নারায়ণগঞ্জ শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পুলিশে বাধাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে বঙ্গবন্ধু সড়ক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় পুলিশের গুলি-টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের পাল্টা ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে প্রায় ৪ ঘণ্টা অচল থাকে নারায়ণগঞ্জ।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, পুলিশের গুলিতে নারায়ণগঞ্জ ছাত্রদল ও যুবদলের দুই নেতা নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক। নিহত দুজন হলেন- নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক খান সুজন ও ফতুল্লার এনায়েতনগরের তিন নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল নেতা শাওন।

এছাড়াও, সংঘর্ষের সময় পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় একটি স্কুলের ১৪ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে তিন জন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া আহত হয়েছে সাংবাদিক, পথচারীসহ সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে পুলিশ অন্তত ৫০০ রাউন্ড গুলি, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ছোড়ে। দুপুর ২টা পর্যন্ত পুরো নারায়ণগঞ্জ স্থবির হয়ে পড়ে। আতংকে সাধারণ মানুষকে দিকবিদিক ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে।
অপরদিকে পুলিশ দাবি করেছে, বিএনপি নেতা কর্মীদের ছোড়া ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপে পুলিশের ১৪ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসা জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের কাছে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী নিহতের তথ্য নেই বলেও তারা জানায়।
সংঘর্ষের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খাঁন জানান, তিনি নিজে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র্যালির প্রস্তুতি নেয়ার সময় পুলিশ বাধা দেয়। এক পর্যায়ে কোন উসকানি ছাড়াই পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। এতে ছিটা গুলিতে জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি, সোনারগাঁও থানা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান, সস্তাপুর এলাকার হাজী মহব্বতের পুত্র যুবদল নেতা শাহিন (৪০), শহরের টানবাজার এলাকার মহিবুলের পুত্র জাহাঙ্গীর (৩০), টানবাজারের ফারুকের পুত্র রাজু (২৬), সোনারগাঁওয়ের খেদমত আলীর পুত্র শরীফ (২৫), ফতুল্লার কবিরের পুত্র ইউনুস (৪৩), সিদ্ধিরগঞ্জের মতিউর রহমানের পুত্র সাগর (২২), জিমখানার আব্দুল জব্বারের পুত্র আব্দুস সালাম (৬০), মিজমিজির মো. হাফিজ মিয়ার পুত্র মো. আখতার (৫২), দেওভোগ মিলন শেখের পুত্র স্বর্ণ শিল্পী মুন্না (১৮), দেওভোগ দাতা সড়কের শহীদ মিয়ার পুত্র মো. কাদির (২৭), ২নং রেলগেট আলমাছ পয়েন্টের মো. ইসহাকের পুত্র মো: শরীফুল ইসলাম (১৯), শহীদনগরের মো. জামালের স্ত্রী শাহনাজ (৫০), হোসাইনীনগরের হানিফ গাজীর পুত্র মো. সবুজ (৩৪), দেওভোগ পানির টাংকির নূর মোহাম্মদের পুত্র মোমেন (৫৫), ২ নম্বর রেলগেটের মোজাম্মেল হকের পুত্র শিহাব (২৫), পাইকপাড়ার মৃত সুরুজ মিয়ার পুত্র শামসুল হক (৫০), বেপারীপাড়ার শাহজাহানের স্ত্রী শিল্পী (৪০), জামাইপাড়া এলাকার মো. মিলনের পুত্র মো. ইব্রাহিম (২৫), ২ নম্বর রেলগেট এলাকার কামাল হোসেনের পুত্র সিদ্ধিরগঞ্জের মুক্তি গার্মেন্টের শ্রমিক তাজুল ইসলাম (৩০), মাসদাইরের আবুল কালামের পুত্র আশরাফুল (৩২), শহরের করিম মার্কেটের ইউএস হোসিয়ারীর শ্রমিক সোয়াদ হোসেন (৩০), উজ্জল ভৌমিক (২৮), মিন্টু (২৮), সজিব (১৮), বন্দর রূপালী এলাকার মো. হাসেমের পুত্র মো. নাসির (৪০) গুলিবিদ্ধ হয়। ওই সময় নেতাকর্মীদের লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস দিয়ে ছাত্রভঙ্গ করে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপি নেতাকর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ আরও গুলি ছোড়ে। এতে উভয়পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিক, বিএনপি ছাত্রদল-যুবদলের বহু নেতা কর্মী আহত হন। এসময় নগরীর ডিআইটি, মন্ডলপাড়া, দেওভোগ, নিতাইগঞ্জ, ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুরো নগরী আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ওইসব এলাকার রাস্থাঘাট সাধারণ মানুষ শূন্য হয়ে যায়। এ সংঘর্ষে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলতে থাকে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল আমীন শিকদার জানান, আমরা এর আগে অনুষ্ঠান করেছি। পুলিশ হয়ত আমাদের বাধা দিয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে চলে গেছি। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশ বিনা উসকানিতে প্রথমেই লাঠিচার্জ করে। কোন কারণ ছাড়াই গুলি ছুড়েছে। আমাদের দুই নেতা কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।
তিনি নিশ্চিত করে জানান, নিহতের মধ্যে ফারুক খান সুজন সরকারি তোলারাম কলেজের ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও শাওন ফতুল্লার এনায়েতনগরের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল নেতা।
এদিকে টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় আহত হয়েছেন নগরীর মর্গান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়শা সুলতানা, লামিয়া, আফসানা মীম, মিমিয়া, রোকেয়া, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হানী, আঁখি, উম্মে কুলসুমসহ ১৪ জন শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে তিন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্কুলের পাশেই সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় আমরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ঢুকিয়ে ফেলি। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের বাইরে ছিল এমন ১০-১৪ শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ায় ৪-৫ জনকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টিয়ার শেল ও গুলির শব্দে পুরো স্কুলে মেয়ে শিক্ষার্থীরা আতংকে চিৎকার করতে শুরু করে।
তিনি আরও জানান, এখানে একটি স্কুল আছে এগুলো ভাবা দরকার ছিল সংশ্লিষ্টদের।
মর্গ্যান গার্লর স্কুলের আহত শিক্ষার্থী আয়শা সুলতানার মা কলি বেগম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জানান, স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটি টিয়ার শেল পায়ের সামনে এসে পড়ে। মেয়েকে নিয়ে এখন শহরের ভিক্টরিয়া হাসপাতলে আছি। ধোয়ায় আমার মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ওর জ্ঞান ফেরেনি।
অন্যদিকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন নারায়ণগঞ্জ মোহনা টিভির সাংবাদিক আজমেরী ও বিজয় টিভির গৌতম রায় । তারা জানান, আহত থেকে বাদ যায়নি পথচারী ও সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটায় শহরের ২ নং রেলগেট পুলিশ বক্সের সামনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, কেউ নিহত হওয়ার সংবাদ পুলিশের কাছে নেই। পুলিশের প্রায় ১৪ জন আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নারায়ণগঞ্জ বিএনপি নেতাকর্মীরা অনুমতি ছাড়া মিছিল বের করে। যাতে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। তাদের বারবার অনুরোধ করলেও রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। উল্টো পুলিশর ওপর হামলা করেছে। পুলিশ জনগণের জানমাল নিরাপত্তায় আইনি ব্যবস্থা নিয়ে তাদের প্রতিহত করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আগে কোন ধরণের বাধা দেয়া হয়নি।