পাবনার চাটমোহরের স্কুলশিক্ষক দম্পতি রফিকুল ইসলাম ও তাসলিমা খাতুনের যমজ শিশু রাবেয়া ও রোকাইয়াকে হাঙ্গেরি পাঠানো হচ্ছে আজ শনিবার রাতে। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে দুই দফায় হাঙ্গেরি ও জার্মানির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে শিশু দুটির মাথায় এনজিওগ্রামের মাধ্যমে প্রধান রক্তনালি সফলভাবে আলাদা করা হয়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য তাদের হাঙ্গেরি পাঠানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শিশুদের সপরিবারে হাঙ্গেরি পাঠানোর সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। তাদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক হোসাইন ইমাম ইমুও সঙ্গে যাচ্ছেন। এর আগে গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে এসে শিশুদের পরিবারের হাতে হাঙ্গেরি যাওয়ার বিমান টিকিট তুলে দেন।
২০১৬ সালের ১৬ জুলাই স্থানীয় পিডিসি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় মাথাজোড়া যমজ মেয়েশিশু। জন্মের সময়েই তাদের মাথার অর্ধেকেরও বেশি জোড়া লাগানো ছিল। শুরুতে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে শিশু দুটিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। পরে পাবনার তৎকালীন সাংসদ মকবুল হোসেনের মাধ্যমে তাদের ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা শিশুদের বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। তাদের বিষয়ে অবহিত করা হয় প্রধানমন্ত্রীকেও। তিনিও চিকিৎসার বিষয়ে আগ্রহ দেখান। এরপর হাঙ্গেরি ও জার্মানির দুই বিশেষজ্ঞ প্লাস্টিক ও নিউরোসার্জনকে দেখানো হয় তাদের।
পাবনার চাটমোহর রেলবাজারের আটলংকা গ্রামে বাড়ি রাবেয়া, রোকাইয়াদের। বাবা রফিকুল ইসলাম অমৃতকোন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও মা তাসলিমা খাতুন গ্রামেরই আটলংকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এই দম্পতির বড় মেয়ে তাসনিম ইসলাম রাফিয়ার বয়স সাত বছর।
শিশু দুটির মা তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘মাথা জোড়া লাগানো বাচ্চাদের নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা পোহাতে হয় না আমাদের। ওরা হাঁটতে পারে, খেতে পারে। ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে দুইবার অস্ত্রোপচার হয়েছে তাদের। ডাক্তাররা বলেছেন, মোট চার-পাঁচবার অস্ত্রোপচার করতে হবে। এখন তৃতীয়বারের মতো অস্ত্রোপচারের জন্য আজ রাতে হাঙ্গেরি যাচ্ছি। এই ধাপটাই তাদের জন্য বেশি কঠিন ও অনেক কষ্টকর, যেটা কাটিয়ে ওঠা অনেক কঠিন বলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। যদি আল্লাহ সহায় হন, তাহলে ওরা ভালো হতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।’
কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া তাসলিমা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া। তিনি শিশু দুটিকে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ওদের অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। শুধু মাথা জোড়া লাগানো। হাঁটাচলা, খাওয়াদাওয়া সবকিছুই স্বাভাবিক। তবে আল্লাহ রহমত করলে ওই সমস্যাটাও সমাধান হয়ে যাবে।’
রাবেয়া-রোকাইয়ার মা বলেন, ‘আমার বাচ্চারা যে সুস্থ হবেই, তা আমি বলছি না। কারণ ডাক্তাররা আমাদের বলেছেন, তাদের মাথা আলাদা করা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ভালোও হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে। যখন বিদেশি ডাক্তাররা তাদের অপারেশন করেছিলেন, তখনো আমাদের বলেছিলেন, অপারেশনের সময় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে শিশু দুটি মারাও যেতে পারে, আবার পুরো শরীর অকেজোও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমরা ওদের সুস্থভাবে জীবন দিতে সাহায্য করতে চাই। তাই আমরা ওদের জন্য সব ঝুঁকিই নিতে রাজি আছি।’
হাঙ্গেরিতে শিশু দুটির তৃতীয় ধাপের চিকিৎসার বিষয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন শিশু দুটিকে বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক ও নিউরো সার্জন দ্বারা চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেই তাদের চিকিৎসার দুই ধাপ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন করার জন্য তাদের হাঙ্গেরি পাঠানো হচ্ছে। সেখানে পাঁচটি বিশেষজ্ঞ টিম তাদের চিকিৎসা পরিচালনা করবে। আনুমানিক তিন-চার মাস তারা সেখানে চিকিৎসা নেবে। সেখানে তাদের ব্রেইনের সফট টিস্যু আলাদা করাই প্রথম কাজ, যেটিকে টিস্যু এক্সপানশন বলে। এর সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাথার মাংস ও খুলি ফুলিয়ে ভিতরে ফাঁকা জায়গা করা হবে। তবে একটি ভালো দিক হচ্ছে, তাদের ব্রেইন গঠনগতভাবে আলাদা।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের পৃথক করার জন্য আমরা যে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি, এ রকম রোগীর সফলতা ২০ পার্সেন্টেরও কম। এ বিষয়টি তাদের বাবা-মাকে জানানো হয়েছে।’
আবুল কালাম জানান, পরবর্তী ধাপে আনুমানিক ছয় মাস পর ঢাকায় শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তাদের মাথা সম্পূর্ণভাবে পৃথক করার কাজ করা হবে।
গতকাল ঢাকা মেডিকেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি শিশু দুটিকে সুস্থ করার দায়িত্ব নিয়েছেন। বিরল অপারেশন হতে যাচ্ছে এটি। কামনা করি যেন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে তারা। পরিবারও অন্তর থেকে সাহস করে তাদের লালন-পালন করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে, তার সহায়তা ও অনুদানেই শিশু দুটিকে হাঙ্গেরি পাঠানো হচ্ছে। পরিবারসহ শিশু দুটির সেখানে চিকিৎসার সব ব্যয়ভার প্রধানমন্ত্রী নিজেই বহন করবেন।’
