দামে হাঁসফাঁস সাধারণের সর্বনাশ

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৩, ০১:১৬ এএম

ভোগ্যপণ্যের দাম প্রতিদিনই চক্রবৃদ্ধি সুদ হারের মতো বাড়ছে। সংসার চালাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে মানুষ। গেল এক বছরে পেঁয়াজ, সবজি, মাছ ও মাংসসহ নিত্যপণ্যের সবকিছুর দামই চরমে পৌঁছেছে। বছর ব্যবধানে কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে শতভাগ। এ অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সংস্থাগুলো কঠোর না হলে জীবনধারণ দায় হয়ে দাঁড়াবে।

বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত এক বছরে সবজির মধ্যে সব থেকে বেশি বেড়েছে পেঁপের দাম। গরিবের ভরসার এই সবজিতে ৯০-১০০ শতাংশ দাম বেড়েছে। এ ছাড়া হুট করে দাম বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের আমিষের অভাব পূরণকারী ডিমে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তাতেও ৩৭ শতাংশের বেশি দাম বেড়েছে। ফলে ডিম খাওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছে মধ্যবিত্ত। আগে থেকেই মাছের দাম নাগালের বাইরে। এর মধ্যে ভরা মৌসুমে ভোক্তাদের জন্য ইলিশ কেনা যেন সোনার হরিণ। অন্যান্য মাছের মধ্যে সব থেকে বেশি প্রচলিত মাঝারি আকারের রুই মাছে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সবজি যেন আরও একধাপ এগিয়ে। কাঁচা মরিচের ২৫ শতাংশ ও দেশি পেঁয়াজে ১০০ শতাংশ দাম বেড়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের ব্যবসায়ীদের নৈতিক স্খলনের অবনতি হয়েছে। ফলে তারা মৌসুমি অজুহাত সৃষ্টি করে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে। যার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাস্তবতার আড়ালে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে দেশের মানুষ কষ্টে রয়েছে। বাজারকে আস্তাবলে পরিণত করেছে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির যে গতি তা কিন্তু থেমে নেই। সেই হিসেবে গেলে এক বছরে সব পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে বেশি বেড়েছে। এতে করে জনসাধারণের নাভিশ্বাস অবস্থা। ভোক্তাপর্যায়ে সস্তায় আমিষের অভাব পূরণের একমাত্র উপকরণ ছিল ডিম। এখন সেই ডিম কিনতেও তাদের ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু এই সরকার মানুষের কষ্টের বিষয় কখনো স্বীকার করে না।

জনগণ নয়, ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে সরকার বেশি আন্তরিক দাবি করে তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা থাকলে তারা তা করছে না। উল্টো সরকার ব্যবসায়ীদের দাবি আদায়ে বেশি তৎপর। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব শ্রেণির ব্যবসায়ীরা ফায়দা লুটছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা তাদের নৈতিকতা হারিয়েছে। তা না হলে, দেশের মানুষকে কষ্ট দিয়ে অতিমুনাফা করার চিন্তা করত না। এর জন্য সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাও দায়ী। কেননা তারা শুধু গুটিকয়েক অভিযানের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকছে। কিন্তু তাদের এ অভিযানের পরিধি যদি আরও বিস্তার লাভ করত তাহলে সাধারণ জনগণ বাজারে সুবিধা পেত। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির পাচ্ছে।

 

ডিম : মাছ-মাংস নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বল্প খরচে আমিষের চাহিদা পূরণ করা ডিমও। গতকাল বৃহস্পতিবার খুচরা বাজারে প্রতি হালি ডিম কিনতে ভোক্তার খরচ হয়েছে ৫২ টাকা। আর একটি ডিম কিনতে হয়েছে ১৩ টাকায়। কিন্তু এর আগে এক সপ্তাহ ধরে ডিম কিনতে হয়েছে প্রতি ডজন ১৬০-১৬৫ টাকায়। আর একটি ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫ টাকায়। ফলে মধ্যবিত্তরা ডিম খাওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছেন। গত বছরও প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা দরে। এক ডজন ১২০ ও একটি ডিম ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

হঠাৎ করে ডিমের দাম বাড়ার পেছনে করপোরেট ব্যবসায়ীদের দায়ী করেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, খামারির উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করে ডিমের মূল্য নির্ধারণ হওয়ার কথা থকলেও তা হচ্ছে না। কেননা পোলট্রি সেক্টরের ৭০ শতাংশ করপোরেট ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ায় প্রান্তিক খামারিরা তাদের খামারের উৎপাদিত ডিমের ন্যায্য মূল্য পান না। করপোরেট কোম্পানিরা ডিমের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। তা বাস্তবায়ন করে ফড়িয়া ও পাইকাররা। এর জন্য তারা গণমাধ্যমকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে বহুদিন ধরে।

 

মাছ : দেশের মানুষকে মাছে ভাতে বাঙালি বলা হলেও সেই প্রবাদ এখন গুড়েবালি। খুদে শিক্ষার্থীদের মুখের কথা, মাছের রাজা ইলিশ। কিন্তু ভরা মৌসুমে এখন সেই ইলিশও যেন সোনার হরিণ। বর্তমানে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা। মধ্যবিত্তের জন্য ইলিশ খাওয়া বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ছাড়া বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত রুই মাছের দামও নাগালের বাইরে। মাঝারি আকারের প্রতি কেজি রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৩০-৩৫০ টাকায়। যা গত বছর ২৮০-২৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি মাঝারি আকারের রুই মাছের দাম ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী সাত্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি বছর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাজারে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতি কেজিতে অন্তত ৬০ টাকা বেড়েছে।

 

পেঁয়াজ : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতি বছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা থাকে ২৫ লাখ টন। তবে চাহিদার থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৭-৮ লাখ টন বেশি পেঁয়াজের উৎপাদন হয়ে থাকে। অন্যদিকে মে মাসের শুরুর দিকে পেঁয়াজের দাম ৩৫-৪০ থেকে হঠাৎ করে ১০৫ টাকায় পৌঁছায়। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সরকার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় ব্যবসায়ীদের। সে দেশের উৎপাদিত পেঁয়াজ ও পেঁয়াজের আমদানি থাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫০ টাকার মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু মসলা জাতীয় পণ্য পেঁয়াজের বাজারে লঙ্কাকান্ড পরিস্থিতি। বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের ১০০ শতাংশ দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। যা গত বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া চাহিদার তুলনায় দেশীয় পেঁয়াজের জোগান নেই বললেই চলে। বাজারে এখন ভারতীয় পেঁয়াজের দাপট চলছে। আমদানিতে খরচ বেশি পড়ায় পেঁয়াজের বাজার কিছুটা বাড়তির দিকে রয়েছে বলে তারা জানান।

কাঁচা সবজি : সবজির বাজারের পরিস্থিতি যেন আরও খারাপ অবস্থা। গরিবের তরকারিখ্যাত পেঁপে এখন আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি হচ্ছে। অস্বাভাবিক দামে প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা। যা গত বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০ টাকায়। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বাজারের সব থেকে কমদামি পেঁপের কেজিতে ১০০ শতাংশ দাম বেড়েছে। এ ছাড়া বর্তমান বাজারে করলা, পটোল, বেগুন ও চিচিঙ্গা সব থেকে দামি সবজি। গেল তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি সবজিতে অন্তত ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে চিচিঙ্গা ও পটোল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়, বেগুন ৮০-৯০ ও করলা ১০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

মাংস : দেশের এক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা। বাজার পরিস্থিতিতে রোজকারের এ টাকায় সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। তার ওপর ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেওয়া ৭০০ টাকায় গরুর মাংস কেনা প্রায় অসাধ্য। তাই অনেক ভোক্তাই মাংসের চাহিদা মেটান ব্রয়লার মুরগি দিয়ে। তাতেও যেন সংশয় দেখা দিয়েছে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাজারে ব্রয়লার দামও ওঠানামা করছে। তবে গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি ২৫ শতাংশ দাম বেড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পোলট্রি মুরগি। যা গত বছর আগস্টেও বিক্রি হয়েছে ১৬০-১৭০ টাকা দরে। পাশাপাশি কক মুরগির দামও বেড়েছে বেশ। এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি কক মুরগিতে ৬০ টাকা বেড়েছে।

অনেকটা হতাশা প্রকাশ করে স্কুলশিক্ষক হরনাথ বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, খাদ্যপণ্যের মধ্যে সব পণ্যই বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। জীবনের ৫০টি বসন্ত পার করেছি। কখনো দেখিনি মুরগির ডিম ১৫ টাকা। শুধু কি ডিমের ক্ষেত্রে এমন, পুরো বাজার জুড়ে সাধারণ ক্রেতাদের হতাশা। খরচের চাপ সামলাতে মাছের পিস চিকন করে নিয়ে এসেছি। তবে মাছ দিয়েই নয়, সংসার চালাতে গিয়ে আরও অনেক পণ্যের ব্যবহার কমাতে বাধ্য হয়েছি।

এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা বলে তেমন কোনো লাভ হবে না। একটা বিষয় স্পষ্ট যে, মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জন্য আমাদের সঠিক পদ্ধতির ঘাটতি রয়েছে। মূল বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি কমলে পণ্যের দাম কমে আসবে এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, আমাদেরও তাই করতে হবে।

তিনি বলেন, বিশে^র অন্যান্য দেশেও মূল্যস্ফীতির কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। তারা তাদের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তার থেকে উত্তরণ হয়েছে। কিন্তু আমাদের পদ্ধতিগত সমস্যা থাকায় আমরা তার থেকে উত্তরণ হতে পারছি না। এর জন্য গত দুই বছর আগেই সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিল। তারা তা নেয়নি। ব্যাংকগুলো ইন্টারেস্ট বৃদ্ধি না করায় মজুদকারী ও মূল্যস্ফীতি দিন দিন বেড়েছে। এ বিষয়কে সরকার গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো টাকা ছাপিয়ে তা বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে। যার ভোগান্তি আমাদের চলমান।

অভিযান পরিচালনা করে মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভাবনা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, কোনো বাহিনী দিয়ে অভিযান পরিচালনা করে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এর জন্য আমাদের পদ্ধতিগতভাবে এগোতে হবে। নিয়মের বাইরে টাকা ছাপানো বন্ধ করে ব্যাংকগুলোকে ইন্টারেস্ট বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলেই ভোগ্যপণ্যসহ সব পণ্যের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত