সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অনুসরণীয় বিরল ব্যক্তিত্ব

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:১৮ এএম

তিনি ছিলেন স্থিরচিত্তের। যেকোনো সংকটে ছিলেন অবিচল। সংকটকালীন সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছিলেন পারদর্শী। চিন্তা-চেতনায়, কথা-বার্তায়, চলনে-বলনে, আচার-আচরণে, আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের প্রিয় মানুষ এবং আস্থাবান প্রতিনিধি

গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টায় একটি অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগর ফিরছি। পথে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জানতে পারি সৈয়দ আশরাফ আর নেই, তিনি চিরতরে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। দুজনকে ফোন করে খবরটা নিশ্চিত হই। মনটা বিষণ্ণ ও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সৃষ্টিকর্তার ওপর ক্ষুব্ধ হই এই ভেবে যে, সৃষ্টিকর্তা মানবজাতিকে অসহায় করে কেন ভালো মানুষগুলোকে এত দ্রুত নিজের কাছে ডেকে নেন।

বঙ্গবন্ধুর অতিবিশ্বস্ত জাতীয় চার নেতার অন্যতম, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সুযোগ্য সন্তান সৈয়দ আশরাফ বাবার আদর্শ ধারণ, লালন ও চর্চা করেই বড় হন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ আশা-আকাক্সক্ষার মধ্যে তার মন ও মানসিকতার বিকাশ ঘটে। সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার, সুখ-দুঃখের সঙ্গে ছিল তার নাড়ির যোগ। তাদের ভাষায় কথা বলেছেন। তাদের হয়ে সংগ্রাম করেছেন। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন সব সময়। কখনো বিচ্যুতি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। বাবা যেমন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত ছিলেন, তেমনি তিনিও ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। ভাই-বোনের মতোই ছিলেন তারা। সৈয়দ আশরাফের রোগমুক্তির সম্ভাবনা অতিক্ষীণ জেনেও জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকে গত ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছেন এবং বলেছিলেন, ‘যত দিন সৈয়দ আশরাফ রয়েছে, তত দিন ওই আসনে আমি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেব না।’ জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দিয়েই ক্ষান্ত হননি, প্রচারের দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি। একজন ত্যাগী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি এতটা সম্মান প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত বিরল। জননেত্রী আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বঙ্গবন্ধুর আর এক প্রিয় সহচর আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ আশরাফ। এ সময় আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। সৈয়দ আশরাফ দুবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন এবং মৃত্যুকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনে সৈয়দ আশরাফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন স্থিরচিত্তের। যেকোনো সংকটে ছিলেন অবিচল। সংকটকালীন সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছিলেন পারদর্শী। চিন্তা-চেতনায়, কথা-বার্তায়, চলনে-বলনে, আচার-আচরণে, আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের প্রিয় মানুষ এবং আস্থাবান প্রতিনিধি। বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব গুণ এবং মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র সৈয়দ আশরাফ ছিলেন উন্নত সংস্কৃতিমনা সৌম্য-শান্ত-ভদ্র-বিনয়ী-মৃদুভাষী, সাদা-সিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত, সৎ ও লোভ-লালসা-অহমিকাহীন অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় রাজনৈতিক সজ্জন ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষগুলো সৈয়দ আশরাফকে অনুসরণ করলে রাজনীতি কলুষমুক্ত ও গণতন্ত্র বিকশিত হবে।

সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন সুস্থ রাজনীতির অনুপ্রেরণা হিসেবে আমাদের চেতনায়, আমাদের বিশ্বাসে আদর্শের আলোকবর্তিকা হয়ে। মহান এই ব্যক্তিত্বের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

লেখক : উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত