স্বীকৃত কোনো পেশা নেই, তবু আট মাসে ১৯ বার দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারত সফর করেছেন মুন্সীগঞ্জের আনিস। একই জেলার খলিল ও সুমনের অবস্থাও তাই। দেশে কোনো চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। বিদেশেও কোনো কাজ নেই। তবুও গত তিন বছরে ৩৬ বার বিদেশ গেছেন তারা। ফারুক আহম্মেদ নামে আরেকজন ২০ বার গেছেন দুবাই আর সিঙ্গাপুরে। তারা যখন দেশে আসেন, প্রতিবারই বিমানে বিপুল পরিমাণ সোনা নিয়ে আসেন। কখনো তা ধরা পড়ে, বেশিরভাগ সময়ই পড়ে না। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় পাচার করে আনা সোনা চালান করে দেওয়া হয় ভারতে, কিছু বিক্রি করে দেশের জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের কাছে। পুলিশ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এদেরসহ সোনা চোরাচালানে জড়িতদের তালিকা তৈরি করেছে। এ তালিকায় ১৭ জন ভারতীয় নাগরিকের নামও রয়েছে। পুলিশ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, পঁচিশ দুর্ধর্ষ চোরাকারবারি দীর্ঘদিন ধরেই দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনার চালান পাচার করছে। এসব বিমানবন্দরে রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আবার তাদের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক আছে জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তদের। চোরাকারবারিদের রয়েছে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গে সখ্যও। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কেউ কেউ সহায়তা করছেন তাদের। পুলিশ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্র ও তাদের সহায়তাকারীদের শনাক্ত করেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। তবে শক্তিশালী এই চক্রের ১১ জন বিদেশে থেকে নিয়ন্ত্রণ করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উপায় দেখছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্ধর্ষ চোরাকারবারিদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। কিছু লোককে অর্থের বিনিময়ে ভাড়ায় খাটাচ্ছে তালিকাভুক্ত কারবারিরা। বেশ কিছু মাফিয়া দেশের বাইরে অবস্থান করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দেশিদের পাশাপাশি বিদেশি মাফিয়ারা সোনা পাচারে সক্রিয় আছে। তাদের নাম ও পরিচয় পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকজনকে ধরাও হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তালিকাভুক্তরা বেশ প্রভাবশালী। তাদের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগাযোগ আছে। আছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও। তাদের ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত সব কটি বিমানবন্দরে থাকলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। কৌশলে তারা বাহকের মাধ্যমে সোনার চালান পার করে দিচ্ছে।
তালিকা অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের ফিরোজ আলম বর্তমানে দুবাই অবস্থান করছেন। পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, ফিরোজ যে পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে তিনি সিঙ্গাপুর ও দুবাইতে ১৭ বার আসা-যাওয়া করেছেন। মাঝেমধ্যে ঢাকায় এলে মিরপুর ডিওএইচএসে থাকেন। সায়েদাবাদের কারবারি মোহাম্মদ ওয়ায়েদুজ্জামান একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণে গেছেন। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। তবে প্রায় সময়ই থাকেন দুবাইয়ে। আবদুল আউয়াল নামে এক চোরাকারবারির সঙ্গে শাসক দলের একাধিক নেতার যোগাযোগ। মুন্সীগঞ্জের ফারুক আহম্মেদও আছেন দুবাইয়ে। দীর্ঘদিন ধরে সোনা পাচারে জড়িত দিনাজপুরের সোহেল রানা। তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে নরসিংদীর মনির আহম্মেদ ও নারায়ণগঞ্জের ওয়ায়েদউল্লাহর। এ ছাড়া তালিকায় থাকা মিরপুরের সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের মঞ্জুর হোসেন, পল্লবীর সামসুল হুদা, মুন্সীগঞ্জের ইসলাম শেখ, রাজবাড়ীর মোহাম্মদ হানিফ, মুন্সিগঞ্জের মোহাম্মদ রুবেল একাধিকবার দুবাই সফর করেছেন। তারা বাংলাদেশে যতবার এসেছেন ততবারই সোনার চালান নিয়ে এসেছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। আর তাদের সহায়তা করছে সিএএবির সশস্ত্র প্রহরী আমির হোসেন, নজরুল ইসলাম (স্টাফ-২৩), আনোয়ার হোসেন, সেবার এনামুল, রমিজ উদ্দিন, মোতালেব খান, ট্রলিম্যান বাহার ও ডিভিশন ২-এর লিটন দাস।
বিমানবন্দর আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চোরাকারবারি ও তাদের সহযোগীদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে সোনা আসার পরপরই দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে পাচার করা হয়। এতে ১৭ ভারতীয় চোরাকারবারি সক্রিয় আছে। তারা বাংলাদেশের কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত চালান নিচ্ছে। ভারতীয় কারবারিরা বাংলাদেশের মোবাইল সিম ব্যবহার করে এসএমএসের মাধ্যমে চালানের তথ্য লেনদেন করে।
গোয়েন্দাদের তালিকায় থাকা অবৈধভাবে সোনাকারবারে জড়িত ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন : রূপ সাহা, গোপাল বিজন, বিজন হালদার, লক্ষ্মণ সেন, গোবিন্দ বাবু, লালু জয়দেব, গওহর প্রসাদ, সঞ্জীব, রামপ্রসাদ, মিন্টু, সুমন চ্যাটার্জি, রিয়াজ, তপন সাহা, ডালিম, মোনায়েম, ফারুক, বসাক চ্যাটার্জি ও স্বপন সাহা।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে এক কর্মকর্তা বলেন, চক্রগুলো উড়োজাহাজের স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে সোনা রাখে। এজন্য উড়োজাহাজের মধ্যে নিজেরাই বিশেষ স্থান তৈরি করে। চোরাই সোনা বহনের অভিযোগে গত দুই বছরে বিমানের সাতটি উড়োজাহাজ জব্দ করা হয়েছে।
