সিপিডির ১০ সুপারিশ মজুরি বৈষম্যে শ্রমিক অসন্তোষ

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:২৯ এএম

মজুরি কাঠামো নির্ধারণে বৈষম্যের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বেশ কিছু সুপারিশও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘পোশাক খাতে সাম্প্রতিক মজুরি বিতর্ক : কী শিখলাম?’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব সুপারিশ উপস্থাপন করে সিপিডি। এরমধ্যে রয়েছে মজুরির পরিবর্তন বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো, ভবিষ্যতে মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগের সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আরও বেশি মতবিনিময়,  নারী শ্রমিকদের তাদের গ্রেড, মজুরি ও অন্যান্য আর্থিক ইস্যুগুলো আরও ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন, আন্দোলনের পর শ্রমিকদের নতুন করে হয়রানি থেকে বিরত থাকা এবং বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজে কাউকে নেতিবাচক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে ত্রিপক্ষীয় কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা। এছাড়া মজুরি বৃদ্ধির চাপ মোকাবেলায় ব্রান্ড ও বায়ারদের যৌথভাবে একটি কৌশল নির্ধারণ করা উচিত বলেও মনে করে সিপিডি।

সিপিডি আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্শি। সংস্থাটির সভাপতি অধ্যাপক রেহমান সোবহান এতে সভাপতিত্ব করেন। অন্যদের মধ্যে এফবিসিসিআই সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষসহ তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা, সরকারের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডিরি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, তৈরি পোশাক মূলত দিন শেষে একটি আন্তর্জাতিক পণ্য। ক্রেতারা এই পণ্যটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের ৫ ডলারের পোশাক খুচরা পর্যায়ে তারা ২০ ডলারে বিক্রি করে। এতে সব চাপ এসে পড়ে এ দেশের ওপর। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংলাপ প্রয়োজন। বিষয়টি জি-৭ কান্ট্রিসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলতে হবে। এ বিষয়ে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো মানে আমরা এমন কোনো দাবি উত্থাপন করছি না যে তাদের জন্য খুব জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। বরং তাদের জন্য আমরা এমন একটি মজুরি চাচ্ছি যা দিয়ে তারা ন্যূনতম চাহিদা মিটিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে পারবে।

মূল প্রবন্ধে সাম্প্রতিক অসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে মজুরি কাঠামো নির্ধারণে বেশকিছু ত্রুটি তুলে ধরে সিপিডি। এসব ত্রুটির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গ্রেডের মজুরি সমন্বয়ে বৈষম্য। এক্ষেত্রে কেবল সপ্তম গ্রেড ছাড়া অন্য সব গ্রেডের শ্রমিকরা মজুরি কাঠামো যথাযথ ছিল না বলে জানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত যে মজুরি বাড়ানো হয়েছে সে বিষয়ে শ্রমিকরা সঠিক ধারণা পাননি। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের এ বিষয়ে প্রকৃত ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আবার একেক কারখানায় একেকভাবে বর্ধিত মজুরির বাস্তবায়ন ঘটেছে। অনেক কারখানা আবার নতুন কাঠামো অনুসরণ করে মজুরি বাড়ায়নি। তৃতীয়ত শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা এলাকাভেদে ছিল ভিন্ন। চতুর্থত অসন্তোষ মেটাতে সব শিল্প এলাকার মালিকরা একইরকমভাবে সাড়া দেননি। ঢাকা, টঙ্গী ও গাজীপুর এলাকার মালিকরা এক্ষেত্রে ভালো সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় এই চেষ্টা কম পরিলক্ষিত হয়েছে। ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও গাজীপুর অঞ্চলের শ্রমিক, কারখানা মালিক ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই অসন্তোষের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চালায় সিপিডি।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু ম্ন্ুিশ সিপিডির সুপারিশগুলোর প্রশংসা করে বলেন, ভবিষ্যতে এই সুপারিশ একটি ‘গাইডলাইন’ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ তৈরি পোশাক খাতে অসন্তোষ দূর করতে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদল তৈরির আহ্বান জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই প্রতিনিধিদল মালিক পক্ষসহ সরকারের সঙ্গে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করবে।

আলোচনায় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, আন্দোলনকারী শ্রমিকদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুই-একজন ছাড়া বেশিরভাগই এখন পর্যন্ত ছাড়া পাননি।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো শ্রমিক যেন অন্যায়ভাবে মামলায় জড়িয়ে না পড়ে। তাদের বিরুদ্ধে যেন মামলা দেওয়া না হয়। এটা ঠিক হবে না, এটা আমরা চাই না। কিন্তু যে ঝামেলা করবে, যে ভাঙবে সেটা কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়।’

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন মজুরি কাঠামোয় গ্রেডের সংখ্যা কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, গ্রেডের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। কারণ পোশাক খাতে মজুরি হয় কাজের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে। মজুরি বাড়লেও বিশ্ববাজারে দিন দিন পোশাকের দাম কমছে। এ পরিস্থিতিতে আরও বেশি সরকারি সহায়তা না পেলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

পোশাক শিল্পে সরকারি প্রণোদনা বাড়ানোর খবর সঠিক নয় দাবি করে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘করপোরেট কর ও উৎসে কর কমানো হয়েছে বলা হচ্ছে। কিন্তু কমিয়ে যে পর্যায়ে আনা হয়েছে, কয়েক বছর আগেই সে পর্যায়ে ছিল। সুতরাং এটি আমাদের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।’ জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের হাত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।

সিপিডির সুপারিশগুলো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না বলেও দাবি করেন বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি বলেন, ‘সিপিডি যে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে, তা উন্নত বিশ্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রচেষ্টায় আছে। এগুলো আমাদের দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’

শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ বলেন, ‘শ্রমিকরা তাদের মনের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। সেখানে পুলিশ যদি তাদের ওপর আঘাত করে, তার প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, সেটা সবারই জানার কথা। এটা নিয়ে এখন যে শ্রমিক হয়রানি হচ্ছে কিংবা দোষারোপ করা হচ্ছে, সেটা উচিত নয়। মনের ভেতরে ক্ষোভ জমিয়ে রেখে প্রকৃত উৎপাদন সম্ভব নয়। বিক্ষোভের পরিস্থিতি খুব দরদ দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত