২০১৯ সালের ১২ মে হাইকোর্টের একটি রায়ের মন্তব্য ছিল এমন ‘আইনের প্রয়োগ এবং এর ব্যাখ্যা যান্ত্রিক হতে পারে না। আইনের শাসনের মূল লক্ষ্যই হলো অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করা।’ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যৌতুকের সাজা-সংক্রান্ত ১১(গ) ধারার অস্পষ্টতা ও অসংগতি তুলে ধরার ওই রায়ের পর ধারাটি সংশোধন করে আপসযোগ্য করে সরকার।
মানুষের প্রয়োজনে আইন হয়। পুরনো আইনের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন আইন। কিন্তু অনেক আইনের ধারার অস্পষ্টতা, অসংগতির পাশাপাশি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ে আপত্তি ও প্রশ্ন উঠলেও সমাধান হয় না। কিছু ব্যতিক্রম বাদে গত দুই দশকে বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠেছে জনগুরুত্বপূর্ণ এমন বেশ কিছু আইনের সংশোধন বা পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় কিংবা আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
এ ছাড়া অসংগতিপূর্ণ ধারা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে মামলা, রুল হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির বিষয়টি উদ্যোগহীনতায় আটকা পড়ে। অসংগতি ও অস্পষ্টতা আছে বিভিন্ন আইনের অন্তত ১৮টি ধারা পর্যালোচনা করে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা মনে করেন, ১৬৩ বছরের পুরনো দণ্ডবিধি, ১২৫ বছর আগের ফৌজদারি আইন ও দেড়শ বছরের পুরনো সাক্ষ্য আইনে দেশের আদালতগুলোতে বিচার কার্যক্রম চলে। সংগত কারণেই পুরনো আইনের সংস্কার, সংশোধন বা পরিমার্জন করে আইনগুলোকে আরও যুগোপযোগী ও যান্ত্রিকতামুক্ত করার তাগিদ আসে।
১৯৯৯ সালের মানবদেহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনে শুধু নিকটাত্মীয়ের মধ্যে কিডনি দান ও প্রতিস্থাপনের বিধান থাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার বিপাকে পড়েন নিয়মিত। ওই আইনের ২(গ), ৩ ও ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জে করা রিট আবেদনের ওপর ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বরে হাইকোর্টের একটি রায়ে জটিলতা কেটে নিকটাত্মীয়র বাইরেও যাচাই সাপেক্ষে কিডনি দানের পথ খোলে। তবে, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, হাইকোর্টের রায়ে আইনটি ছয় মাসের মধ্যে সংশোধনের তাগিদ দেওয়া হলেও সাড়ে তিন বছরের বেশি চলে গেছে। এ নিয়ে উদ্যোগ নেই। ভুক্তভোগীদের ভোগান্তিও কমেনি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক চলছেই। আইনের ২৫ ধারার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ ও প্রকাশের বিষয়ে এবং ৩১ ধারায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে সাজার কথা বলা হয়েছে। তবে, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, ধারা দুটিতে ধর্তব্য অপরাধের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না হওয়ায় যাকে-তাকে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে অহরহ। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই ধারার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। তিন বছর পর গত মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রুলের ওপর শুনানি শুরু হয়।
রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুনানির একপর্যায়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়। আবেদনটি এখতিয়ারসম্পন্ন অন্য একটি বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে।
২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় ধর্ষণের অপরাধে যাবজ্জীবন (আইন সংশোধনের পর মৃত্যুদণ্ডযোগ), ৯(৪) (ক) ধারায় ধর্ষণে মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা বা আহত করার চেষ্টার অপরাধে যাবজ্জীবন (সংশোধনের পর মৃত্যুদণ্ড যোগ) এবং একই আইনের ১১(ক) ধারায় যৌতুকের জন্য কোনো নারীর মৃত্যু ঘটালে একমাত্র সাজা মৃত্যুদণ্ডের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে রুল দেয়। আইনজীবীদের ভাষ্য, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিন ধারায় মূল আসামির যে সাজা হয় সহযোগী আসামিরও তাই হয়। আসামির হয় সর্বোচ্চ সাজা হবে অথবা খালাস পাবে। এসব ধারা বিচারকদের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। এখন পর্যন্ত ওই রুলের নিষ্পত্তি হয়নি। রিটকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের কার্যতালিকায় এটি শুনানির জন্য আছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও ১৬৭ ধারা অনুযায়ী রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ অনেক পুরনো। ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল যুগান্তকারী এক রায়ে দুই ধারা সংশোধনসহ বেশ কিছু সুপারিশ করে আদেশ দেয় হাইকোর্ট। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর সর্বোচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকে। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ের ২০ বছরের বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এ রায় নিয়ে আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদনের ওপর শুনানি গত বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে।
ছেলেশিশু, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি অহরহ যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও দণ্ডবিধিতে ধর্ষণ সম্পর্কিত সাজার ৩৭৫ ধারায় এই অপরাধের উল্লেখ নেই। ওই ধারায় শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে শুধু নারীর কথা বলা আছে। ধারাটি চ্যালেঞ্জ করে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল এ ধারা সংশোধন প্রশ্নে রুল দিলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এ রিট মামলার আইনজীবী তাপস কান্তি বল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রুলের পর একাধিক বেঞ্চে শুনানি করতে উপস্থাপন করেছিলাম। কিন্তু আদালত বলেছে তারা পরে এটি শুনবে। পরে বিচারক বা এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি।’
গর্ভের সন্তান বৈধ নাকি অবৈধ তা বিচার-সংক্রান্ত সাক্ষ্য আইনের ১১২ ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২০ সালের ৯ মার্চ রুল দিয়েছিল হাইকোর্ট। রুলের নিষ্পত্তি এখন পর্যন্ত হয়নি। দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের (পরকীয়ায়) শাস্তির বিষয়ে ব্যাখ্যার অর্থ দাঁড়ায়, যদি স্বামী পরকীয়া করেন, তাহলে স্ত্রী তার স্বামী বা অন্য নারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন না। আবার স্ত্রী পরকীয়া করলে স্বামীরও স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ নেই। তবে স্ত্রী যার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়াবেন, তার স্বামী ওই পুরুষটির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। অন্যদিকে স্বামীর অনুমতি নিয়ে পরকীয়া করলে তাও অপরাধের পর্যায়ে পড়বে না। ২০১৯ সালের ৮ জুলাই ধারাটি সংশোধন প্রশ্নে রুল দিলেও নিষ্পত্তির পথে যায়নি। এ দুটি রিট মামলার আইনজীবী ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সময় শুনানির চেষ্টা হলেও বেঞ্চের এখতিয়ার কিংবা বিচারক পরিবর্তনের কারণে সেটি হয়নি।
শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষায় ২০০৬ সালে হয় শ্রম আইন। তবে, এ আইনের বিভিন্ন ধারার অসংগতি ও অস্পষ্টতা নিয়ে আগেও প্রশ্ন ছিল, এখনো আছে। আইনের ২১৭ ধারা অনুযায়ী, শ্রম আদালতের রায়, সিদ্ধান্ত, রোয়েদাদ বা দণ্ডের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষের আপিলের নিষ্পত্তি হবে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে এবং এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। অন্যদিকে ২১৮ ধারা অনুযায়ী, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালকে হাইকোর্ট বেঞ্চের সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আইনের এ অস্পষ্টতা ও অসংগতির সুযোগে সংবিধানের ১০২ অনুযায়ী অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। ফলে অসংখ্য মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে বিচার দীর্ঘায়িত হয়।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস’র (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান মনে করেন, আইনের ধারার এসব অসংগতি ও অস্পষ্টতা দূর না হওয়ার অন্যতম কারণ সুপ্রিম কোর্টের কোনো পৃথক সচিবালয় নেই। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘যখনই কোনো ধারা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন এটি সংশোধনের প্রশ্ন আসে। কিন্তু আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত কোনো পৃথক সেল নেই। বিচার বিভাগেরও পৃথক সচিবালয় নেই। আর আইন চ্যালেঞ্জ করে যারা মামলা করেন, তাদের অনেকের মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগে ঘাটতি দেখা যায়।’ তিনি বলেন, ‘এখন যেসব ফৌজদারি অপরাধ হয় তা কিন্তু আর ব্রিটিশ আমলের আইনের আলোকে নেই। তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই আইনগুলো সংস্কারের প্রশ্ন আসে।’
ফৌজদারি দণ্ডবিধির অনেক ধারাই অপ্রাসঙ্গিক : আইনজীবীদের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলে তখনকার পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে তৈরি আইনের অনেক ধারাই এখন বেমানান। প্রায়ই পাড়া-মহল্লার এখানে-সেখানে কিছু মানুষকে মদ্যপান করে মাতলামি করতে দেখা যায়। এতে সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হয়। নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কিন্তু দণ্ডবিধির ৫১০ ধারায় মাতলামির সাজা হিসেবে ১০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা ২৪ ঘণ্টার বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া কেউ যদি কারও সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝগড়া বিবাদ বা মারামারি করে তাহলে শান্তিভঙ্গের কারণে অভিযুক্তকে দণ্ডবিধির ১৬০ ধারায় সর্বোচ্চ ১০০ টাকা জরিমানা অথবা এক মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। অন্যদিকে প্রায়ই অনুষ্ঠানের নামে দিনরাত উচ্চস্বরে গানবাজনা, হই-হুল্লোড় করে গণ-উৎপাতের ঘটনা নিয়ে ঝগড়া, সংঘর্ষ এমনকি খুনোখুনিও হয়। গণ-উৎপাতের অপরাধে দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা জরিমানা করা যাবে। আইনজীবীরা এমন অনেক অসংগতি তুলে ধরে বলেন, এমন ধরনের মামলা আদালত পর্যন্ত এসেছে কারও দণ্ড বা সাজা হয়েছে তা তাদের জানা নেই।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মতামত জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সাড়া মেলেনি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন তৈরি বা সংশোধন করে জাতীয় সংসদ। কিন্তু সেখানে এখন ব্যবসায়ীদের আধিক্য বেশি। ফলে তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা বেশি উৎসাহী এবং সেগুলোই তারা করেন। যেটি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হয় না।’