সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জামিন ছাড়াই যেখানে হত্যা সেখানেই চাকরি

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০১:৩২ এএম

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) দুই ছাত্রলীগ নেতা হত্যার প্রায় চার বছর হলেও এখনো বিচার পায়নি তাদের পরিবার। উল্টো মামলার দুই আসামি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক রুহুল আমিন ওই দুই আসামিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দিয়েছেন। তিনি নিজেও একটি মামলার প্রধান আসামি। হত্যাকান্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। এমনকি জামিন না নিয়েও ওই দুই আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। জামিনের বিষয়ে পুলিশের কাছেও কোনো তথ্য নেই। 

নিহতদের দুই পরিবারের অভিযোগ, মামলার আসামিরা দাপটের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অংশ নিচ্ছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আর আতঙ্কে দিন কাটছে নিহতদের স্বজন এবং মামলার সাক্ষীদের। বিচার চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও গত সাড়ে চার বছরে মিলেছে শুধু আশ্বাস। এই নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আসামি আসাদুজ্জামান জেমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন হিসেবে কর্মরত। তিনি শাখা ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। মো. আহম্মেদুল হক খোকন নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। তিনি ছাত্রলীগ কর্মী ছিলেন। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে মামলার এই দুই আসামি প্রথম শ্রেণির চাকরি পান বলে হাবিপ্রবির এক কর্মকর্তা জানান।

নিহতদের দুই পরিবারের অভিযোগ, তৎকালীন উপাচার্য রুহুল আমিন ওই ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্য তিনজনকে স্থায়ী ও ১৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন। বহিষ্কৃতদের ১২ জনই মামলার সাক্ষী।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গত শুক্রবার অধ্যাপক রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষোভ থেকে কাউকে বহিষ্কার করা হয়নি। অপরাধীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। এখনো মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি। মামলাটিও সত্য নয়, যারা হত্যায় জড়িত ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত সাপেক্ষে তাদের শাস্তি দিয়েছে।’

২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন রুহুল আমিন। তিনি বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন। এ ব্যাপারে জানতে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল কাশেমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ৪ নভেম্বর ভর্তি জালিয়াতির অভিযোগে হাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অরুণ রয়কে বহিষ্কার করে প্রশাসন। এ ঘটনার জের ধরে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পক্ষের নেতা কর্মীরা। আন্দোলন অবস্থায় ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল ভেটেরিনারি অনুষদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একাংশের নেতারা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফতেখার ইসলাম রিয়েল ও সম্পাদক অরুণ কান্তি রয় গ্রুপের ওপর হামলা চালায়। এতে বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জাকারিয়া ও ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের ছাত্র মাহমুদুল হাসান মিল্টন নিহত হন।

নিহত জাকারিয়া মাহফুজুর রহমান হল (বর্তমানে শেখ রাসেল) শাখা ছাত্রলীগের নেতা এবং মিল্টন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিলেন। খুনের ঘটনায় পরিবারের করা পৃথক দুটি মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়। নিহত মিল্টনের চাচা মকসুদার রহমান বাদী হয়ে ২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল সিনিয়র চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩৭ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার এক নম্বর আসামি তখনকার উপাচার্য রুহুল আমিন। আসাদুজ্জামান জেমিকে সাত নম্বর এবং আহমেদুল হক খোকনকে ১৯ নম্বর আসামি করা হয়।

অন্যদিকে নিহত জাকারিয়ার বাবা গোলাম  মোস্তফা একই বছরের ২৮ এপ্রিল দিনাজপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবু ইবনে রজ্জবকে এক নম্বর আসামি করে এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ ঘোষ কাঞ্চনসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন। সংঘর্ষের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা কামরুজ্জামান কামু ও জুয়েলকে পুলিশ আটক করলেও তারা এখন জামিনে মুক্ত।

নিহত জাকারিয়ার বাবা ও মামলার বাদী গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিমের ক্যাডার বাহিনী আমার ছেলেকে খুন করে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও একমাত্র ছেলের হত্যার বিচার পাই না। এখনো মামলার চার্জশিট পর্যন্ত দেয়নি পুলিশ।’

মামলার আসামিদের মধ্যে নাহিদ আহম্মেদ নয়ন, তারেক চৌধুরী, পলাশ রায়, আমিনুল ইসলাম লিটু, মোমেনুল হক রাব্বি, মামুনুর রশিদ মামুন, রুহুল কুদ্দুস জোহা ও আশরাফুল আলম হুইপ ইকবালুর রহিমের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ রয়েছে।  

জানতে চাইলে সংসদ সদস্য ও হুইপ ইকবালুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ। এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বহিরাগতদের সংঘর্ষ বাধে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রক্টর সবাই আসামি। এ থেকেই বোঝা যায় মামলাটি কতটা সঠিক।’ 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকার পরও সাড়ে চার বছরেও চার্জশিট দেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময়েও প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে গত বৃহস্পতিবার মামলার বর্তমান তদন্ত কমকর্তা এসআই মো. আবদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সাড়ে চার বছরে ১৪ বার মামলার আইও পরিবর্তন করা হয়েছে। আমি এখনো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ পাইনি।’ আসামিদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ আটক আছে কি না বা তারা বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরি করে কি না তা আমার জানা নেই। আসামিরা জামিনে আছেন এমন কাগজও আমাকে দেখানো হয়নি।’

নাম প্রকাশ না করে মামলার এক সাক্ষী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার সাক্ষী হওয়ায় আমাদের বহিষ্কার করেন সাবেক উপাচার্য। খুনিরা প্রতিনিয়ত হুমকি অব্যাহত রেখেছে। প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের আতঙ্কে থাকতে হয়।’

হাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অরুণ কান্তি রয় বলেন, ‘যারা হামলার শিকার হলাম তাদেরই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল শনিবার আসামি আহম্মেদুল হক খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কে বা কারা মামলা করেছে তা জানা নেই।’  অপর আসামি আসাদুজ্জামান জেমি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি মিথ্যা মামলা। রাজনীতি করতাম বলে ফাঁসানো হয়েছে।

ঘটনার সময় বহিরাগতরা অংশ নেয় এমন ভিডিও ফুটেজ এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। ঘটনার পর একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে তৎকালীন প্রক্টর এটিএম শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘হামলায় মুখোশধারী বহিরাগতরা অংশ নেয়।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী সময়ে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

গতকাল এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর এটিএম শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বহিরাগত থাকার বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিয়েছি বলে মনে পড়ছে না। বহিরাগতদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সঠিক মনে পড়ছে না। তবে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। 

দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় খোঁজ নিলে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এস আই আবদুল মালেক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় কোনো মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। দুই পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক হত্যা মামলা হয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) নাজমুল আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা এর প্রতিবেদন জমা দেবেন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত