আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেছেন, তার দেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না। তারা চায় একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা বাংলাদেশের জনগণকে তাদের পরবর্তী সরকার বেছে নিতে দেবে। নির্বাচন পদ্ধতি ঠিক করবে রাজনৈতিক দলগুলো। তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত নির্বাচন সমর্থন করেন।
অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীনরা বিদেশিদের কোনো চাপ অনুভব করছেন না। তবে আওয়ামী লীগ নিজেদের বিবেকের চাপ অনুভব করছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বৈঠক করেন। বৈঠক শেষ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও পিটার হাস সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
বেলা সোয়া ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বৈঠক হয়।
ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান, আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
পিটার হাস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সবার ভূমিকা রয়েছে। সরকারের ভূমিকা আছে, মিডিয়ার ভূমিকা আছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ ও বিচার বিভাগ, সিকিউরিটি ফোর্সেস (নিরাপত্তা বাহিনী) এবং অবশ্যই ভোটারদের ভূমিকা আছে। প্রত্যেককে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি আবারও বলেছি, যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না এবং আমরা যা সমর্থন করি তা হলো একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা বাংলাদেশের জনগণকে তাদের পরবর্তী সরকার বেছে নিতে দেবে।’
আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে এবং সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে। অন্যদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন করছে; এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী জানতে চাইলে পিটার হাস বলেন, ‘এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অবস্থান নেই। এটি রাজনৈতিক দলের ব্যাপার।’
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠককে বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশীদারদের সঙ্গে হওয়া বৈঠকের অংশ বলে উল্লেখ করেন পিটার হাস। তিনি বলেন, ‘আমি অন্যান্য রাজনৈতিক দল, মিডিয়া আউটলেট, সুশীলসমাজ, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এবং এটি মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমি যা করি তার অংশ।’ প্রতিটি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপে আওয়ামী লীগ কোনো চাপ অনুভব করছে কি নাÑ এমন এক প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা আমাদের লক্ষ্যে অবিচল। আমরা বাইরে এক কথা, ভেতরে আরেক কথার মনোভাব নিয়ে এগোচ্ছি না। তাই চাপ অনুভব করব কেন? অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করা আমাদের প্রতিশ্রুতি। এটা আমাদের করতেই হবে। তাই এখানে কোনো চাপের বিষয় নেই। যদি বলেন, চাপÑ তাহলে বিবেকের চাপ। আমরা বিবেকের চাপ অনুভব করতে পারি যে।’
তিনি বলেন, ‘আমেরিকার সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেনদেন আছে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান। আমেরিকার মান্যবর রাষ্ট্রদূত আমাদের পার্টি অফিসে আলোচনা করার জন্য এসেছিলেন। তারা আমাদের এই অফিসে আগে কখনো আসেননি। তিনি এসেছেন, দেখে গেছেন।’
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে। আমরা সব সময় যা বলি, নির্বাচন নিয়ে আমাদের যে বক্তব্য, আমরা যার সঙ্গে আলাপ করি, আমাদের অঙ্গীকার ও বক্তব্য একটি, সেটা অত্যন্ত জোরালো এবং পরিষ্কার। আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আমরা সবার সঙ্গে বলছি। এটা দেশের জনগণের কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি।’
এর আগে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ করে। এ বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা এসব অভিযোগ নিয়ে কোনো আলোচনা করিনি। আপনি আমার ঘরে মেহমান আসছেন, আমি যখন কথা বলব তখন অভিযোগের সুরগুলো থাকবে না। এটাই স্বাভাবিক। আমরা আমাদের কথা বলেছি, তার কথা তিনিই বলেছেন।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার, শেখ হাসিনার পদত্যাগ, সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের বিলুপ্তি এ ধরনের একটা কথাও বলেননি। তাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।’
সংলাপের বিষয়েও কোনো কথা হয়নি বলে জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘যা হয়নি, সেটা কেন বলব।’
নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পরামর্শ দিয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এখানে পরামর্শের কোনো বিষয় আসেনি।’
দুর্নীতি মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জোবাইদা রহমানের রায়কে সরকারের ফরমায়েশি বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে দলটি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘খালেদা জিয়ার জন্য তারা দেখার মতো একটা মিছিল করতে পারেনি। তারেক রহমানের জন্য কিছু করবে... একই লোক, একই নেতৃত্ব। বিএনপির দৌড় কত দূর পর্যন্ত তা গত ১৪ বছর ধরে দেখে আসছি।’
ফরমায়েশি রায়ের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা বলা ছাড়া আর কী বলবে? তাদের একটা কিছু তো বলতে হবে বিরোধী দলের ভাষায়। এটা বিরোধী দলের ভাষা।’
রাজনৈতিক দলগুলোর একসঙ্গে বসে চা খাওয়া উচিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়ালের এমন বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে কাদের বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো কী করবে, সেটা তাদের বিষয়, সেটা নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়। এটা তার এখতিয়ারে মধ্যে পড়ে না। তার দায়িত্ব হলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা।