সংরক্ষিত নারী আসনের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি

নারীরা বিশেষ সংসদীয় প্রতিনিধি হোক

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৩৬ পিএম

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের প্রথা প্রথম চালু হয় ১৯৭২ সালের সংবিধানে। এতে দেশজুড়ে সরাসরি নির্বাচনের ৩০০টি আসনের পাশাপাশি নারীদের জন্য ১৫টি সংরক্ষিত আসনের বিধান চালু করা হয়, ১০ বছরের জন্য। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০টি করা হয় এবং বাহাত্তরের সংবিধানে গৃহীত হওয়ার সময় থেকে এর মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ বছরে উন্নীত করা হয়।  ১৯৮৭ সালে এই মেয়াদও শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী নির্বাচনে কোনো সংরক্ষিত আসন ছিল না। ১৯৯০ সালে সংবিধানের ১০ম সংশোধনীতে আবারও ১০ বছরের জন্য ৩০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান রাখা হয়। ২০০০ সালে এই মেয়াদও ফুরিয়ে যায়। ফলে ২০০১ সালের সংসদে নারীদের জন্য কোনো আসন সংরক্ষিত ছিল না। কিন্তু এই সংসদ চতুর্দশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ১০ বছরের জন্য সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ করে। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের জুলাই মাসে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীতে নারীর জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মেয়াদ ২৫ বছরের জন্য বাড়ানো হয়।

‘সংরক্ষিত আসনের’ এই ধারণাটির দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে, যারা পিছিয়ে আছে, যারা অবহেলিত বা অনগ্রসর তাদের একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে এনে ‘সমতা বাড়ানো’ এবং তাদের ‘অধিকার রক্ষা’র চেষ্টা করা। কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০১৮ সালে এসেও আমরা সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা এবং এর মেয়াদ বাড়াতে দেখছি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আমাদের বিশেষ মনোযোগ ও বিচার বিবেচনা প্রয়োজন। এখানে কিছু পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো

প্রথমত, এর মানে হলো, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না এবং এই ব্যবস্থাটা ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ বা একটা ‘বিশেষ সময়ের’ মধ্যেও সীমিত থাকছে না; আমরা বিবেচনাহীনভাবে এটাকে একটা ‘প্রথা হিসেবে’ মেনে নিয়ে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।  হয়তো আশা করা হয়েছিল সংরক্ষিত আসনে আসা নারীরা একবার-দুবার এভাবে এসে, সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে, পরে সরাসরি নির্বাচনে যাবেন এবং রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নেবেন। কিন্তু তা হচ্ছে না। এ কারণে কিন্তু সংরক্ষিত আসনের ধারণাটা বা এই চেতনাটাই মার খাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রশ্ন করা দরকার, সংরক্ষিত আসনের মধ্য দিয়ে সমাজের কোন নারীরা সংসদে আসছেন? আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সরাসরি নির্বাচনের আসনগুলোর মতোই সংরক্ষিত আসনগুলোও কেনাবেচা হয়, আত্মীয়-স্বজন, মামা-চাচা, খালা-ফুপু, বাপ-মায়ের বিবেচনা থেকে এই সংরক্ষিত আসনগুলোও রেহাই পায় না। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এসব কারণেও কিন্তু এই আসনগুলো নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা হতে দেখা যায়। আশির দশকে শফিক রেহমান সম্পাদিত যায়যায়দিনে সংরক্ষিত আসন নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছিল, এটা কি জাতীয় সংসদে ‘তিরিশ সেট অলঙ্কার কি না’। যদিও এই মন্তব্যকে আমি খুবই লিঙ্গীয় বৈষম্যমূলক এবং অসংবেদনশীল বলে মনে করি, কিন্তু এটাও সত্যি, নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রক্রিয়া সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি বলেই এমন সব মন্তব্যের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

তৃতীয়ত, সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের জন্য প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা অবশ্যই স্বচ্ছ এবং অনেক বেশি বিচার-বিবেচনা সাপেক্ষে হতে হবে। দলগুলো যদি ত্যাগী নেতাদের, তৃণমূলে, মাঠের রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেতাদের মনোনয়ন দিত; যারা সত্যি সত্যি রাজনীতিটা করছেন, বুঝছেন, রাজনীতি নিয়ে, আধুনিক দুনিয়া নিয়ে পড়াশোনা করছেন, যাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আছে, যারা নিজেদের প্রস্তুত করছেন তাদের মনোনয়ন দিত তাহলে কিন্তু সংরক্ষিত নারী আসনের চিত্রটা পাল্টে যেত। এমন হলে রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমাজে নারীর রাজনীতির একটা গুণগত পরিবর্তনের সূচনা হতো।

চতুর্থত, সংসদে যখন সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা আসেন তখন তারা সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের মতোই একই মর্যাদা ভোগ করেন। তিন কোটি টাকা দামের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি থেকে শুরু করে সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্যদের সকল ক্ষমতা কিন্তু একই থাকে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যখন বাজেট বরাদ্দ হয় তখন সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিতদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বাজেট বরাদ্দ পান। আমরা বলছি, অনগ্রসরদের এগিয়ে নিতে এই সংরক্ষিত আসন, তাহলে অনগ্রসরদের জন্য আমরা কেন কম বরাদ্দ দেব? যাদের ক্ষমতায়ন করতে চাই তাদের তো বরং বেশি বাজেট দেওয়ার কথা। এটাও আমার কাছে, বৈষম্য মনে হয়। যেমন সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম আইনে যেমন নারীরা পুরুষের তুলনায় অর্ধেক সম্পদের উত্তরাধিকার পান। ইমাম আবু হানিফা কিন্তু এই বিতর্কটা সামনে এনেছিলেন যে, নারী বা দুর্বল কেন কম পাবে? কিন্তু আমাদের সংসদেও কিন্তু এই বিষয়টা এখনো দেখা যাচ্ছে, অথচ এর উল্টোটাই হওয়ার কথা। মানে নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য তাদেরই বেশি বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার কথা।

এভাবে, সংসদের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা এক প্রকার ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ সদস্য হিসেবে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন। এসব কারণে সংসদের মতোই নিজ নির্বাচনী এলাকা বা আসনে যখন সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা যান সেখানেও তারা সরাসরি নির্বাচিতদের তুলনায় কম গুরুত্ব পান। আর এভাবে সরাসরি নির্বাচিতদের সঙ্গে একটা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন এই নারী সদস্যরা। গত সংসদে আমরা দেখেছি নারী সদস্যদের দুটো করে নির্বাচনী এলাকা বা আসন মিলিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ওই দুটো আসনেই সরাসরি নির্বাচিত সদস্য থাকায় তাদের কাজের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত থাকে। আর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মনে করেন, এখন যিনি সংরক্ষিত আসনে আছেন, এলাকায় কাজ করে জনপ্রিয়তা পেলে পরের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের সঙ্গে নানা মতবিনিময়-গোলটেবিলের আলোচনা থেকে জেনেছি, এসব কারণে এলাকায় কাজ করতে গিয়ে তারা বাধার সম্মুখীন হন, তাদের অপদস্থ করা এবং নানাভাবে হেয় করার কথা, নিজেদের কষ্টের-ক্ষোভের কথাও বলেছেন তারা। এই বাস্তবতাগুলোকে অস্বীকার করার উপায় আমাদের নেই। কিন্তু উত্তরণের উপায় নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। এই সংকট সমাধানের সম্ভাব্য কয়েকটি প্রক্রিয়া এখানে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো।  

‘বিশেষ সংসদীয় আসন’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংরক্ষিত নারী আসনের মূল স্পিরিট বা চেতনাকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে এসব সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী হতে পারে? বিশ্বের নানা দেশে এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে।  বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এ বিষয়ে শিক্ষা নিতে পারি। সেখানে ‘সুপার কন্সটিটিউয়েন্সি’ বা ‘সুপার ডিস্ট্রিক্ট’ মডেল নিয়ে কাজ করে সাফল্য পেয়েছেন তারা। এতে আমরা সারা দেশের ৩০০টি আসনের পাশাপাশি মোট ৫০টা আসনকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারি, যে আসনগুলো ‘বিশেষ সংসদীয় এলাকা’র মর্যাদা পাবে। এই আসনগুলোর আলাদা ভোটার তালিকা থাকবে এবং সংসদ নির্বাচনের দিনেই একইসঙ্গে এসব আসনেও সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেবেন এইসব আসনের নারী প্রার্থীরা। যেহেতু এই আসনগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে ফলে এখানে নারীদের বিরুদ্ধে কেবল নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সরাসরি নির্বাচনে। আমাদের দেশের নারী অধিকার আন্দোলনের নেতারাও এমন ধারণার কথা বলে আসছেন।

‘বিশেষ সংসদীয় প্রতিনিধি’

বিদ্যমান ব্যবস্থা সংস্কার করে দেশে এমন ‘বিশেষ সংসদীয় আসন’ তৈরি করে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সরাসরি নির্বাচন হয়তো এই সংসদে সম্ভব হবে না। হয়তো একদিন হবে। কিন্তু সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী সদস্যরা কী দায়িত্ব পালন করবেন সে বিষয়টা নিয়েও আমাদের ভাবা প্রয়োজন।  দার্শনিকভাবেই যেহেতু ‘অনগ্রসর’, ‘অবহেলিত’ বা ‘বৈষম্যের শিকার’দের জন্যই আসন সংরক্ষণের প্রথা শুরু হয়েছে তাহলে এই জনপ্রতিনিধিদেরই আমরা বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে রাষ্ট্রের, সমাজের এসব সমস্যা নিরসনে কাজে লাগানোর কথা ভাবছি না কেন? সংসদের কতগুলো ককাস থাকে, স্ট্যান্ডিং কমিটি থাকে, যেগুলো আসলে আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়।  স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এইসব দায়িত্বে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের দায়িত্ব দিয়ে আমরা একটা চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স আশা করতে পারি কি না, সেটাও ভাবা যেতে পারে।  তবে আমি বিশেষভাবে বলব, সমাজ-দেশ-রাষ্ট্রের অনগ্রসর সম্প্রদায়, অবহেলিত বিষয়, বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার গোষ্ঠী, বিশেষ মনোযোগের দাবিদার বিষয়গুলোর জন্য সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের ‘বিশেষ সংসদীয় প্রতিনিধি’ করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য একজন সদস্যকে বিশেষ প্রতিনিধি করা হলো, যিনি পাঁচ বছর ধরে কেবল এই বিষয়টি নিয়েই কাজ করবেন। এভাবে প্রতিবন্ধী, আদিবাসী নারী, সংখ্যালঘু নারী, কৃষক নারী, শ্রমিক নারী বা কর্মজীবী নারী, বাল্যবিবাহ, নগরউদ্বাস্তু, পথশিশুর মতো নানা বিষয় নিয়ে বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংসদীয় প্রতিনিধি হতে পারেন এই সদস্যরা। কেউ হয়তো শুধু জেলে সম্প্রদায় বা বেদে সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করলেন, কেউ কেউ শুধু নারীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিনোদন নিয়ে কাজ করলেন। এভাবে উপেক্ষিত ও অবহেলিত বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসে এই নারী সদস্যদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সংকটগুলো সমাধানে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

লেখক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত