ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড় দিলেও তার গড়া আওয়ামী লীগ আপস করতে বাধ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় জাদুঘরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচনে আদর্শের বিষয়টি ক্ষীণ হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর একটি ব্যাপার হচ্ছে যে, তিনি তার পথ থেকে কিন্তু খুব একটা বিচ্যুত হননি। কিন্তু বর্তমানে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শের উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করলেও তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শটা কতটুকু অনুধাবন করতে পেরেছে, সেটি নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। কারণ বঙ্গবন্ধুর লেখাগুলো মনে হয় তারা পড়েনি। পড়লে তারা ওইভাবে একটা সমঝোতাপূর্ণ অবস্থানে যেতে পারত না।
ধর্মের কথা বলে একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালির ওপর হত্যা, নির্যাতন চালানো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। তবে একইসঙ্গে হেফাজতে ইসলামের মতো ধর্মীয় গোষ্ঠীর দাবি মেনে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণ এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিকে ভালো চোখে দেখেননি অনেকে।
বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও কলামে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কথা বলা মুনতাসীর মামুন এদিন বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় গোষ্ঠীর ব্যাপক প্রভাব ঠেকাতে শেখ হাসিনার ওপরই আস্থা রাখতে বলেছেন তিনি।
বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী আয়োজিত একক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি মুনতাসীর মামুন সভাপতির বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমানের রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিষয়টি গৌণ হয়ে যাচ্ছে। সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষয়টি বা ধর্মীয় আইডেনটিটির বিষয়টি মুখ্য হয়ে আছে। শেখ হাসিনার পক্ষেও ধর্মীয় আইডেনটিটি বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিষয়টি উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। শেখ হাসিনা চার মূলনীতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন আবার তার সঙ্গে ধর্মকেও রেখে দিতে হচ্ছে।
মুনতাসীর মামুন বলেন, আমার মনে হয়, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার যে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে, ধর্মের যে উপাদান সেটি আমাদের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না। এই ধারাটিকে আমরা গৌণ করতে পারি কি না, সেটি হবে এই দ্বন্দ্বের একটি মূল বিষয়। তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্টকে আমরা বলিÑতারা পাকিস্তানি মানস বা ভাবধারাকে অর্থাৎ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ধারাকে পুষ্ট করতে চাইছে। যদিও চরম সাম্প্রদায়িক ড. বি চৌধুরী এখন ‘জয় বাংলা’ বলছেন। কিন্তু আমরা যখন আওয়ামী লীগকে ধরি, এটাকে কেউ পাকিস্তানি ধারা বলে না, বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারাই বলে।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে ক্ষীণ করার প্রশ্নে শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়াতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে ক্ষীণ করার প্রশ্নে শেখ হাসিনার পক্ষে যদি তরুণরা না দাঁড়ায়, তাহলে আমরা সর্বনাশের পথে অগ্রসর হব। আগে তরুণরা গ্রহণ করেনি। তরুণরা যদি এবার ভুল করে, তাহলে বাংলাদেশ যে পথে যাবে, সে পথ থেকে বাংলাদেশকে ফেরানো খুব কঠিন হবে। অনুষ্ঠানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিজয় দিবস’ শীর্ষক একক বক্তৃতা করেন জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে সব থেকে বড় দিক হলো, বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হওয়া। ১৯৪৮ থেকে আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অবধি দেখা যাবে, কখনই বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক পথ থেকে একচুলও সরেননি। আর বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত বিজয়ে নেওয়ার পথে প্রতিটি স্তর তিনি পার করেছেন সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে ও শতভাগ নিয়মতান্ত্রিক পথে। তাই বাঙালি জাতির বিজয়ের আন্দোলন পৃথিবীর মানুষের মুক্তির পথে অন্যতম নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে একটি উদাহরণ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছে উল্লেখ করে স্বদেশ রায় বলেন, এ বিজয় এতই শক্তিশালী যে, বিজয়ের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তার নায়ককে হত্যা করে উল্টো যাত্রা শুরু হলেও সরাসরি এই রাষ্ট্রে আর কখনই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের পতাকা ওড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বাঙালি সংস্কৃতি আর বাঙালি জাতীয়তাবাদই নানা আকার ধারণ করে এগিয়ে যাবে ভবিষ্যতের দিকে। আর সুদূর ভবিষ্যৎও বলবে, ১৬ ডিসেম্বর ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত বিজয় দিবস।
