কোম্পানিটির চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে তার ভাই ও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মোবারক হোসেনের দ্বন্দ্বের প্রভাবে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইজ ক্যাবলসের উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে। উভয়পক্ষই অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে আবেদন করে পরস্পরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করে কোম্পানির করুণ দশা তুলে ধরেছেন।
আর গ্রুপটিকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গত এক বছর ধরে কোনো ঋণই পরিশোধ করেনি গ্রুপটি।
প্যারাডাইজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১১টি। এরমধ্যে প্যারাডাইজ ক্যাবলস লিমিটেড, এসবিএস ক্যাবলস লিমিটেড, প্যারাডাইজ মেটালার্জিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড, প্যারাডাইজ স্পিনিং মিলস লিমিটেড, প্যারাডাইজ ফ্যাশন লিমিটেড।
বিভিন্ন ব্যাংকের এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ এখন মন্দমানের খেলাপি। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও ফিনিক্স লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে গ্রুপটির ঋণ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানির মালিক সহোদরদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। একপক্ষ অন্যপক্ষের অজান্তে কোম্পানি থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এ দ্বন্দ্ব গত বছর থেকে প্রকাশ্যে এসেছে। গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ও তার ছেলে ফারহান মোশাররফ এক পক্ষ নিয়েছেন। অপরপক্ষে রয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবারক হোসেন ও কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান। উভয়পক্ষই বিভিন্ন ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি লিখে ও সশরীরে উপস্থিত হয়ে অন্যপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন গ্রুপের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক এহতেশামুল করিমকে লেখা এক চিঠিতে কোম্পানির টাকা তার নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করার নির্দেশ দেন। এ জন্য তিনি ডাচ বাংলা ব্যাংকের বনানী শাখার একটি হিসাব নম্বরও দেন।
ওই চিঠিতে তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ভাইস চেয়ারম্যান কোম্পানির ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। এতে কোম্পানির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কেনা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গত মে মাসে চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে করা এক আবেদনে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা প্যারাডাইজ ক্যাবেলসের ঋণ নিয়মিত করণের আবেদন করেন।
এর পরপরই গ্রুপের এমডি মোবারক হোসেন গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাল্টা আবেদন করেন। তার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘মো. মোশাররফ হোসেন প্যারাডাইজ ক্যাবলস লি. এর চেয়ারম্যান হিসেবে যে আবেদন করেছেন, তা তথ্যনির্ভর নয়।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, মোশাররফ হোসেন প্যারাডাইজ ক্যাবলস বিক্রির টাকা থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এমডির স্বাক্ষর জাল করে ঋণপত্র খোলার অভিযোগও করেন তিনি।
গভর্নরের কাছে করা আবেদনের অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়েও পাঠিয়েছেন এমডি মোবারক হোসেন। তাতে তিনি বলেছেন, দেড় বছর ধরে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন বন্ধ আছে। গুদামেও কাঁচামালের মজুদ নেই। উৎপাদিত পণ্যেরও কোনো মজুদ নেই। বাজারে কোনো পাওনাও নেই প্যারাডাইজ গ্রুপের।
‘এক কথায় পুরো গ্রুপটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে এবং বর্তমানে এটাকে চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছেন। টাকা আত্মসাতের ফলে কোম্পানি এখন চলতি মূলধনশূন্য হয়ে পড়েছে’Ñ যোগ করেছেন মোবারক হোসেন।
