সূর্যের আলো ও পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার ফসলের উৎপাদন বাড়াতে চায়। এর জন্য নেওয়া হয়েছে ‘সৌরশক্তি ও পানিসাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাইলট প্রকল্প’। কীভাবে সূর্যের আলো আর পানি সাশ্রয় করে ফসলের উৎপাদন বাড়ানো যাবে, তা বোঝানোর জন্য সারা দেশের কৃষি প্রকৌশলী ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে পাঁচ বছর।
তবে অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রথম বছরের প্রথম দফার প্রশিক্ষণের টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। হাত দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় দফার টাকায়ও। শুধু প্রশিক্ষণের টাকাই আত্মসাৎ করা হয়নি, আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের জন্য যে সংস্থা ১ শতাংশের ১০ ভাগের ১ ভাগ সার্ভিস চার্জ চেয়েছে, সেই সংস্থাকে কাজ না দিয়ে দেওয়া হয়েছে ২০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দরপ্রত্যাশী সংস্থাকে। এখানেই শেষ নয়, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছার পরও সেই ফাইলের নড়চড় নেই। অথচ সচিবালয় বিধিমালা অনুযায়ী ডেস্ক অফিসার ৪৮ ঘণ্টার বেশি ফাইল ধরে রাখতে পারেন না। অথচ তিনি ফাইল আটকে রেখেছেন ৮৪ দিন বা ২ হাজার ১৬ ঘণ্টা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নতুন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সবে দায়িত্ব নিয়েছি। সবকিছু বুঝে নিচ্ছি। তাই অভিযোগের বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি অবগত নই। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। আর তদন্ত প্রতিবেদন থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পাঁচ বছর মেয়াদি সৌরশক্তি ও পানিসাশ্রয়ী প্রকল্পের তহবিল ৬৫ কোটি টাকার। প্রথম বছর প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ ছিল ২০ লাখ টাকা। গত বছরের ২৯ থেকে ৩১ মে, ২ থেকে ৪ জুন, ৫ থেকে ৭ জুন এবং ৯ থেকে ১১ জুন চারটি প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করা হয় বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (আরডিএ)। প্রশিক্ষণ শেষে বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়। প্রশিক্ষণ ব্যাচগুলোর নামের সঙ্গে ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্প এলাকার মিল নেই। অর্থাৎ প্রকল্প এলাকার বাইরের কিছু কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী দেখানো হয়েছে। এমনকি পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পাঁচজন কর্মকর্তাকে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী দেখানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম করার জন্য প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল আজিজ সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় স্মারক ব্যবহার না করে তার প্রকল্পের দপ্তর স্মারক ব্যবহার করেছেন। অথচ প্রশিক্ষণের নোটিশে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সম্মতি আছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
একই বছরে দ্বিতীয় দফায় ২৭ থেকে ২৯ জুন এবং ৩ থেকে ৫ জুলাই দুটি ব্যাচকে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় দফার প্রশিক্ষণেও অনিয়ম করা হয়েছেÑ দুই ব্যাচের একসঙ্গে অনুষ্ঠান, তালিকায় কর্মকর্তাদের নাম বেশি থাকা, কোনো কোনো কর্মকর্তার নাম দু-তিনবারও উল্লেখ রয়েছে।
এসব বিষয়ে তদন্ত কমিটি প্রকল্প পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি তাদের জানান, প্রশিক্ষণ যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার কাছ থেকে এ বিষয়ে লিখিত জবাবে চাইলে তিনি তালবাহানা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি লিখিত জবাবেও প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে অনুষ্ঠানের দাবি করেছেন।
তদন্ত কমিটি তালিকাভুক্ত প্রশিক্ষণার্থী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে, কোনো প্রশিক্ষণার্থী ২৯ থেকে ৩১ মে, ২ থেকে ৪ জুন, ৫ থেকে ৭ জুন এবং ৯ থেকে ১১ জুনের প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। এসব শিডিউলে কোনো প্রশিক্ষণও হয়নি। এ সংক্রান্ত বিল ভাউচার সঠিক নয়। যেসব কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণে উপস্থিত দেখানো হয়েছে সেসব কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল। দ্বিতীয় দফার দুটি প্রশিক্ষণের কোনো বিল ভাউচার তদন্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন পিডি।
প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) চিন্ময় কান্তি গোলদার তদন্ত কমিটিকে জানান, প্রশিক্ষণে অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তিনি জানেন না। কারণ প্রকল্প পরিচালক চাইতেন না তিনি এসব প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
প্রকল্পে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ডের দুটি পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। যারা জনবল সরবরাহ করে সেসব সংস্থা বিষয়টি জানতেই পারেনি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, দরপত্রের শিডিউল, মূল্যায়ন কমিটির প্রস্তুত কারিগরি মূল্যায়ন ও তুলনামূলক বিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেই টেন্ডারে সর্বনি¤œ দরদাতাকে কাজ না দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। টেন্ডারে নর্থ বেঙ্গল সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড সার্ভিস চার্জ দাবি করেছে দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। অন্যদিকে সাকিব ট্রেডার্স দাবি করেছে ২০ শতাংশ। দরের ক্ষেত্রে জনবলের বেতন, ভ্যাট, আয়কর এসব দরদাতার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল। শুধু সার্ভিস চার্জ ছিল একমাত্র পরিমাপক। এ ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ যে দরদাতা সর্বনি¤œ দেবেন তিনিই পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী কাজটি পাবেন। অথচ সর্বোচ্চ দরদাতা সাকিব ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি বলেছে, সাকিব ট্রেডার্সকে জনবল সরবরাহের কাজ দেওয়া ঠিক হয়নি। তা ছাড়া তুলনামূলক বিবরণীর ক্যালকুলেশনেও ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা ও সরকারের পরিপত্র অনুযায়ী ভ্যাট ও আয়কর ক্যালকুলেশন করে কর্তন করা হয়নি।
তহবিল তছরূপ এবং তদন্ত কমিটির মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবদুল আজিজ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি তদন্ত প্রতিবেদন দেখিনি। আমাকে কিছু জানানো হয়নি। কাজেই তদন্ত প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে সে সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারি না। তবে শুরু থেকেই প্রকল্পটির পেছনে লোক লেগেছে। তাদের স্বার্থে তারা অনেক কিছুই করছেন বলে তিনি দাবি করেন।
কৃষিবিদ কাজী মো. সাইফুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি গত ৮ অক্টোবর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায় একই মাসের ২৪ তারিখে। সেই থেকে তদন্ত কমিটি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পড়ে আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সনৎ কুমার সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের মূল কপি জমা না হওয়ায় শাখায় ফাইল পড়ে আছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সৌরশক্তি ও পানিসাশ্রয়ী প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনও। কমিশন থেকে এরই মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে প্রকল্পের অনিয়ম বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
