ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে তামিলনাড়– ও কেরালায় ইরুলা উপজাতির বাস। সাপের সঙ্গে এই উপজাতিদের একটা আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। সাপ ধরাই তাদের নেশা এবং পেশাও বটে। সুপ্রাচীনকাল থেকে সাপ ধরে আর সাপের বিষ বেচেই এই উপজাতি গোষ্ঠীর দিন চলে।
ভারত থেকে ইউরোপ, আফ্রিকার অনেক জায়গায় যে সাপের বিষ রপ্তানি হয়, তার বেশির ভাগই জোগান দেয় এই জনজাতির মানুষ। ভারতে অন্তত ছটি সংস্থা সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি করে। বছরে প্রায় ১৫ লাখ ভায়াল অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় ভারতে। এই ওষুধ তৈরির জন্য যে সাপের বিষ দরকার হয়, তারও জোগান দেওয়ার দায়িত্বে থাকে এ ইরুলারাই।

তামিলনাড়ুর উত্তর-পূর্ব উপকূল বরাবর প্রায় দুই লাখ ইরুলার বাস। ইরুলাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। ‘ইরুলার’ শব্দ থেকে এই ইরুলা শব্দের উৎপত্তি। তামিল ও মালয়ালম ভাষায় ‘ইরুলার’ মানে ‘কালো মানুষ’। গায়ের রংই তাদের পরিচয়। একবারে ৮০০ সাপ তারা ঝোলাবন্দি করে। ২১ দিন ধরে সাপগুলোকে ধরে রাখা হয়। তার মধ্যে চারবার বিষ বার করা হয়। পরে অবশ্য তাদের নিরাপদেই ছেড়ে দেয় তারা। ইরুলারা মনে করে, পারতপক্ষে কাউকে আক্রমণ করে না সাপ। ওরাও বেঁচে থাকতে চায়। মানুষের আতঙ্ক ওরা টের পায়। তাই বিপদের আশঙ্কায় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
সাপেদের ভালোবাসে ইরুলা জনজাতি। তবে শুরুর দিকে সাপ মেরে চামড়া বেচাই ছিল তাদের কাজ। ইউরোপ ও আমেরিকার নানা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এই চামড়ার খুব চাহিদা ছিল। ১৯৭২ সালে ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে শিকার, প্রাণী হত্যা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় ইরুলাদের ব্যবসা লাটে উঠলেও বিকল্প হিসেবে একসময় তারা সাপের বিষ বার করার কাজ শুরু করে।
ভার্জিন দেবী কান্নাইমার পুজো করে ইরুলারা। গোখরো সাপের সঙ্গে নাকি সম্বন্ধ রয়েছে দেবী কান্নাইমার। সাপ ধরতে যাওয়ার আগে নিয়ম করে কান্নাইমার পুজো দিয়ে যায় এই উপজাতিরা। মাসে একবার বড় করে হয় দেবীর পুজো। মূল পূজারি মন্দিরে ঢুকে সাপের মতো শিষ দিতে শুরু করে, এই শিষেই নাকি খুশি হন দেবী।
এই উপজাতির সংখ্যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কেরলের কোয়েম্বত্তরে। তারা মনে করে, তাদের পূর্বপুরুষ কোয়ান পাত্তুর নামে এক ঋষি। এই কোয়ান পাত্তুরের নামেই কোয়েম্বত্তর নামের উৎপত্তি। এই ঋষিও সাপের পূজারি ছিলেন। তার ছিল একাধিক স্ত্রী এবং অনেক সন্তান। তাদের থেকেই ইরুলাদের জন্ম।
বিয়ের জন্য দিতে হয় মোটা টাকা পণ। না হলে পালিয়ে বিয়ে করাটাই রেওয়াজ। বেশির ভাগ ইরুলা সেটাই করে। প্রথম প্রসবের পর ইরুলা মহিলা তিন মাসের জন্য অচ্ছুত হয়ে যায়। তাকে সন্তানসহ পরিবারের বাকিদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়।
ঋতুস্রাব নিয়েও নানা সংস্কার রয়েছে ইরুলাদের। কোনো কিশোরী প্রথমবার রজঃস্বলা হলে তাকে সাত দিনের জন্য বাড়ির বাইরে একটি ছাউনি বানিয়ে রাখা হয়। সেখানে কিশোরীর যেকোনো একজন বন্ধু ও তার মায়েরই প্রবেশের অনুমতি থাকে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মেয়েটির মুখ দেখা মানেই সেটা পাপ। সাত দিন পর নদীতে স্নান করিয়ে, মেয়েটির সমস্ত জামাকাপড় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রথাকে ইরুলা সমাজে বলা হয়, ‘কায়দাকাতাছিরি’।
বিদেশে ইরুলাদের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কে বার্মিজ পাইথন ধরতে তামিলনাড়– থেকে দুই ইরুলা যুবককে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে ইরুলাদের সাপ ধরার কৌশল নিয়ে রীতিমতো চর্চা হয়।