বহু প্রাণ কেড়ে কমছে পানি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৩, ০২:১১ এএম

টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় দেখা দেওয়া আকস্মিক ও স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলো থেকে পানি নামতে শুরু করায় জেগে উঠছে ক্ষত। আসছে জানমাল হারানোর নতুন নতুন তথ্য। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ও বন্যার পানি ভেসে গিয়ে প্রাণ গেছে অন্তত ৪৩ জনের। নিখোঁজ রয়েছে আরও অন্তত ১০ জন। নিহতদের মধ্যে কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ২০ জন, চট্টগ্রামে ১৩, বান্দরবানে ৮ ও রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাণহানির পাশাপাশি ফসল, খামার ও অবকাঠামো ক্ষতির পরিমাণও বিপুল। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার ও পানির সংকট। এখনো অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে টানা বর্ষণে পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় চারজন, লোহাগাড়ায় চার ও চন্দনাইশে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বাঁশখালী, রাউজান ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন করে মৃত্যু হয়েছে। আর সাতকানিয়া উপজেলায় এখনো নিখোঁজ আছে সাতজন।

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহ মজুমদার জানান, ১৪ উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার ১২টি পরিবারের ৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৩০ জন লোক বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকার। এর মধ্যে সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। গত বুধবার পর্যন্ত এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এক সপ্তাহ পর ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যবে বলে জানান জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘বন্যায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কৃষি, মৎস্য, গবাদি পশুর অনেক ক্ষতি হয়েছে। চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও সাতজন নিখোঁজ আছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।’

এদিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানিয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ উল্লাহ বলেন, ‘বন্যার পানি নেমে গেছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি, মৎস্য, সবজি, গবাদি পশুর ক্ষতি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বন্যায় লোহাগাড়ায় বিধ্বস্ত হয়েছে দুই শতাধিক বসতঘর। উপজেলার টংকাবতী নদী, ঢলু, হাঙর, হাতিয়াসহ বিভিন্ন খাল আর ছড়ার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত, মৎস্য প্রকল্প ও পুকুর। সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, গেল ছয় দিনে বন্যার পানিতে ডুবে, পাহাড়ধসে ও সেফটিক ট্যাংক থেকে বন্যার পানি পরিষ্কার করতে গিয়ে ২০ জন মারা গেছে। কোথাও মহাসড়ক, সড়ক, কাঁচা রাস্তা, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। অনেক স্থানে বীজতলা, ফসলের মাঠ, মাছের ঘের, বেড়িবাঁধ, ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। চার দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের জন্য হাহাকার বাড়ছে মানুষের।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে বানভাসিদের মধ্যে ১০৩ টন চাল ও ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণের তথ্য জানানো হলেও সেই ত্রাণ পানিবন্দি মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। বন্যাদুর্গত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেক পরিবারের ঘরে রান্নার চাল থাকলেও শুকনো লাকড়ি ও চুলার অভাবে রান্না করতে পারছেন না।

জানা গেছে, কক্সবাজারে ৬০ ইউনিয়নে ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাব মতে, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি ১ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া বন্যায় নির্মাণাধীন কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রেললাইনের বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়া এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকায় রেললাইনটির ৫৯ কিমি সড়ক বিধ্বস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, বন্যায় চকরিয়া, পেকুয়া, রামু এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের বেশ কিছু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করতে পারেনি কর্র্তৃপক্ষ। প্রকল্পের কিছু জায়গায় রেললাইন পানির নিচে চলে গেছে। বন্যায় রেললাইনের পাথর, মাটি ও বাঁধ ভেসে গেছে। কিছু অংশে রেললাইন হেলে পড়েছে। এবারের ক্ষতি এ প্রকল্পের জন্য গুরুতর ধাক্কা এবং এ ক্ষতির কারণে প্রকল্প শেষ হতে দেরি হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) বিভীষণ কান্তি দাশ জানান, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ৬০ ইউনিয়নে ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ১০৩ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানে বন্যায় ও পাহাড় ধসে এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছে দুজন এবং আহত হয়েছে ১৭ জন। গতকাল দুপুরে বন্যা-পরবর্তী সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন। জেলা প্রশাসক বলেন, ইতিমধ্যে পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বান্দরবান সদর ও লামা এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি এখন বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি তিন উপজেলা ছাড়া অন্য তিন উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সচল হয়েছে। ঢাকা থেকেও কয়েকটি বাস যাওয়া-আসা করেছে।

তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে এ পর্যন্ত ১৬৮ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৫০ হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানিও বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণসামগ্রীর ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি এখনো অনুকূলে রয়েছে। তবে একটাই চ্যালেঞ্জÑ বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন। চতুর্থ দিনের মতো বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছি আমরা। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা হচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, এখানে কৃষি বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ রয়েছে। তাদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার জন্য বলা হয়েছে। অন্যসব অঞ্চল থেকে পানি সরে গেলে তারা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আমাদের জানাতে পারবে।

গত এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবান শহরের নিম্নাঞ্চল এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে। এতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসগুলোতে কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও বুকসমান পানি উঠে যায়। বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যায় নিম্নাঞ্চলের শত শত বসতবাড়িও।

গত বুধবার থেকে ভারী বৃষ্টি না থাকায় বান্দরবানের সব নিম্নাঞ্চল এলাকা থেকে পানি নেমে যায়। তবে সরকারি অফিস-আদালত, দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে জমে যায় কাদাপানি। দুদিন ধরে জমে থাকা কাদামাটি পরিষ্কার করতে দেখা যায় স্থানীয় লোকজনদের।

বান্দরবান বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী দীপ্ত চক্রবর্তী বলেন, যে দুটি ট্রান্সফরমার দিয়ে বান্দরবানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় সেই দুটি ট্রান্সফরমারের প্যানেল পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে ছিল। ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ কারিগরি টিম নিয়ে এসে বুধবার রাত থেকে মেরামত করা হচ্ছে। আশা করছি, সবকিছু ঠিক থাকলে যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ সচল করা যাবে।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, তবে বাঘাইছড়ি উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে গতকাল। এর মধ্যে বাঘাইছড়ি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাদ্রাসাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. মহসীনের ছেলে জুয়েল (৭) গত মঙ্গলবার বন্যার পানিতে নিখোঁজ হয়েছিল, যার মৃতদেহ গতকাল বিকেলে বাঘাইছড়ি উগলছড়ি কাদের মেম্বারপাড়া বিল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাঘাইছড়ি বঙ্গলতলী ইউনিয়নের করেঙ্গাতলী এলাকার অরুন বড়ুয়ার ছেলে রাহুল বড়ুয়ার (১০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সে বুধবার ডুবে গিয়েছিল। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আক্তার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় ২৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। জেলায় পাঁচ হাজার একশ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বৃষ্টি না হওয়ার কিছু এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।

এদিকে গতকাল সকালে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বড়াদম এলাকায় সেনাবাহিনীর ১০ আরই ব্যাটালিয়ন জীবতলী জোন ত্রাণ সহায়তা নিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ায়। দুর্গত মানুষের হাতে ত্রাণ সহায়তা তুলে দেন ১০ আরই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ সোহেল। এ সময় ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মো. তাওহীদ আমিন, ১০ আরই ব্যাটালিয়নের কোম্পানি উপ-অধিনায়ক মো. এনামুলক সাকিবসহ অন্য সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ত্রাণ সহায়তার মধ্যে রয়েছে চাল, চিনি, ডাল, তেল, লবণ, আলু, বিস্কুট, স্যালাইন ও অন্যান্য শুকনো খাবার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত