নির্বাচন শেষ হলেও মামলা ও ধরপাকড়ের আতঙ্ক কাটছে না বিএনপি নেতাকর্মীদের। জামিন নিতে প্রতিদিনই উচ্চ আদালতে ভিড় করছেন তারা। গত কয়েকদিন সুপ্রিম কোর্ট ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।
আইনজীবীরা জানান, গত ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগে প্রতিটি কর্মদিবসে বিএনপির বহু নেতাকর্মী আগাম জামিন নিয়েছেন। ভোটের পরও জামিনপ্রত্যাশীরা আসছেন। গত রবিবার পাবনা, পটুয়াখালী, চাঁদপুরসহ পাঁচটি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিএনপির ১০ নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের দাবি, ভোটের আগে ধরপাকড়ের যে ধারাবাহিকতা ছিল, সেই আতঙ্ক এখনো আছে। নতুন মামলা না হলেও ভয় কমছে না। ভোট শেষে অবস্থার পরিবর্তনের আশা করলেও এখনো অনেকে এলাকায় ফিরতে পারছেন না।
নাশকতার মামলায় আগাম জামিন নিতে গত রবিবার হাইকোর্টে এসেছিলেন কুমিল্লা জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া। সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স (বর্ধিত) ভবনের দোতলায় আদালত কক্ষের সামনে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৩ ডিসেম্বর আমিসহ স্থানীয় বিএনপির ৬৩ জনকে আসামি করে চান্দিনা থানায় নাশকতার মামলা হয়। তখন থেকে ভয়ে সবাই এলাকাছাড়া। নতুন করে মামলা না হলেও হয়রানির ভয়ে বাড়ি যেতে পারছি না।’ আগাম জামিন নিতে আসা চান্দিনার বারেরা ইউনিয়ন বিএনপির একজন নেতা বলেন, ‘আমি ওই এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। হুমকির কারণে ভোটের আগে ও পরে চারদিন পর্যন্ত দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। নিজে এলাকায় যেতে পারছি না।’
পাবনার সুজানগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শামসুর রহমান শামস জানান, ভোটের কিছুদিন আগে হওয়া একটি মামলায় আগাম জামিন নিতে এসেছেন তিনিসহ ১৫ জন নেতাকর্মী। তিনি বলেন ‘সুজানগরে একটি কলেজে শিক্ষকতা করতাম। গত ৮ বছর একপ্রকার বাড়িছাড়া। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে দুদিনের জন্য গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নির্বাচনের পর পরিস্থতি কিছুটা ভালো হবে। কিন্তু পুলিশের ভয়ে এখনো বাড়ি যেতে ভয় পাচ্ছি। এখন ঢাকাতেই থাকি। ছোটখাটো ব্যবসা করছি।’ জামিন নিতে এসেছেন একই উপজেলার হাটখালি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কাদের ফকির। সত্তর বছরের এই বৃদ্ধ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে থেকেই বাড়িতে যাই না। আমি অসুস্থ, হার্টে রিং পরানো। এই বয়সে জেলে গেলে আর বাঁচব না। তাই আগাম জামিনের চেষ্টা করছি।’
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ফরিদগঞ্জ (দক্ষিণ) ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমার নামে দুটি নাশকতার মামলা দেওয়া হয়েছে। একটি মামলায় জামিন নিতে এসেছি। নির্বাচনের একমাস আগে থেকেই এলাকায় যাই না। কবে যাওয়া হবে, তাও অনিশ্চিত। জামিন পেলেও আবার নতুন কোনো মামলায় জড়ানো হয় কি না সে দুশ্চিন্তাও আছে।’ ফরিদগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি হারুন অর রশিদ জানান, গত ১০ ডিসেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় স্থানীয় বিএনপির ১৮০ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এলাকায় এখনো নির্বাচনী আনন্দ করছে। আর আমরা আদালতে দৌড়ের ওপর আছি।’ ফরিদগঞ্জ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাইদ সরকার বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে গত নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আমার নামে ১৯টি মামলা হয়েছে। ১৮টিতে জামিন পেয়েছি। নির্বাচনের আগে হওয়া একটি মামলায় আগাম জামিন নিতে এসেছি।’
ফরিদগঞ্জের বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানি করেন আইনজীবী রেজাউল করিম জিল্লুর। তিনি বলেন, ‘৮টি গ্রুপে ৬৭ জন বিএনপি নেতাকর্মীর আগাম জামিন হয়েছে। অন্য কোনো মামলা না থাকলে বা হয়রানি করা না হলে তাদের এলাকায় যেতে কোনো সমস্যা নেই।’
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ কে এম এহসানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপির শত শত নেতাকর্মী হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। এখনো অনেকেই আসছেন। আগাম জামিন নিচ্ছেন। প্রতিদিনই নেতাকর্মীদের জামিনের আবেদন করছি আমরা।’
