সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ধারণার চেয়ে বেশি তাপ শুষে নিচ্ছে সমুদ্র

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৪:২৮ পিএম

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষতি যতোটা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি। ভূ-পৃষ্ঠের অতিরিক্ত তাপ সমুদ্র কতোটা শুষে নেয় তার অনুমানও যথাযথ ছিল না। এ বিষয়ে নতুন গবেষণা শেষে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত ২৫ বছরে ধারণার চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি তাপ শুষে নিয়েছে সমুদ্র।

সম্প্রতি ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এর বরাত দিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণার তথ্যানুযায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বর্তমান ধারণার চেয়েও বেশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে পৃথিবী।

আইপিসিসি (জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল)-এর সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে আটকে পড়া অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি শুষে নিচ্ছে সমুদ্রগুলো।

নতুন এই গবেষণায় বলা হচ্ছে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমরা যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করি তার ১৫০ গুণ তাপ আমরা সমুদ্রে ফেলছি। এ হিসেবে গত ২৫ বছরে সমুদ্র যে পরিমাণ তাপ শোষণ করেছে তা আগের ধারণার চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস ধারণার চেয়েও বেশি পরিমাণে নিঃসরণ হচ্ছে। একইসঙ্গে সমুদ্রও বেশি তাপ শোষণ করছে। আর ধারণার চেয়েও বেশি তাপ সৃষ্টি করছে গ্রিনহাউস গ্যাস। যার অর্থ- কার্বনডাই অক্সাইডের কারণে পৃথিবী আরো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষকদের ধারণা, প্যারিসে সই হওয়া জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অনেক কঠিন হবে। প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় মাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আটকে রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে আইপিসিসি। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, তা সহজ হবে না।

গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ও নিউ জার্সির প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লোর রেসপ্ল্যান্ডি বলেন, ‘এটা খুবই উদ্বেগজনক। আপনি যদি আইপিসিসির লক্ষ্যমাত্রার দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন তা অর্জন করা বিরাট চ্যালেঞ্জের।’ কারণ, বৈশ্বিক তাপমাত্রার গড় বৃদ্ধি যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হয় তাহলেও কার্বন নিঃসরণের মাত্রা আগের হিসাবের চেয়ে ২৫ শতাংশ কমাতে হবে।

সমুদ্রের এই ব্যাপক পরিমাণে তাপ শোষণের আরো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। জলভাগে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। ড. রেসপ্ল্যান্ডির মতে, ‘সমুদ্র যত উষ্ণ হবে, এতে অক্সিজেনের পরিমাণ তত কমবে। এর প্রভাব সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানে পড়বে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বেড়ে যাবে।’

সমুদ্রের তাপমাত্রা মাপার পুরনো পদ্ধতিতে বেশকিছু ত্রুটি ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে আরো নিখুঁতভাবে সামুদ্রিক তাপমাত্রার হিসাব রাখা শুরু হয়। বিশ্বজুড়ে একটা নেটওয়ার্ক থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারার কারণে তা সম্ভব হয়। নতুন পদ্ধতিতে সমুদ্রের বাতাসের মধ্যে অক্সিজেন ও কার্বনডাই অক্সাইডের পরিমাণ থেকে তাপমাত্রা মাপা হয়। এ গবেষণায় সারা পৃথিবীর প্রায় ৪ হাজার স্থান থেকে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিমাপ নেওয়া হয়েছে।

রেসপ্ল্যান্ডি বলেন, ‘উষ্ণ হওয়ার পর সমুদ্র ওই গ্যাস জমা রাখে ও এক সময় ছেড়ে দেয়। তাই আমরা সমুদ্রের ছেড়ে দেওয়া গ্যাসের হিসাব করি। এর ফলে সমুদ্র এখন কী পরিমাণ উষ্ণ রয়েছে তা বুঝা যায়।’

গবেষকরা সমুদ্রকে ঠান্ডা রাখার উপায়ও জানাচ্ছেন। তবে পথটা বেশ কঠিন- আগে ভূ-পৃষ্ঠকে ঠাণ্ডা করতে হবে। রেসপ্ল্যান্ডি বলেন, আমরা যদি গ্রিনহাউসের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রাকে কমাতে পারি তাহলে সমুদ্রের তাপমাত্রা কমে আসবে। সমুদ্রের এই তাপ শুষে নেওয়া এবং ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শতকের পর শতক ধরে চলে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকি ঠেকাতে চলতি শতকেই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে বলেও জানান তিনি।

নতুন এই গবেষণার ফল অনেকটা মেনে নিচ্ছেন যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটনের জাতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান কেন্দ্রের অধ্যাপক সিবরান ড্রিজফওট। তবে সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস ফ্রোলিখার বলেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

এসকে/এএমটি/এমএসআই

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত