ডিসির অজান্তে জমির দাম নির্ধারণ

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৩, ০২:৩২ এএম

সরকারি যেকোনো প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। জমির দামও নির্ধারণ করবে জেলা প্রশাসক। কিন্তু ডিসিকে না জানিয়ে আঞ্চলিক কার্যালয় নির্মাণের জন্য জমির দাম নির্ধারণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। জমির দাম নির্ধারণ করে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনেও পাঠিয়েছে এ সংস্থাটি। তবে এমন বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক কার্যালয় নির্মাণের মাধ্যমে নাগরিক সেবা সহজ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭টি ভবন নির্মাণেই খরচ হবে ১০০ কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকায় ৯০ শতাংশ সরকারের এবং ১০ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

রাজধানীর খিলগাঁও, আজিমপুর, নয়াবাজার, সায়েদাবাদ, নন্দীপাড়া, দক্ষিণগাঁও ও মাতুয়াইলে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

তবে পরিকল্পনা কমিশন আপত্তি জানিয়ে বলেছে, পরিকল্পনা কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় প্রাক্কলন করার বিষয় উল্লেখ থাকলেও প্রকল্প প্রস্তাবে ১ দশমিক ৩২ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ৩৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রাক্কলন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় বিভাজন জেলা প্রশাসন থেকে সংগ্রহ করাসহ ভূমির প্রাপ্যতা এবং ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।

তবে ঢাকা জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক আবু জাফর রিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি এ ধরনের কোনো চিঠি জেলা প্রশাসনে পাঠিয়েছে কি না, আমার জানা নেই।’

প্রকল্পটির পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী বোরহানউদ্দিন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিসি অফিসের রেট অনুযায়ীই জমির দাম ধরা হয়েছে।’ ডিসি অফিসকে জানানো হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে আমি কথা বরতে ইচ্ছুক নই।’

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকা বেশি ব্যয়ের প্রকল্প হলেই ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হবে। তবে এই প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়নি। বিভিন্ন প্রকল্পে দেখা যায়, এই ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিক না হওয়ার কারণে পরে প্রকল্পের ডিজাইন পরিবর্তন ও সংশোধন করতে হয়।

রোড নির্মাণ (অভ্যন্তরীণ আরসিসি) ও বিউটিফিকেশন খাতে ২ কিলোমিটারের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যাতে ১ কিলোমিটারে খরচ পড়বে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

শুধু তা-ই নয়, পরামর্শক খাতে ৩ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হলেও পরামর্শকের ধরন, সংখ্যা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদিসহ বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের পরামর্শকের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।

আসবাব ক্রয় বাবদ ৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বিস্তারিত ব্যয় বিভাজন ডিপিপিতে সংযোজন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তার এবং কর্মচারীর জন্য সব আসবাব কেনার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৯৮টি কম্পিউটার কেনার প্রয়োজনীয়তা কী, সে ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি তারা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭টি আঞ্চলিক কার্যালয় (মূল ভবন) নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর বিস্তারিত ব্যয়ও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রকল্পে ভূমি উন্নয়নের জন্য ৩৪ হাজার ৮৩৭ ঘনমিটার মাটির কাজের জন্য ৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। ভূমির বর্তমান অবস্থা প্রস্তাবিত কাজের প্রকৃতি জানতে চেয়েছে কমিশন।

এইচটি বা এলটি লাইন, জেনারেটর এবং সাব স্টেশন খাতে ১৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হলেও এর ভিত্তি কী, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

ডিপিডিসি লাইন এক্সটেনশন ডিপোজিট ওয়ার্ক খাতে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে দেওয়া চিঠিতে এ খাতের বিস্তারিত ব্রেকআপসহ ব্যয় প্রাক্কলন ডিপিপিতে সংযুক্তির বিষয় উল্লেখ থাকলেও তা সংযোজন করেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি। ডিপিডিসি থেকে প্রাক্কলিত ব্যয় সংগ্রহ করে ডিপিপিতে সংযোজন করতে বলা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক কার্যালয় নির্মাণের মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান সহজীকরণসহ জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন করা। অঞ্চলভিত্তিক নাগরিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে আঞ্চলিক কার্যালয় নির্মাণ, নাগরিক সেবা প্রদান সহজীকরণ, এলাকার মানুষের জীবন যাত্রার মান ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা।

প্রকল্পটির সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী সালেহ আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পটির পরিকল্পনা করা হয়েছে আরও দুই বছর আগে। আমি এখানে নতুন। এ দুই বছরে প্রকল্পটির পরিকল্পনায় আরও অনেক পরিবর্তন এনেছি আমরা। তবে জমি অধিগ্রহণে যে টাকাই আসবে, পুরো টাকাই ডিসি অফিসে যাবে। জমি অধিগ্রহণ পুরোটাই সরকারি। অধিগ্রহণের টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয় ডিসি অফিসের মাধ্যমে।’

২ কিলোমিটারে ৭ কোটির খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুই কিলোমিটারের কোথায় কোথায় কী খরচ তা উল্লেখ করা প্রয়োজন। দেখা যায়, ৩০০ মিটারের রাস্তায়ও ১ কোটি খরচ হয়ে যায় বিভিন্ন ইউটিলিটি প্রতিস্থাপনে। যদি সেখানে ড্রেনেজ পাইপসহ বিভিন্ন কাজে নদী শাসনের মতো বাঁধ দিয়ে করতে গেলে ১২ কোটিও লাগতে পারে। তবে খরচ স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রকল্প পরিচালক এর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।’ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখানে সম্ভাব্যতা যাচাই ফরমালি করা হয়নি। তবে শুনেছি, সিটির অন্য প্রকল্পের প্রকৌশলী দিয়ে এর সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে।’

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নতুনভাবে ১৮টি ওয়ার্ড, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বিদ্যমান ৫টি অঞ্চলের পরিবর্তে ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নবসংযুক্ত এলাকায় ৫টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং পুরনো এলাকায় ৪টিসহ মোট ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত