২০ শতকের প্রথম ‘গণহত্যা’

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ০২:৩৩ এএম

ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে নামিবিয়া ছিল জার্মান ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। তখন দখলদার জার্মান সেনাবাহিনী দুবার অভিযান চালিয়ে হত্যা করে প্রায় এক লাখ নিরীহ আদিবাসীকে। যারা ছিল মূলত নামিবিয়ার হেরেরো, সান ও নামা সম্প্রদায়ের। স্বাধীনতাকামী এ দুই সম্প্রদায়কে বিলীন করে দেওয়া এই হত্যাকাণ্ড ২০ শতকের ‘বিস্মৃত গণহত্যার’ স্বীকৃতি পায়। লিখেছেন নাসরিন শওকত

ইতিহাস কথা বলে

জেফতা এনগুহেরিমো মানবাধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। নামিবিয়ার গণহত্যার শিকার হেরেরো সম্প্রদায়ের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য লড়ছেন। থাকেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নামিবিয়ার ওমবুয়োভাকুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা। জেফতা তার সম্প্রদায়ের ন্যায়বিচার পাওয়া উচিত এটা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। একই সঙ্গে সেই জার্মানদের সঙ্গেও পুনর্মিলনে বিশ^াস হবে এটাও মানেন, যারা একসময় হাজারো হেরেরো, নামা ও সান আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যা করেছিল। জেফতা তার পূর্বপুরুষদের ওপর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের গল্প না জেনেই বেড়ে উঠেছেন।

১৮৯৪ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত নামিবিয়ায় জার্মান ঔপনিবেশিক শাসন ছিল। তখন দেশটির নাম ছিল জার্মান দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা। আটলান্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত দেশ নামিবিয়া। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী বান্টু আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হলো হেরেরোরা। আর নামা ও সান হলো স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠী। এই সম্প্রদায়গুলো তখন মধ্য নামিবিয়ার উত্তরাঞ্চলের ওটজিওয়ারঙ্গোর পূর্ব প্রান্তের ওয়াটারবার্গে বাস করত। ১৯০৪ সালের ১১ আগস্ট এই ওয়াটারবার্গের সংঘটিত এক যুদ্ধ। যেখানে স্বাধীনতাকামী হেরেরো বিদ্রোহীদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল ঔপনিবেশিক জার্মাান সেনারা। ঐতিহাসিক এই যুদ্ধক্ষেত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগী হয়ে পড়েন জেফতা এনগুহেরিমো। দখলদার জার্মানরা তখন নিরীহ এই আদিবাসীদের ওপর শাসনভার চাপিয়ে দিয়েছিল। দখল করেছিল তাদের বেশির ভাগ জমি। জার্মানদের এই অপশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে হেরেরোরা। কিন্তু বিশ্বের অন্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের মতোই সে সময়ের দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা নামে এ দেশটিতে নিজেদের দখলদারি বজায় রাখতে চায় জার্মানি। তাই তাদের বিরুদ্ধে ১৯০৪ ও ১৯০৮ সালে দুই দফায় নারকীয় অভিযান চালায় জার্মান সেনাবাহিনী। নৃশংসভাবে হত্যা করে প্রায় লাখখানেক হেরেরো, সান ও নামা সম্প্রদায়ের মানুষদের। এই গণহত্যা চালানোর সময় এসব সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুর পানি ও খাবার বন্ধ করে, সেনা শিবিরগুলোতে বন্দি রেখে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং নির্বাসনে পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। সে সময় দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার ইউরোপের প্রভাবশালী এক দেশের নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছিল প্রায়। ইউরোপের বিখ্যাত ইতিহাসবিদরা সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়ায় চেষ্টা করেছেন। এমনকি আফ্রিকার ভুক্তভোগী কোনো দেশও এ বিষয়টি নিয়ে এত দিন অভিযোগ তোলেনি। কিন্তু কালের ধারায় এখন অনেক ঐতিহাসিকই সে সময়ের ওই ‘গণহত্যা’কে বিংশ শতাব্দীর ‘বিস্মৃত গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করছেন। তার পূর্বপুরুষরা নিছক শিকার ছিলেন না জানিয়ে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জেফতা এনগুহেরিমো বলেন, ‘এই যুদ্ধ ছিল উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ। হেরেরো সম্প্রদায়ের মানুষরা যখন ১৯০৪ সালের ভয়াবহ ওই যুদ্ধের গল্প করবেন, তখন তারা কোনোভাবেই ওই গণহত্যার কথা বলবেন না। তারা শুধু যুদ্ধের প্রতিরোধের কথা বলবেন।’

জার্মানদের আফ্রিকা দখল

ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসন চলছিল বিশ^জুড়ে। তবে ঔপনিবেশিক দখলদার হিসেবে পিছিয়ে ছিল না জার্মানিও। ১৮৮৪-৮৫ সালের দিকে ইউরোপের শক্তিশালী কয়েকটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনাসভায় বসে বার্লিনে। লক্ষ্য ছিল আফ্রিকাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। সভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল আফ্রিকা। কিন্তু আফ্রিকাকে বাদ দিয়ে সেখানে অংশ নেয় ব্রিটেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানি। সভার আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের দায়িত্ব পায় জার্মানি।

১৮৮৪ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় (নামিবিয়া) প্রথমবারের মতো নিজেদের উপনিবেশ গড়ে জার্মানি। শুরুতে এ অঞ্চলে তারা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন। পরে ব্যবসারও পথ প্রশস্ত করেন। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী নিয়ে দখল নেওয়া শুরু করে আফ্রিকার ভূমি। ১৯ শতকের শুরুর দিকে ৫ হাজার জার্মান বসতি গড়ে সেখানে এবং শাসন করতেন থাকেন আফ্রিকার আড়াই লাখ আদিবাসী সম্প্রদায়কে। জার্মানদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা কমতে থাকে। জার্মানদের পক্ষ থেকে প্রথমে থিওডর লিওতেইনকে দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার গভর্নর করে পাঠানো হয়। যখন বসতি গড়ে তোলা শুরু হয় তখনই স্থানীয়রা জার্মানদের অত্যাচারের শিকার হতে শুরু করেন। তখন স্থানীয় হেরেরো ও অন্য আদিবাসী মানুষদের পরিকল্পিতভাবে তাদের পৈতৃক জমি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল এবং জার্মান বাহিনীর ‘নাম মাত্র সদস্য’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। এর মধ্যে যে আফ্রিকানরা জার্মানদের আইন অমান্য করত, তাদের কখনো কখনো বেত্রাঘাত করা হতো, নয়তো ঝোলানো হতো ফাঁসিতে। আর নারীরা ধর্ষিত হতেন। জার্মান সরকারের রাখা সে সময়ের রেকর্ডে দেখা গেছে, স্থানীয় নারীদের ধর্ষণ ও হত্যার জন্য শে^তাঙ্গ দখলদারকে খুব কম শাস্তি দেওয়া হতো। এ রকম অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ রয়েছে ।

তাদের এই অত্যাচারের শিকার হন মূলত হেরেরো সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা। জার্মান ও এই স্থানীয় আদিবাসীর মধ্যে শান্তিচুক্তিও করা হয়েছিল, যা বাতিল করা হয় ১৮৮৮ সালে। ১৯০৩ সালের মধ্যে জার্মানরা হেরেরো সম্প্রদায়ের প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা নিজেদের দখলে নিয়ে নেন। গোত্র-দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে হেরেরোদের দু-ভাগ করার পরিকল্পনাও করেন তারা। চলমান বর্বরতা, জমির দখল ও জাতিগত বিভেদের কারণে ক্ষোভে ফেটে পড়েন হেরেরোরা।

ওয়াটারবার্গ যুদ্ধ

১৯০৪ সালের দিকে হেরেরো সম্প্রদায়ের নেতা স্যামুয়েল মাহেরোর নেতৃত্বে জার্মান দখলদার আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান হেরেরোরা। ১২ জানুয়ারিতে তাদের বেশ কজন সেনা ওকাহান্দাজা শহরে জার্মানদের ওপর আক্রমণ চালান। এতে ১২০ জনেরও বেশি জার্মান নিহত হন, যা ছিল চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। পরবর্তী বছরে হেরেরোদের সঙ্গে যুক্ত হয় নামা ও সান সম্প্রদায়। তারাও শুরু করে বিদ্রোহ। এর জেরে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ আরও বাড়তে থাকে। হেরেরোরা প্রাথমিকভাবে সফলও হন। কিন্তু গভর্নর থিওডর লিওতেইনের নেতৃত্বে জার্মানরা তাদের প্রতিরোধ বাড়াতে সংগ্রাম শুরু করেন। হেরেরোদের এভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পর জার্মান সম্রাট কাইজার সেখানে হস্তক্ষেপ করেন। নতুন গভর্নর হিসেবে নামিবিয়ায় পাঠানো হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল লোথার ভন ত্রোথাকে। আসার সময় ত্রোথা সঙ্গে আনেন আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র ও প্রায় ১৪ হাজার সৈন্য। জুনে তিনি থিওডরের স্থলাভিষিক্ত হন। এরপরই হেরেরোদের নির্মূলের জন্য দ্রুত সামরিক নীতি প্রবর্তন করেন তিনি।

মূলত জার্মানদের পরিকল্পিত পাল্টা আক্রমণ শুরু হয় ১৯০৪ সালের জুন থেকেই। আগস্ট ১১ ওয়াটারবার্গ মালভূমির কুঁড়েঘরগুলোতে ঘুমিয়ে ছিল হেরেরো সম্প্রদায়ের প্রায় ৫০ হাজার বা তারও বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু। ভোরের আলো না ফুটতেই গুলির শব্দে জেগে ওঠেন বাসিন্দারা। নিরুপায় হেরেরো যোদ্ধারা এগিয়ে যান জার্মান সেনাদের সঙ্গে লড়তে। এখানেই ৩ থেকে ৫ হাজার হেরেরো যোদ্ধাকে ঘিরেও ফেলেন জার্মানরা। শুরু হয় ভয়ানক যুদ্ধ। মারা যান অনেকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জার্মান সেনা ব্রিগেডের ৬ হাজার (শোইসঠোপা জার্মান সেনার নাম) সদস্যের হাতে মারা যান অনেক স্বাধীনতাকামী হেরেরো যোদ্ধা।

একটি গণহত্যার চেষ্টা

সংখ্যায় কম হলেও তখন জার্মানদের কাছে ছিল ধ্বংসাত্মক মেক্সিম মেশিনগান ও আর্টিলারি, যা দ্রুত হেরেরোদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেন। তবে এদিনের যুদ্ধে প্রথমদিকে হেরেরো যোদ্ধারা একত্র হয়ে জার্মান আর্টিলারি বাহিনীর অবস্থান প্রায় দখল করেই ফেলছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জার্মানদের হাতে আরও বড় ধরনের পরিকল্পনা ছিল। তখন জেনারেল ত্রোথা মেশিনগান সামনে আনার নির্দেশ দেন। আর এই নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে এক নির্মম ইতিহাসের সূচনা হয়। মেশিনগানের গুলির মুখে হেরেরো যোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক হাজার যোদ্ধা মেশিনগানের গুলিতে নিহত হন। তবে ওয়াটারবার্গের কিছু যোদ্ধা সেদিন আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকে থাকতে না পেরে পালাতে বাধ্য হন। পালিয়ে তারা পূর্বাঞ্চলের কালাহারি মরুভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নেন। বাকিদের নিয়ে যাওয়া হয় জার্মান শিবিরে। পরের মাসেও এমন আক্রমণ চালানো হয় ওই অঞ্চলে। এভাবেই কোণঠাসা করে ফেলা হয় হেরেরোদের।

নামা সম্প্রদায়

পানিহীন, রুক্ষ কালহারি ‘ওমাহেক’ নামে পরিচিত। কিন্তু সেদিন ওয়াটারবার্গ থেকে প্রাণে রক্ষা পেয়ে কালাহারিতে যারা আশ্রয় নেন, সেখান থেকে আর ফেরা হয়নি তাদের। কারণ পথরোধ করে বন্দুক হাতে অপেক্ষায় ছিলেন জার্মান সৈন্যরা। তাই সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন তারা। সেই মরুভূমিতে আটকে পড়া হেরেরোদের বিরুদ্ধে তখন জার্মানদের যুদ্ধ জাতিগত নির্মূলের একটি ইচ্ছাকৃত নীতিতে পরিণত হয়েছিল। জেনারেল ভন ত্রোথা তার সেনা দলকে কালাহারি মরুর বুকে কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ ফাঁড়ি স্থাপনের নির্দেশ দেন। যাতে হেরেরোরা তাদের গ্রামের পরিত্যক্ত খামারে আর ফিরে যেতে না পারেন।

বন্দিদের ওপর নির্যাতন

বন্দি শিবিরগুলোতে তখন ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট ও নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আফ্রিকার এই নিরুপায় আদিবাসী সম্প্রদায়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ‘ছাগলের মাথা থেকে যেভাবে চামড়া ছাড়ানো হয়, কোনো কোনো বন্দি ঠিক সেভাবেই তার সঙ্গী বন্দিদের দেহের চামড়া ছাড়াত। এরপর তারা সেগুলো পরিষ্কার করত, খুলি বা হাড়কে প্রস্তুত করা হতো অজ্ঞাত কোনো স্থানে পাঠানোর জন্য।’ ঔপনিবেশিক এই বর্বরতার প্রতিবাদে জার্মানিতে রাজনৈতিক ক্ষোভের মুখে ১৯০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর জেনারেল ত্রোথাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। অবশেষে যুদ্ধ সমাপ্ত করে জার্মানি। পরে ১৯১৮ সালে জার্মানদের প্রথম বিশ^যুদ্ধে পরাজিত করে দক্ষিণ আফ্রিকা। এর আগে ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিয়ন দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার জার্মান উপনিবেশে অভিযান চালায়। ওই বছরের জুলাইয়ে জার্মান বাহিনী আফ্রিকার বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।

নামিবিয়াদের জার্মানদের পাঁচটি বন্দি শিবির ছিল। এর মধ্যে একসময় জার্মানদের পরিত্যক্ত লুডেরিৎজ শহরের বন্দি শিবিরটি ছিল সবচেয়ে কুখ্যাত। এই শিবিরে নামা ও হেরেরো বন্দিরা কম্বল, পরিত্যক্ত কাঠ ও ন্যাকড়া দিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছিলেন আটলান্টিকের ভয়াবহ শীত থেকে রক্ষা পেতে। তাদের মাত্র কয়েকশ গ্রাম খাবার দেওয়া হতো, পয়ঃনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। তাই নিজেদের পচা বর্জ্যে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে নানা রোগ ছড়ায়। নারী বন্দিদের ওপর চলে নির্বিচার ধর্ষণ। সে সময় আফ্রিকার অসহায় এই নারীদের ওপরে চালানো যৌন নিপীড়নে জড়িতদের শুধু ক্ষমাই করা হয়নি, বরং এ ঘটনাগুলো রেকর্ড করতে বিশেষভাবে উৎসাহও দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক নারীর পর্নো ছবি তুলে পোস্টকার্ড করে তা জার্মানিতেও পাঠানো হয়। এই বন্দিদের মধ্যে যারা শারীরিকভাবে একটু সবল ছিল, তাদের কাছের পোতাশ্রয় ও রেলপথে জোর করে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

ওইসময় জার্মান বাহিনীর পথপ্রদর্শক ছিলেন জ্যান ক্লটি। হেরেরোদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের বর্ণনা করেন জ্যান বলেন, ‘ওয়াটারবার্গে হেরেরোরা যখন পরাজিত হন, তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। যুদ্ধের পর হেরেরো নারী, পুরুষ ও শিশুরা জার্মান সেনাদের হাতে ধরা পড়ে। তাদের নৃশংসভাবে হত্যা ও পঙ্গু করে ফেলা হচ্ছিল। এদের ওপর নির্যাতন শেষে জার্মানরা পলায়নরত হেরেরোদের ধাওয়া করল। পথে নিরস্ত্র ও একেবারেই সাধারণ হেরেরো লোকজন, যারা শুধু তাদের গবাদিপশু নিয়ে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছিলেন, তাদের গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।’ বন্দি শিবিরগুলোতে শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়, নানা অমানবিক পরীক্ষাও চালানো হয়। এদের মাথার খুলি নিয়েও জার্মানিতে পাঠিয়ে পরীক্ষাগারে ব্যবহার করা হতো। এমনকি যারা বন্দি ছিলেন তাদের দেহে বিভিন্ন পরীক্ষা করে ফল জানা হতো।

ক্ষমা স্বীকার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি নিধন থেকে শুরু করে জার্মানদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সবার জানা। কিন্তু নামিবিয়ার আফ্রিকার আদিবাসী ওই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা যেমন মর্মান্তিক, তেমনি নৃশংস, যা প্রায় বিস্মৃতির পথে। তবে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে খোদ নামিবিয়াতেই জোরালো প্রচারণা কম। ১৯১৮ সালের পর এই গণহত্যার ওপর বাস্তবভিত্তিক প্রথম বই ছিল ‘ব্লু বুক’।

তবে বন্দি শিবিরগুলোতে কত বন্দি ছিল তার সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। এ সম্পর্কে যে তথ্যগুলো রেকর্ড করা আছে তাও বেশ এলোমেলো ও বিক্ষিপ্ত। এর মধ্যেও যে রেকর্ডগুলো রয়েছে, সেখানে হাজার হাজার হেরেরো ও নামা মানুষের মৃত্যুর কথা লেখা আছে। অনুমান করা হয়, ৮০ হাজার ওই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৬৫ হাজার হেরেরো সম্প্রদায়ের মানুষ মারা গিয়েছিলেন তখন। এদিকে ২০ হাজারের নামা জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক ১০ হাজার সদস্য মারা যান। এই সংখ্যাকে কেউ কেউ অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে জেফতা ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, এই সংখ্যার চেয়েও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি ছিল। অর্থাৎ গোটা একটা জাতি ও আরেকটি জাতির কিছু অংশ বিলীন করে দেওয়া হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম এই গণহত্যায়। মূলত হেরেরোদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এরই মধ্যে কেটে গেছে ১২০ বছর। নামিবিয়ার আবাদযোগ্য জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো জার্মান বসতি স্থাপনকারীদের বংশধরদের মালিকানাধীন। সেজন্য জার্মানির দখলকরা জমি ও গণহত্যায় প্রাণ হারানো মানুষদের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নামিবিয়ার সরকার ।

তবে ২০২১ সালে নামিবিয়ার সঙ্গে যৌথ এক ঘোষণায় ১৯০৪ ও ১৯০৭ সালের ওই হত্যাকা-কে গণহত্যা হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে জার্মান সরকার। ওই ঘোষণা অনুযায়ী, পরবর্তী ৩০ বছরের মধ্যে গণহত্যার শিকার সম্প্রদায়ের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১.১ বিলিয়ন ইউরো নামিবিয়া সরকারকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তারা। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে চুক্তি ও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ আরও বাড়ানোর দাবি করে নামিবিয়ার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। পরে নামিবিয়ার পক্ষ থেকে হেরেরো ও নামা সম্প্রদায় এবং দেশটির মানবাধিকারকর্মীরা চুক্তিটি সইয়ের জন্য আলোচনায় বসতে চান। কিন্তু আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে জার্মান পার্লামেন্ট। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে নিউ ইয়র্কের আদালতে মামলা চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত