মজুরি বৃদ্ধি ও মজুরি কাঠামোতে বৈষম্য নিরসনের দাবিতে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে দেড় শতাধিক ‘উসকানিদাতার’ তালিকা করে তাদের নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আরও সহিংসতার আশঙ্কায় ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ায় শিল্প পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন দলের দেড় শতাধিক নেতাকে ‘কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ঢাকা-১ শিল্প পুলিশের পরিচালক সানা শামিনুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সহজ-সরল শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে সহিংস পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন যারা, তাদের সবাইকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন নেতা রয়েছেন।
শ্রমিকদের ‘ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে’ সরকারের তরফ থেকে কোনো বাধা নেই দাবি করে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় ১৫০ নেতাকর্মী শ্রমিকদের নানাভাবে উসকানি দিয়ে আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। তারা বলেন, এসব গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ঢাকা, সাভার ও আশুলিয়া মিলে ৫০টির বেশি এবং গাজীপুরের ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে ওইসব কারখানার অন্তত দুই হাজার শ্রমিককে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হয়েছে। এসব শ্রমিকের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগকারী নেতাদের ফোনের গোয়েন্দা নজরদারিতে দেড় শতাধিক ‘উসকানিদাতা’ যোগাযোগ প্রযুক্তিগত নজরদারিতে এনে তাদের কর্মকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য তারা জানতে পেরেছেন।
এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পোশাক কারখানার শ্রমিকদের উসকানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংগঠনের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি। জড়িত বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইন্ধনদাতা রাজনৈতিক নেতা, শ্রমিক নেতা ও সুবিধাবাদী লোকজনের তালিকা করা হয়েছে। সেই মোতাবেক তাদের গতিবিধি নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। গোপনে এসব নেতা সহজ-সরল শ্রমিকদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে আন্দোলনের নামে সহিংসতার ঘটনা ঘটাতে পারে বলে তথ্য আছে।
পোশাক শ্রমিকদের টানা আন্দোলনের অষ্টম দিন গতকালও আশুলিয়ার এনভয়, হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, উইন্ডো গ্রুপের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদান করার পরও কারখানা থেকে বের হয়ে গেছে। একই কাজ করেছে জামগড়া, নরসিংহপুর ও বেরন এলাকার পোশাক শ্রমিকরাও। এসব এলাকার বেশ কয়েকজন ইন্ধনদাতাকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার অন্তত ৫০ জন শ্রমিক নেতা ও শ্রমিককে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এদের অন্যতম হচ্ছে শ্রমিক নেতা জয়নাল। তিনি শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক। মাঝে মধ্যেই বামপন্থি একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে আসা-যাওয়া করেন। তার নেতৃত্বে ঢাকার বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে ওই শ্রমিকদেরও কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
আশুলিয়া এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় নজরদারিতে আছেন শিল্প পুলিশের পরিদর্শক সায়েদুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে পুলিশের কোনো বাধা নেই। কিন্তু যারা এই আন্দোলনকে সহিংস করে তোলার চেষ্টা করছে তাদের বিষয়ে আমরা খোঁজ-খবর নিচ্ছি।’
গাজীপুর জেলা শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাহেব আলী পাঠান দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের সহিংস করে তোলার নেপথ্যে অনেক ব্যক্তির তথ্য পেয়েছি, যাদের আমরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। সর্বশেষ ঘোষিত সরকারের সিদ্ধান্ত না মেনে ফের কেউ উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করলেই আইনের আওতায় আনা হবে।’
