এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দেশগুলোর মধ্যে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। এসব পণ্যের বিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যবহার করে ডলারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ব্যাংকগুলোকে আকুর সঙ্গে সম্পর্কিত ভারতের লেনদেন নিষ্পত্তি না করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের দুই মাস অন্তর ভিত্তিতে বিল পরিশোধে রীতিমতো বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ।
এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে সমস্যায় পড়তে হবে। বিকল্প হিসেবে রুপিতে লেনদেন করার মতো পর্যাপ্ত ভারতীয় মুদ্রার ঘাটতি রয়েছে। ইউরো বা অন্য কোনো মুদ্রায় লেনদেন করলে রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, আকুর সদস্যভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের গত ছয় মাসের গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়নের বেশি। তার মধ্যে শুধু ভারত থেকে ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ আমদানি করা হয়। আর ভুটান, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা মাত্র ৫-৮ শতাংশ।
পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভারতের আমদানি বিলেই মূলত আকুর বিল হিসাবে ডলারে পরিশোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ সাধারণত ভারত থেকে বেশি খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। কিন্তু সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোল (ওএফএসি) দেশটির ব্যাংকগুলোকে আকুর সঙ্গে জড়িত ভারতীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেন বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায়, দুই মাস অন্তর হিসাবে ডলারে আকুর বিল পরিশোধ করতে পারবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বিল পরিশোধ না করতে পারলে সে দেশের ব্যবসায়ীরা পণ্য বাংলাদেশে পাঠাবে না। এতে কার্যত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা বন্ধ হতে বাধ্য। তবে ইউরো বা বাস্কেটের অন্য মুদ্রা দিয়ে বিল পরিশোধে সুযোগ আপাতত রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের কাছে অন্য মুদ্রাগুলো খুব বেশি জমা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের রিজার্ভে জমা রয়েছে ২০০ কোটি ইউরো, ৪০ কোটি ইউয়ান। সব মিলিয়ে বর্তমানে রিজার্ভ আছে ২৭ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ অনুপাতে ধরলে তা দাঁড়াবে ২১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেহরানভিত্তিক আকুতে লেনদেনের ভারতের ব্যাংকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেই বিষয়ে আমরা এখনো পরিষ্কার ধারণা পাইনি। আকুর সেক্রেটারিয়েট (ব্যবস্থাপনা কমিটি) এ বিষয়ে তাদের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয়ে সদস্য দেশগুলোকে জানাবে। এরপর এ বিষয়ে কথা বলা যাবে। তবে যদি আকুর মাধ্যমে পেমেন্ট না করা যায়, তাহলেও তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সে ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক সুইফটের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা হবে।’
জানা গেছে, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা এসকাপের উদ্যোগে আকু গঠিত হয়। এর প্রধান কার্যালয় ইরানের রাজধানী তেহরানে। সংগঠনটির সদস্য ১০ দেশের মধ্যে আমদানি বিল সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মাধ্যমে দুই মাস পরপর পরিশোধ করা হয়।
এ বিষয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘আকুর ওপর হঠাৎ নিষেধাজ্ঞার কোনো ভূরাজনৈতিক ইস্যু থাকতে পারে। এটা ছোট করে দেখার বিষয় নয়। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপে বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ক্ষতি বাংলাদেশের বেশি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’
মূলত আকু সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি দুই মাস পরপর তাদের বাণিজ্যিক বকেয়া পরিশোধ করে। এ ক্ষেত্রে এসব দেশের বাণিজ্যের আয়-ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যদি কোনো দেশ ঋণী থাকে, তাহলে ওই সেই অর্থ পরিশোধ করে। বাংলাদেশের রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় স্বাভাবিক সময়ে প্রতি দুই মাস পর গড়ে দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়। তবে আমদানি কড়াকড়ির পর এটি কমে এক থেকে দেড় বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।
