৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ‘লাল ঢেউ’-এর স্বপ্ন দেখেছিলেন রিপাবলিকানরা। মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার আশাও ছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত সেই ঢেউ ওঠেনি। সামান্য ব্যবধানে প্রতিনিধি পরিষদে জয় পায় তারা। রিপাবলিকানদের এমন ফলাফলে ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। লিখেছেন নাসরিন শওকত
১৭৮৮ সালে সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। প্রতি চার বছর পর নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর দুই বছরের মাথায় মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসের (প্রতিনিধি পরিষদ) সব কটি আসনে (৪৩৫) ও সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩৫টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি গভর্নর, সারা দেশের স্থানীয় কাউন্সিল ও স্কুল বোর্ডগুলোর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব কটি আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে রিপাবলিকান পার্টির। যার দলীয় রং লাল। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল, ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের ‘লাল ঢেউ’ সবখানে দেখা যাবে। সাধারণত এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভালো ফল করার রেকর্ড কম। তবে ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও প্রেসিডেন্ট বাইডেনের জনসমর্থন কম থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনের ঘরে-বাইরে বিপর্যস্ত ছিল ডেমোক্র্যাটরা। ফলে রিপাবলিকান দল এবার কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে ‘লাল ঢেউয়ের’ স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা ঘটতে দেখা যায়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠানের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই জনমত জরিপ বিশ্লেষক ও পণ্ডিতরা রিপাবলিকানদের আসন্ন একটি ‘লাল ঢেউয়ের’ বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। তাদের অভিমত, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী এই ঝড় জো বাইডেন ও তার দলের ডেমোক্র্যাটদের একেবারে বিপর্যস্ত করে দেবে। এই ভবিষ্যৎ বক্তাদের মধ্যে রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ছিলেন। যিনি নির্বাচনে একটি সুস্পষ্ট ‘লাল ঢেউ’ ওঠার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণায় দলটি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বলেও দাবি করেছিল। তবে অন্যসব দিনের মতোই ৯ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আকাশজুড়ে সূর্য ওঠে। কিন্তু সেই সূর্যের আলোয় রিপাবলিকানদের প্রত্যাশিত ‘লাল সুনামি’র আর দেখা মেলেনি।
তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ফল পায়নি। কিন্তু রিপাবলিকানরা মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সামান্য ব্যবধানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি আসনে ভোট গণনা বাকি রয়েছে এখনো । এদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছে। নতুন করে তাদের দখলে এসেছে সিনেট। সবশেষ ফলাফল অনুযায়ী, ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ৪২৯টি আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১৮টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে রিপাবলিকান পার্টি। এদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টি রিপাবলিকান পার্টি থেকে ৭ আসনে পিছিয়ে থেকে ২১১টি আসন পেয়েছে। রিপাবলিকানরা আগামী জানুয়ারিতে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেবে। নিম্নকক্ষের রিপাবলিকান পার্টির নেতা ও ভবিষ্যৎ স্পিকার হবেন কেভিন ম্যাকার্থি। এদিকে উচ্চকক্ষ সিনেটে ১০০ আসনের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫০টি দখল করেছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা পেয়েছে ৪৯টি আসন। এর মধ্য দিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ল মার্কিন কংগ্রেস। কারণ, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা জয়ী হলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেল ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের হাতেই। এর ফলে পরবর্তী দুই বছরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের বিভিন্ন বিল আটকে দেওয়ার সুযোগ পাবে রিপাবলিকানরা।
অর্থনীতিই সব নয়
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত জনমত জরিপগুলোতে মার্কিন ভোটাররা অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, বিচারব্যবস্থামূলত এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে থাকেন। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতি, গর্ভপাত, অভিবাসন ও গণতন্ত্রের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে শিক্ষা, জলবায়ু, জননিরাপত্তা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বিষয়গুলোও।
বিশ্বের অন্যসব দেশের মতো ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও করোনা মহামারীর অর্থনৈতিক পতনের সঙ্গে লড়াই করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই ভোটারদের উদ্বেগের তালিকার শীর্ষে ছিল মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতি। তা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটরা যে ধরনের আশঙ্কা করেছিল জনরায়ে দেখা যায়নি তেমন ক্ষতিকর প্রতিফলন। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই জনরায়ের মধ্য দিয়ে এটি প্রতিফলিত হতে পারে যে, অর্থনীতি ধীরগতিতে চললেও তুলনামূলকভাবে তা ভালো অবস্থানে রয়েছে। যদিও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত রয়েছে এবং সেই সঙ্গে বেকারত্বের হারও নিম্নমুখীই আছে। জনমত জরিপ সংস্থা ইপসসের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ক্রিস জ্যাকসন। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রবণতা সম্পর্কে এই জরিপ বিশ্লেষক বলেন, ‘মানুষ অর্থনীতিকে ভালোবাসে না। কিন্তু তারা জানে তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে না। তাই তাদের কাছে নির্বাচনের শেষ সপ্তাহগুলোতে আধিপত্যের পরিবর্তে গর্ভপাত, অভিবাসন ও ‘বড় মিথ্যার’ মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।’
বছরজুড়ে অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যকার উদ্বেগ দেশের মধ্যে বিভক্তি বা মেরুকরণকেও প্রতিফলিত করেছে। যদিও এ বছরে ডেমোক্র্যাটদের দৃষ্টি আরও গভীরে ছিল। রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চেয়ে তাদেরকে বেশি ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবাদ ও গর্ভপাতের মতো সমস্যাগুলোকে তুলে ধরেন তারা। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপচ্ছায়া সারা বছর এমনসব বিষয়কে সচল রেখেছিল, যা ডেমোক্র্যাটদের মূল ঘাঁটিকে ভোট দিতে অনুপ্রাণিত করে গেছে। এ প্রসঙ্গে জরিপ বিশ্লেষক ক্রিস বলেন, ‘আমরা বলতে পারি এই নির্বাচনী চক্রের রিপাবলিকানরা বিশেষ করে ট্রাম্প অনুসারী রিপাবলিকানরা তাদের নিজস্ব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বা অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আলোচনায় প্রাধান্য দিতে পারেননি, যা সম্ভবত রিপাবলিকানদের বড় অর্জনের দিকে পরিচালিত করতে পারত। রিপাবলিকানরা মূলত ডেমোক্র্যাটদের হাতে জয়ের জন্য এই বিষয়গুলোকে তুলে দিয়েছিল, যা তাদের পরাজয়কে নিশ্চিত করেছে। একমাত্র অর্থনীতিকে হাতিয়ার করলেই হয়তো নিজেদের পরাজয় রুখতে পারত তারা।’
গণতন্ত্রের শক্তিশালী ভিত
জরিপ সংস্থা এডিসন রিসার্চ ৮ নভেম্বর ভোট পরবর্তী একটি জরিপ পরিচালনা করে। নিরপেক্ষ ভোটাররা রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের ৪৯ থেকে ৪৭ শতাংশ ব্যবধানে ভোট দিয়েছেন। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নারী ভোটাররা ভূমিকা রেখেছেন। সার্বিকভাবে ৩১ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তাদের প্রধান উদ্বেগ মূল্যস্ফীতি। ২৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, গর্ভপাত তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু। আর প্রতি ১০ জনের একজন অপরাধ এবং অভিবাসনকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু জরিপে নারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতির চেয়ে গর্ভপাতের বিষয়টি ৫ পয়েন্ট বেশি এগিয়ে ছিল। চলতি বছর পুরুষদের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা কিছুটা বেশি ছিল। অঙ্গরাজ্যের ভোটেও গর্ভপাত ইস্যুটি প্রাধান্য পেয়েছে। মিশিগানের ভোটাররা গর্ভপাত অধিকারের সাংবিধানিক সুরক্ষার পক্ষে রায় দেন।
প্রাথমিক ভোটার তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলেই এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটদানের হার ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। এর মধ্যে প্রজনন অধিকারের মতো বিশেষ বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের ঘটিগুলোতে তরুণ ভোটারদের তাদের রায় প্রদানে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। এবারে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তরুণ এই ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত এই অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে টেক্সাস-সান অ্যান্টোনিও বিশ^বিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন টেইলর সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘এবার ভোট দিয়ে জেনারেশন জেড ভোটাররা প্রকৃতপক্ষেই নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে। জুনে সুপ্রিম কোর্ট রো বনাম ওয়েডকে বাতিল না করলে ডেমোক্র্যাটরা গতিশীল কিছু বিষয়ে তাদের ভোটারদের অনুপ্রাণিত করতে পারত না। গতিশীল ওই বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অপরাধ, অভিবাসন ও মুদ্রাস্ফীতি, যা মূলত রিপাবলিকানদের ‘লাল ঢেউ’ রুখে দিতে ডোমোক্র্যাটদের সহায়তা করেছিল।’
৮ নভেম্বর নিজেদের রায় জানাতে যে তরুণ-তরুণীরা বাধ্য হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে জ্যাক প্রিবেলও রয়েছেন। গর্ভপাতের মতো সাংবিধানিক অধিকারকে বাতিল করায় তিনি ভীত হয়ে পড়েন। তিনি ভেবেছিলেন এই অধিকার হরণ অন্য নাগরিক অধিকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী প্রিবেল বলেন, ‘আমি একজন সমকামী। গর্ভপাতের এই রায় এটাই স্পষ্ট করেছে যে আমেরিকান নীতি কতটা দমনমূলক হতে যাচ্ছে।’ অন্যদিকে কিছু রিপাবলিকান ভোটার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাদের দলের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ভোট না পারায় তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ভিনসেন্ট গঞ্জালেজের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি রিপাবলিকান প্রার্থী মায়রা ফ্লোরেস। ভিনসেন্ট জুনে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হন। এদিকে রিপাবলিকানদের ভোট কম পড়া প্রসঙ্গে এক টুইটে মায়রা বলেন, ‘রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবার ঘরে বসে ছিলেন। আপনি আপনার পক্ষের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা না করলে ফল নিয়েও অভিযোগ করতে পারেন না।’
গর্ভপাত অধিকারের সুরক্ষা চেয়ে জর্জিয়ায় আলফারেটায় ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন মিশেল ও ম্যাথিউ নিলসেন দম্পতি। এবারের নির্বাচনে তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুগত প্রার্থীদের থামানোর ওপরই বেশি জোর দিয়েছিলেন। ৩৩ বছর বয়সী ম্যাথিউ নিলসেন বলেন, ‘কেউ চাইলে রিপাবলিকানদের ভোট দিতে আপত্তি নেই আমার। তবে সম্ভব হলে তারা যেন গর্ভপাত ও ট্রাম্পের কথা বলে ভোট না চান।’ এই নিলসেন দম্পতির মতোই উদ্বেগে থাকা লাখো ভোটার ৮ নভেম্বরে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন। আর এ সমর্থকদের সংখ্যাও বিস্মিত হওয়ার মতো। নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ‘লাল ঢেউয়’র ঠেকিয়ে দিয়েছেন মত পাল্টানো এ ভোটাররাই। আর তাই ভোট দেওয়া শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই তথাকথিত লাল ঢেউ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে বাতাসে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রবণতা
ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল করে না। এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের বরাবর পরাজয়ের ইতিহাস রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল গড়ে প্রতিনিধি পরিষদে ২৮টি করে আসন ও সিনেটে ৪টি করে আসন হারিয়েছে। ১৯৩৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো থেকে এই ফলাফল এসেছে। ওহাইওর কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাস্টিন বুচলার। এর আগের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর ফলাফল হয়তো ‘ত্রুটি’ ও ‘তুলনামূলক’ একটি প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল, রিপাবলিকানরা বড় ধরনের জয় পেতে যাচ্ছে, যা আগে তারা পেয়েছিল। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে নিজের অভিমত জানিয়ে অ্যাপক বুচলার বলেন, ‘আমি মনে করি এ ক্ষেত্রে অনেকেই তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সাধারণত লোকরা এমন সব বিবৃতি দিয়ে থাকেন, যেগুলো তথ্য দ্বারা সমর্থিত নয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেই কিছুটা স্তুতি করার জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়। আমি মনে করি অতীতের নির্বাচনগুলোতে আমাদের জন্য একটি শিক্ষা ছিল। এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে আর একটু বেশি সতর্ক হওয়া। আমরা সবাই যে শিক্ষাটা গ্রহণ করিনি।’
তবে নির্বাচন প্রচারের সঙ্গে জড়িতরা এই নির্বাচনে তথাকথিত লাল ঢেউ না ওঠার নেপথ্যে থাকা নানা কারণের কথা বলছেন। তাদের ধারণা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের এই নির্বাচনে কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী অতি ডানপন্থি হওয়ায় ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ কারণেই হেরেছেন তারা। এদিকে রিপাবলিকান দলের পক্ষ থেকে অনেকেই এবারের হতাশাজনক ফলাফলের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।
ট্রাম্পের ওপর গণভোট
এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্তরসূরি নির্বাচন ও রিপাবলিকান পার্টির ওপর তার অব্যাহত প্রভাবে লিটমাস পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হয়েছিল। টেক্সাস বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন টেইলর পরামর্শ দিয়েছিলেন, দলের ভেতরে ট্রাম্পের প্রভাব কমানোর জন্য অনেক অতিথি ভোটার এবার তাদের ভোট দিয়েছিলেন। ‘এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে একটি যুক্তি তৈরি করা উচিত যে, এই নির্বাচন যতটা না ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর গণভোট ছিল, তার চেয়ে বরং অন্যকিছু ছিল বেশি এবং যদি আপনি তার সমর্থিত প্রার্থীদের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন বিশেষ করে নির্বাচন বয়কট করা এই প্রার্থীদের অনেকেই গভর্নর, সিনেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই পরাজিতও হয়েছেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি বেশ কটি জয়ও পেয়ে থাকেন, তার মানে এই নয় যে তিনি রিপাবলিকানদের ভীত বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন।’ টেইলরের এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন ভোটার অ্যালেক্স হেইডও। ৩১ বছর বয়সী জর্জিয়ার ভোটার অ্যালেক্স আগে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থী হার্শেল ওয়াকারকে সমর্থন করার পর তিনি ‘সত্যিকার অর্থেই তার মত বদলান’। ভোট দেওয়ার আগে সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে অ্যালেক্স হেইড বলেছিলেন, ‘আমি ডেমোক্র্যাট দলের সবকিছুর সঙ্গে একমত নই। কিন্তু আমি মনে করি এটি রিপাবলিকান প্ল্যাটফর্মের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি স্থিতিশীল।’
গর্ভপাত ইস্যু ও বিতর্কিত আচরণের কারণে অনেক তরুণ ভোটরারা ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এরই মধ্যে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান শক্তিশালী করা জরুরি। মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ১৬ নভেম্বর ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে নড়বড়ে অবস্থানে থাকা ৭৬ বছর বয়সী সাবেক এ প্রেসিডেন্ট দুইবার অভিশংসিত হন। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প একাধিক প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন, যারা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। আর তাই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ৮ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল হয়েছে মিশ্র।