী যে সংসদ নির্বাচন হবে তা যেন কোনো প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে। সেই নির্বাচন যেন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়। সেই বিষয়টা মার্কিন প্রশাসন ও পর্যবেক্ষকরা বলে আসছেন। সরকারের আলোচনায়ও তা উঠে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রশাসন এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের যে এজেন্ডা সেটা বিশ্বব্যাপী যে গণতন্ত্রকে প্রসারিত করা এবং সম্প্রসারণ করা। ডেমোক্রেটিক পার্টির যে এজেন্ডা তা হলো বিশ্বে তারা পশ্চিমা গণতন্ত্রের যে বিকাশ ও প্রকাশ দেখতে চায়, সেটা এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

নতুন ভিসানীতিতে নির্বাচনে কী প্রভাব পড়বে এ প্রশ্নে ড. বশির বলেন, এটা আসলে তাদের সেøাগান। তারা এটা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জানিয়েছে। এটা কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। এটাকে একটা বার্তা বা সতর্কবার্তা বলা যায়। নির্বাচন অনুষ্ঠান যারা বানচালের চেষ্টা করবে, সেটা শুধু সরকারি এজেন্সি বা সরকারি দলই নয়, বিরোধী দল থাকতে পারে। সরকারপক্ষ এটা গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ এবং পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে ইসির মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় সেটিই তারা বলেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন ভিসানীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দুটি বার্তা দিতে চেয়েছে। যারা ইতিবাচকভাবে এবং স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে তাদের এ ভিসানীতিতে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। এ প্রক্রিয়াকে যারা ব্যাহত হ‌ওয়ার চেষ্টা করবে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি, ভোট কারচুপি, অস্থির পরিবেশ তৈরি করা, তারা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা ভিসার জন্য বিবেচিত হবেন না। বলা হয়েছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা স্বাভাবিক গতিতে চলার জন্য যারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে, তাদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র নেতিবাচক থাকবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বাংলাদেশের প্রায় সব বন্ধুরাষ্ট্রই বলে আসছে। জাতিসংঘও বিষয়টি নিয়ে বলেছে দুদিন আগে। এ কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষকেই বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

গত বুধবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন জানান, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সহায়তার জন্য নতুন এ পলিসির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নতুন পলিসি অনুযায়ী, বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করলে বা তাতে সহায়তা করলে যেকোনো ব্যক্তিকে আর ভিসা নাও দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যাদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে তাদের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মরত কিংবা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, সরকারি বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা পরিষেবার সদস্যরাও রয়েছেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র গত ৩ মে বাংলাদেশকে অবহিত করেছে।

যেসব কাজকে যুক্তরাষ্ট্র গর্হিত হিসেবে অভিহিত করেছে সেগুলো হচ্ছে ভোটে কারচুপি, ভোটারদের ভয় প্রদর্শন, সহিংসতার মাধ্যমে মানুষকে জমায়েত বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে না দেওয়া। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীলসমাজ বা মিডিয়াকে তাদের মতপ্রকাশ করতে না দেওয়াও গর্হিত হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত