মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিবদের (পিএস) বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দৌরাত্ম্যের অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে এবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজ থেকেই তাদের জন্য একান্ত সচিব ঠিক করে দিয়েছে। উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন সরকারের মন্ত্রীরা স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথম নিজেদের পছন্দসই পিএস পেলেন না।
৪৬ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর জন্য সমানসংখ্যক পিএস নিয়োগ দিয়ে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী
থাকলেও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তুলনামূলকভাবে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের এবার মন্ত্রীদের পিএস করে পাঠিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এর আগে বিভিন্ন মন্ত্রীর পিএস ও এপিএসের অনিয়ম-দুর্নীতির খবর ফলাও করে গণমাধ্যমে এলেও তার কোনো প্রতিকার নিতে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেসবের কোনো তদন্তও করেনি। নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অনেক সময় মন্ত্রী নিজ থেকেই এপিএসকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে এক দিন আগের আনন্দ-উচ্ছ্বাস এক ঘটনাতেই মিইয়ে গেছে অনেক মন্ত্রীর। তাদের কেউ কেউ বিষয়টি ভালোভাবে নিতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নিজেদের পছন্দমতো পিএস পেলে ভালো হতো।
একজন মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রী প্রশাসনিক সব বিষয়েই পিএসের পরামর্শ গ্রহণ করেন। সেই পিএসের সঙ্গে যদি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক না হয়, তাহলে কাজ করা মুশকিল। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট আইনেও আছে আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে পিএস নিয়োগ দিতে হবে। এ নিয়োগের মাধ্যমে কিছুটা হলেও আইনের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।
অন্য এক মন্ত্রী বলছেন, ‘এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা দরকার। যে সময়ে আমি পিএস হিসেবে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের পরখ করছিলাম সেই সময়েই শুনলাম, পিএস নিয়োগ হয়ে গেছে। এ সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে। ’মন্ত্রীদের একান্ত সচিব নিয়োগ দেওয়া হয় ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেইট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যন্ড প্রিভিলেজেজ) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ অনুযায়ী।
এই আইনের ১৪ (১) ধারা অনুযায়ী মন্ত্রীদের পছন্দ অনুযায়ীই তাদের একান্ত সচিব নিয়োগ দেওয়ার কথা। সরকার এত দিন ধরে তা-ই করে আসছে। কোনো মন্ত্রী যে কর্মকর্তাকে পছন্দ করে একান্ত সচিব নিয়োগ দেওয়ার জন্য আধাসরকারি (ডিও) পত্র লিখতেন, তাকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পিএস নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এ মন্ত্রণালয়টির শুধু আদেশ জারি করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
কর্মকর্তারা বলেন, পিএস নিয়োগের এ সুযোগের অপব্যবহার করতেন মন্ত্রীরা। তারা তাদের পছন্দের কর্মকর্তাকে পিএস নিয়োগ করতেন। মন্ত্রীর পিএস নিয়োগ পাওয়ার জন্য কর্মকর্তারা হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। এতে প্রশাসনে দলাদলি প্রকট আকার ধারণ করত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, অনেক মন্ত্রী কাকে পিএস নিয়োগ করবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যেতেন। অনেক মন্ত্রী মাসের পর মাস পিএসবিহীন থেকেছেন মনমতো কর্মকর্তা না পাওয়ার জন্য।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করার বিষয়টি বন্ধ করার জন্য এবার সরকার কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলেই তাদের পিএস নিয়োগ দিয়েছে। এমনকি গত মন্ত্রিসভার যেসব মন্ত্রী এবারের মন্ত্রিসভায়ও রয়েছেন, সেইসব মন্ত্রীর আগের পিএসদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাই করে পিএস পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, আইনমন্ত্রীর পিএস নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন এক কর্মকর্তাকে, যার আইন বিষয়ে লেখাপড়া রয়েছে। তা ছাড়া মেধাবী কর্মকর্তাদেরই পিএস পদে বাছাই করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মঈনউদ্দিন গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একসঙ্গে পিএস নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি একটা ভালো উদ্যোগ। পিএসরা প্রশাসনিক বিষয়ে মন্ত্রীকে সহায়তা করবেন। যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ না হলে তাদের পক্ষে মন্ত্রীদের সহায়তা করা সম্ভব হয় না। এবার যাদের পিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তা। একাধিক পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে পিএস পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের একটা ভালো প্রভাব প্রশাসনে পড়বে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ জারির প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী উপমন্ত্রীরা যত দিন ইচ্ছা প্রকাশ করবেন, তত দিন এসব সচিব দায়িত্বে থাকবেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রীদের না জানিয়ে তাাদের একান্ত সচিব নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে দুটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রথম বার্তাটি হচ্ছে মন্ত্রীরা যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না। পছন্দমতো একান্ত সচিব নিয়ে তার সহায়তায় নানা অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না। আর দ্বিতীয় বার্তা হচ্ছে, মন্ত্রীদের একান্ত সচিবরা চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। সরকার পরিবর্তন হলে তাদের পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়। অনেক সময় বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে একান্ত সচিবদেরও চাকরির সুরক্ষা দেওয়া হলো।
জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিএসরা গতিশীল না হলে সমস্যা। মন্ত্রীদের সঙ্গে দক্ষ কর্মকর্তাদের যোগাযোগ নাও থাকতে পারে। তাই পিএস দক্ষ কর্মকর্তা হলে ভালো ফল মিলবে। পিএস নিয়োগের বিষয়টি এককভাবে কিছু করা হয়নি। সার্বিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা ব্যর্থ হলে তাদের পরিবর্তন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী যে সুশাসনের কথা বলেছেন, সেই সুশাসনের দিকে আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি।’
ভবিষ্যতেও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মন্ত্রীদের এপিএস নিয়োগ দেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, এটা নির্ভর করে সরকার-প্রধানের ইচ্ছার ওপর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবারই প্রথম মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে একান্ত সচিবদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে এভাবে নিয়োগ দেওয়ার কোনো বিষয় আমার জানা নেই।
সহকারী একান্ত সচিবদের নিয়োগ কি আগের মতোই মন্ত্রীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেওয়া হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, ‘এখনো বিষয়টি ওই রকমই আছে। তবে কোনো পিএস সুশাসনের জন্য অন্তরায় বলে আমাদের কাছে তথ্য এলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদেরও তা অবহিত করা হবে।’
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মন্ত্রীরা একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব ও দুজন ব্যক্তিগত সচিব পান। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিবরা উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। আর উপমন্ত্রীর একান্ত সচিব সহকারী সচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। বেশিরভাগ মন্ত্রী তার নির্বাচনী এলাকার কোনো কর্মকর্তাকেই সাধারণত একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতে পছন্দ করতেন। আর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) পদে সাধারণত মন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মীরাই নিয়োগ পেয়ে থাকেন। তবে অনেক মন্ত্রী তাদের সহকারী একান্ত সচিব পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। গত ১০ বছর সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর সহকারী একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।
গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৭ জনের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরদিন সোমবার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। এবারের মন্ত্রিসভায় ৩১ জন নতুন মুখ। এর মধ্যে ২৭ জন জীবনে প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। গত মঙ্গলবার থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছেন। ৪৭ জনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৪ জন পূর্ণ মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও তিনজন উপমন্ত্রী রয়েছেন।
